Sayak Chakraborty: সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তা নতুন করে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে নেটদুনিয়ায়। জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সায়ক চক্রবর্তী(Sayak Chakraborty)-র এই ভিডিওতে উঠে এসেছে একাধিক ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনা, যেগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে একই প্রশ্ন, আমরা কি ধীরে ধীরে মানবিকতা হারিয়ে ফেলছি? কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে অনলাইন ট্রো’লিং, সেলিব্রিটি কালচার থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের অবমূল্যায়ন, সব মিলিয়ে ভিডিওটি সমাজের এক গভীর অবক্ষয়ের দিকেই আঙুল তুলেছে।
ভিডিওর শুরুতেই সায়ক চক্রবর্তী উল্লেখ করেন সম্প্রতি আলোচিত ‘ওয়াও মোমো’ (Wow! Momo)–র একটি কারখানায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অ’গ্নি’কা’ণ্ডে’র প্রসঙ্গ। এই ঘটনায় কর্মীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। দাবি করা হচ্ছে, চুরির আশঙ্কায় শ্রমিকদের কাজের সময় কারখানার ভেতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে রাখা হতো। এই তথ্য সামনে আসার পরই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে,এই ধরনের ব্যবস্থাকে আদৌ কি নিরাপত্তা বলা যায়?
ভিডিওতে সায়ক সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “কেবল টাকা দিলেই কি একজন মানুষকে বন্দি করে রাখা যায়? যদি হঠাৎ কোনো ইমার্জেন্সি হতো, আ’গু’ন লাগত বা দুর্ঘটনা ঘটত, তাহলে তারা বেরোবে কীভাবে?” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই ধরনের মানসিকতা নিছক অবহেলা নয়, বরং এক ধরনের স্বৈরাচারী চিন্তাধারা, যেখানে শ্রমিকদের জীবন ও সম্মানের কোনো মূল্য নেই।
এই অ’গ্নি’কা’ণ্ডে মৃতের সংখ্যা নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রবল ধোঁয়াশা। সরকারিভাবে যেখানে ১৬ জনের মৃ’ত্যু’র কথা বলা হচ্ছে, সেখানে প্রত্যক্ষদর্শী ও নেটিজেনদের একাংশের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা ৫০-এর কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে। এই অসঙ্গতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সায়ক। তাঁর মতে, শুধু সংখ্যা কমিয়ে দেখালেই দায় এড়ানো যায় না। প্রতিটি মৃ’ত্যু মানে একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ, একটি সম্পূর্ণ জীবন ধ্বংস হয়ে যাওয়া।
কারখানার শ্রমিকদের জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর ভিডিওর দ্বিতীয় অংশে একেবারে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন সায়ক চক্রবর্তী। এখানে উঠে আসে টলিউড অভিনেত্রী রুক্মিণী মৈত্র(Rukmini Maitra) এবং এক জনপ্রিয় ত্বক বিশেষজ্ঞের প্রসঙ্গ। সম্প্রতি একটি স্কিন ক্লিনিক উদ্বোধনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ওই চিকিৎসকের চেহারা বা ‘লুক’ নিয়ে নেটমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক কটাক্ষ ও উপহাস। অভিযোগ ওঠে, অতিরিক্ত বোটক্স ব্যবহারের ফলে তাঁর মুখের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেভাবে ট্রো’লিং হয়েছে, তা নিয়ে সায়ক অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে নিজের মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমরা কি একবারও ভেবে দেখি, ওই মানুষটার ভেতরে কী চলছে? যিনি নিজে একজন স্কিন স্পেশালিস্ট, ক্লিনিক খুলেছেন, তাঁর দক্ষতা বিচার না করে শুধুমাত্র চেহারার উপর ভিত্তি করে তাঁকে কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে।” সায়কের বক্তব্যে উঠে আসে, এই ধরনের বডি শেমিং কেবল কুরুচিকরই নয়, বরং মানসিকভাবে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর।
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও শেয়ার করেন সায়ক। তিনি জানান, অনলাইন বুলিং বা ট্রো’লিং কীভাবে একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে পারে, মানসিক স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় হাসি-ঠাট্টার আড়ালে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়, তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। অথচ সেই ক্ষত একজন মানুষকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিতে পারে।
কারখানার শ্রমিক হোক বা একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক, দু’জনের ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্ন একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়। আমরা কি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে ভুলে যাচ্ছি? কোথাও লাভের অঙ্কে চাপা পড়ছে জীবনের মূল্য, কোথাও আবার ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ আর ‘ভিউ’-এর নেশায় ভুলে যাচ্ছি সংবেদনশীলতা।
এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার নৈতিকতা নিয়েও আলোচনা জোরদার হচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কি শুধুই মত প্রকাশের জায়গা, নাকি তা ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে গণবিচারের এক ভয়ঙ্কর আদালত?
