Shankar Ghosal: উত্তর কলকাতার গৌরীবাড়ি অঞ্চলের একটি বাড়ি। সেই বাড়ির মালিক নিজেই বর্ষীয়ান অভিনেতা শঙ্কর ঘোষাল(Shankar Ghosal)। অথচ অভিযোগ, নিজের বাড়িতেই তিনি নিরাপদ নন। পুত্র ও নাতির হাতে নিয়মিত শারীরিক এবং মানসিক নি’গ্র’হে’র শি’কা’র হচ্ছেন বলে দাবি তাঁর। দোলের সন্ধ্যায় এক সংবাদমাধ্যমের কাছে ভেঙে পড়ে তিনি যে কথাগুলি বলেন, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো।
শঙ্কর ঘোষালের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই চলেছে এই অ’ত্যা’চা’র। একদিনের ঘটনা নয়। তাঁর কথায়, “নাতি আমার মাথায় ঘু’ষি মেরেছে। ছেলে লাঠি আছড়ে সেটাকে বেঁকিয়ে দিয়েছে। ৭৫ বছর বয়স আমার। আমি ওদের সঙ্গে পারি?” বয়স এবং শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, নিজের সুরক্ষা নিয়েই এখন শঙ্কিত। পার্কিনসন্স রো’গে আক্রান্ত তিনি। ফলে শরীরের নিয়ন্ত্রণ আগের মতো নেই। এমন অবস্থায় বাড়ির অন্দরে এই ধরনের আচরণ তাঁকে ভীষণভাবে ভেঙে দিচ্ছে বলে দাবি।
অভিনেতার অভিযোগ, কিছুদিন আগেও তাঁকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই ধাক্কায় পায়ে গুরুতর চোট লাগে। র’ক্তপাতও হয়। তাঁর কথায়, “পা কেটে র’ক্তা’র’ক্তি কাণ্ড।” নিয়মিতভাবে ঠিকমতো খাবারও পান না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। আর্থিক সঙ্কটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দীর্ঘদিন অভিনয় থেকে দূরে থাকার কারণে উপার্জনের পথ প্রায় বন্ধ। জমানো সঞ্চয় প্রায় শেষের পথে। এই অবস্থায় মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা করে মাসোহারা দেন তাঁর অভিনেত্রী বোন রত্না ঘোষাল। সেই টাকাতেই কোনওমতে সংসার চালান শঙ্করবাবু ও তাঁর স্ত্রী ভারতী ঘোষাল।
তবে পরিবারে এই অভিযোগ একতরফা নয়। শঙ্কর ঘোষালের স্ত্রী ভারতী দেবী স্বামীর বক্তব্য মানতে নারাজ। তিনি বরং ছেলের পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন। ভারতী দেবীর দাবি, “সকলের সহানুভূতি কুড়োতে আমার স্বামী মিথ্যা বলছেন।” অর্থাৎ পরিবারের ভেতরেই তৈরি হয়েছে মতবিরোধ। একদিকে বৃদ্ধ অভিনেতার নির্যাতনের অভিযোগ, অন্যদিকে স্ত্রীর বক্তব্য সবই নাকি সহানুভূতি আদায়ের কৌশল।
এই বিতর্কে নাম জড়িয়েছে অভিনেত্রীর বোন রত্না ঘোষালেরও। শঙ্করবাবুর আর্থিক টানাপোড়েনের সময়ে তিনি যে মাসোহারা দেন, তা জানিয়েছেন স্বয়ং অভিনেতা। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানার জন্য তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বেজে গেলেও সাড়া মেলেনি।
শঙ্কর ঘোষালের অভিযোগ এখানেই থেমে নেই। তাঁর দাবি, ছেলে নাকি তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যদিও বাড়ির মালিক তিনি নিজেই। সেই কারণেই হয়ত এখনও তাঁকে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। তবু বাড়ির ভেতরেই অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে দাবি অভিনেতার। তাঁর কথায়, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তিনি।
দোলের দিন পরিস্থিতি চরমে ওঠে বলে জানিয়েছেন শঙ্করবাবু। বাধ্য হয়ে তিনি মানিকতলা থানায় ফোন করেন। উদ্দেশ্য ছিল, ছেলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে আইনি সুরক্ষা চাওয়া। কিন্তু সেখানেও তিনি প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ। তাঁর বক্তব্য, থানায় ফোন করলেও সেভাবে সাহায্য মেলেনি।
এই প্রসঙ্গে মানিকতলা থানার অফিসার দেবাশিস দত্তের বক্তব্য, “বিষয়টি দেখা হচ্ছে।” অর্থাৎ পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে জানানো হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে একজন ৭৫ বছরের পার্কিনসন্স আক্রান্ত অভিনেতা যদি নিজের বাড়িতেই নিরাপত্তাহীন বোধ করেন, তবে তাঁর সুরক্ষার দায় কার? পারিবারিক কলহ নাকি সত্যিই শারীরিক নির্যাতন তা প্রমাণসাপেক্ষ। তবে অভিযোগের ভাষা যথেষ্ট গুরুতর। বিশেষ করে যখন অভিযোগকারী একজন প্রবীণ নাগরিক এবং সাংস্কৃতিক জগতের পরিচিত মুখ।
এই ঘটনায় আরও একটি দিক সামনে এসেছে বৃদ্ধ বয়সে শিল্পীদের আর্থিক অনিশ্চয়তা। দীর্ঘ অভিনয়জীবন সত্ত্বেও আজ জমানো টাকা প্রায় শেষ। নিয়মিত উপার্জনের পথ বন্ধ। পরিবারে অশান্তি। তার উপর শারীরিক অসুস্থতা। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে অত্যন্ত কঠিন, তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট।
অন্যদিকে, পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব এখন তদন্তের উপরই নির্ভর করছে। পুলিশি তদন্তে কী উঠে আসে, সেটাই দেখার। তবে আপাতত উত্তর কলকাতার গৌরীবাড়ির ওই বাড়িকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর বিতর্ক। প্রবীণ অভিনেতার কান্নাভেজা অভিযোগ আর স্ত্রীর পাল্টা দাবি দু’য়ের মাঝে প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে একটি পরিবার।
শেষ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়া কী দিকে মোড় নেয়, তা সময়ই বলবে। কিন্তু আপাতত শঙ্কর ঘোষালের অভিযোগ সমাজের এক স্পর্শকাতর বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে বৃদ্ধ বয়সে পারিবারিক নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত?