Rahul Arunoday Banerjee: ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করতেই রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। বিধানসভা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও বাকি থাকলেও, শাসক-বিরোধীর তরজা, হুঙ্কার-পাল্টা হুঙ্কারে কার্যত সরগরম পশ্চিমবঙ্গ। রাজনৈতিক ময়দানের এই উত্তেজনার আঁচ শুধু রাজনৈতিক মহলেই নয়, ছুঁয়ে যাচ্ছে সমাজের সর্বস্তরকে। কারণ দিনের শেষে সাধারণ মানুষ যেমন ভোটার, তেমনই ভোটার তারকারাও। রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি, ভোটের আগে মানুষের মনের হালচাল এই সব নিয়েই এক সাক্ষাৎকারে মুখ খুললেন অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়(Rahul Arunoday Banerjee)।
নতুন বছরের শুরু থেকেই রাজ্যে রাজনৈতিক পারদ চড়ছে। তারই মধ্যে শুরু হয়েছে SIR সংক্রান্ত কাজ, যা ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র। শাসক ও বিরোধীপক্ষ একে অপরের দিকে লাগাতার অভিযোগ ছুঁড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই রাজনৈতিক দড়ি টানাটানির মাঝে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ল’ড়া’ই, মূল্যবৃদ্ধি, কাজের অনিশ্চয়তা, আয়ের ঘাটতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভ’গ্নদশা এসব নিয়ে ভাবার অবকাশ কি আদৌ আছে কারও? এই প্রশ্নই তুলেছেন রাহুল অরুণোদয়।
সাধারণ মানুষের এই বঞ্চনা ও অপ্রাপ্তি নিয়েই সরব অভিনেতা। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে রাজ্যের আর্থ-সামাজিক অবক্ষয়ের ছবি। রাহুল সাফ জানিয়ে দেন, সংস্কৃতি হোক বা শিল্প কোথাও মানুষের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার মূল কারণ আগ্রহের অভাব নয়, বরং ক্রয় ক্ষমতার অভাব। তিনি বলেন, আমরা প্রায়শই আফসোস করি কেন সিনেমা হলে দর্শক আসছে না, কেন আর্ট এক্সিবিশনে ভিড় কম। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায় মানুষের হাতে কি আদৌ খরচ করার মতো টা’কা আছে?
রাহুলের কথায়, পশ্চিমবঙ্গ আজ কার্যত একটি “গ্লোরিফায়েড বৃদ্ধাশ্রম”-এর চেহারা নিয়েছে। তাঁর মতে, নিজের সন্তানের পড়াশোনার জন্য তিনি দামি বেসরকারি স্কুল বেছে নিতে পারছেন, কারণ তাঁর সেই আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে। কিন্তু তাঁর মতো প্রতিভাবান আরও বহু মানুষ আছেন, যাঁদের ক্রয়ক্ষমতা আজও তাঁর বাবার প্রজন্মের সমানেই আটকে। এই বৈষম্যই ধীরে ধীরে সমাজকে ভিতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে।তাঁর কথায়,”..আসলে আমাদের স্পেন্ডিং ক্যাপাসিটি (ক্রয়ক্ষমতা) বলে আর কিছু নেই। পশ্চিমবঙ্গ আসলে একটি গ্লোরিফায়েড বৃদ্ধাশ্রম। আমার স্পেন্ডিং ক্যাপাসিটি আছে বলেই হয়ত সহজকে একটি দামি বেসরকারি স্কুলে পড়াতে পারছি। কিন্তু আমার মতো প্রতিভাশালী অন্য কেউও থাকতে পারেন, যাঁর স্পেন্ডিং ক্যাপাসিটি আমার বাবার মতো!”
শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টেনে এনে আরও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন অভিনেতা। তাঁর বক্তব্য, এক সময় শিক্ষার ক্ষেত্রে যে সমান সুযোগ ছিল, তা আজ ক্রমশ হাতছাড়া হচ্ছে। শিক্ষার মানও পড়তির দিকে। নিজের ছাত্রজীবনের উদাহরণ টেনে রাহুল বলেন, তিনি যে সময় বড় হয়েছেন, তখন যোগ্যতার প্রতিযোগিতা ছিল সমান ময়দানে। পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়(Parambrata Chattopadhyay)-এর মতো কেউ নামী স্কুলে পড়লেও, তিনি নিজে বা ঋত্বিক চক্রবর্তী(Ritwick Chakraborty), অনির্বাণ ভট্টাচার্য(Anirban Bhattacharya)-এর মতো অনেকেই সাধারণ সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। তবু শুরুটা কারও থেকে পিছিয়ে ছিল না, কারণ শিক্ষার মান ছিল শক্ত।
আজকের পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা বলে মনে করেন রাহুল। তাঁর মতে, জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফল পুজোর কাছাকাছি বেরোনোই প্রমাণ করে দেয়, গোটা ব্যবস্থাটাই কতটা এলোমেলো হয়ে পড়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিকল্পনার অভাব এবং দীর্ঘসূত্রিতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “যোগ্য দৌড়নোর যে জায়গাটা আমি আমার সময় পেয়েছি…পরমব্রত পাঠভবনের মতো স্কুলে পড়েছে। কিন্তু আমি, ঋত্বিক চক্রবর্তী, অনির্বাণ, আমরা রকারি স্কুলে পড়েছি। কিন্তু আমার কেউ কারও থেকে পিছিয়ে স্টার্ট করিনি। আমাদের পড়াশোনার মান এতটা ভাল ছিল। এবছর জয়েন্টের রেজাল্ট বেরিয়েছে পুজোর কাছাকাছি।”
রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও তীব্র সমালোচনা শোনা গেছে রাহুলের গলায়। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যে এখন ‘পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি’ই প্রধান হয়ে উঠেছে। যোগ্যতা নয়, বরং অনুগ্রহনির্ভর ব্যবস্থাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি লুম্পেনগিরিকে প্রকাশ্যে উদযাপন করার প্রবণতাও সমাজের অবক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে, যাঁদের হাতে অর্থ আছে, তাঁদের মধ্যে অর্থের এক ধরনের অশ্লীল প্রদর্শন দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে যাঁদের নেই, সেই ‘হ্যাভ নটস’দের সামনে। এই বৈপরীত্য শহরের সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করছে বলেই মত রাহুলের। তাঁর কথায়, “আমরা ধীরে ধীরে ফাঁপা হয়ে যাচ্ছি।” রাজনৈতিক বিচারবোধ ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে, আর তার ফলেই গোটা পরিস্থিতি হয়ে উঠছে আরও বিশৃঙ্খল।
এই প্রসঙ্গে রাহুল মেসির কলকাতা সফরের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এমন বড় ইভেন্ট ঘিরে উচ্ছ্বাস যেমন চোখে পড়ে, তেমনই বাস্তব সমস্যাগুলিকে উপেক্ষা করার প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে যায়। তাঁর সাফ বক্তব্য, চোখ খুলে দেখার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গিয়েছে। যা ঘটছে, তা ঠিক হচ্ছে না এই সত্য মেনে নেওয়ার সাহস দেখাতেই হবে।তাঁর কথায়,”…আমাদের রাজনৈতিক বিচারবোধ ক্রমশ তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। একটা Messy সিচুয়েশনে আছি আমরা। সেটা মেসি(Messi)-র আসাতেও বোঝা গেল। আমাদের মনে হয় চোখ খোলা দরকার যে, যেটা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে না। অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। আর দেরি বলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী মুখ দেখাব জানি না।”
পাঁচ বছর পর রাজ্যে আবার একবার হাইভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে। আগেরবার যে আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ সরকার বেছে নিয়েছিলেন, তা কতটা পূরণ হয়েছে, সেই প্রশ্ন আজ আরও জোরালো। পরিবর্তনের আশা কি এখনও বেঁচে আছে, নাকি হতাশাই গ্রাস করছে ভোটারদের মন? সেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কয়েক মাস পর, ইভিএমের বোতাম টিপে। তবে ভোটের আগে রাহুল অরুণোদয়ের এই স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ মন্তব্য যে রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে, তা বলাইবাহুল্য।