ভিডিওর পরবর্তী অংশে সায়ক চক্রবর্তী(Sayak Chakraborty) সোশ্যাল মিডিয়ার সামগ্রিক চরিত্র নিয়েও তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো আর গঠনমূলক আলোচনার জায়গা নেই। বরং সেখানে মানুষ যেন শুধুই বিচার করার অপেক্ষায় থাকে। তিনি বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া এখন ফুল অফ জাজমেন্ট। সবাই যেন বসে আছে কে কাকে কখন দোষী প্রমাণ করবে। এটা এখন একটা ছোটখাটো কোর্টে পরিণত হয়েছে।”
সামান্য ভুল, মতের অমিল বা আলাদা চিন্তাভাবনা প্রকাশ করলেই যেভাবে ট্রো’লিং শুরু হয়, সেটাকে তিনি ‘ভীতিকর’ বলে ব্যাখ্যা করেন। এই পরিবেশে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের মত প্রকাশ করতেই ভয় পেতে শুরু করছে, যা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয় বলেই মনে করছেন তিনি।
এই প্রসঙ্গের মধ্যেই উঠে আসে জনপ্রিয় গায়ক অরিজিৎ সিং(Arijit Singh)-এর নাম। সম্প্রতি অরিজিতের একটি পোস্ট ঘিরে নেটদুনিয়ায় শুরু হয় জল্পনা। তিনি কি গান গাওয়া কমিয়ে দিচ্ছেন বা ইন্ডাস্ট্রি থেকে সরে যাচ্ছেন? ভিডিওতে এই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেন সায়ক চক্রবর্তী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অরিজিৎ গান ছাড়ছেন না, বরং নিজের কাজের ধরণে পরিবর্তন আনতে চাইছেন।
সায়ক জানান, “অরিজিৎ সিং হয়ত আর আগের মতো নিয়মিত প্লেব্যাক করবেন না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি গান গাওয়া বন্ধ করছেন।” এতদিন বিভিন্ন সিনেমা, অভিনেতা কিংবা বড় প্রোডাকশন হাউসের হয়ে গান গেয়েছেন অরিজিৎ। এবার তিনি নিজের স্বাধীন সৃষ্টিতে, নিজস্ব মিউজিক ও আলাদা প্রজেক্টে মন দিতে চাইছেন।
সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে নিজের জন্য গান তৈরি করার মধ্যে যে আলাদা এক ধরনের তৃপ্তি রয়েছে, সেটিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভিডিওতে। সায়কের ভাষায়, “নিজের জন্য কাজ করার আনন্দটা আলাদা।” তিনি আরও জানান, অরিজিতের ভক্তদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাঁর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক প্ল্যাটফর্ম এতটাই শক্তিশালী যে, সিনেমাতে না থাকলেও অরিজিত নিয়মিতভাবেই নিজের গান নিয়ে দর্শকের কাছে পৌঁছে যাবেন।
সব মিলিয়ে এই ভিডিওটি কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের সমাজ ও ডিজিটাল সংস্কৃতির একটি আয়না বলেই মনে করছেন অনেকে। যেখানে একদিকে শ্রমিকের জীবন নিরাপত্তাহীন, অন্যদিকে অনলাইনে মানুষ মানুষকে ছিঁড়ে খাচ্ছে, সেখানে প্রশ্ন একটাই, আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি? মানবিকতার জায়গাটা কি সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছে, নাকি এখনও ফিরে তাকানোর সময় আছে?