Mimi-Subhashree: বনগাঁর সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে এখন উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে বিনোদনমহল। একটি মঞ্চ অনুষ্ঠান ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা ফের নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল শিল্পীদের নিরাপত্তা, সম্মান এবং সমাজের মানসিকতা নিয়ে। মঞ্চে ওঠার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই অভিনেত্রী ও সাংসদ মিমি চক্রবর্তী(Mimi Chakraborty )-কে অনুষ্ঠানস্থল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। অভিযোগ, অপমানজনক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয় তাঁকে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ক্ষো’ভে ফেটে পড়েছে নেটপাড়া।
ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২৯ জানুয়ারি বড়সড় পদক্ষেপ করে পুলিশ। মিমি চক্রবর্তী-র হে’ন’স্থা’র অভিযোগে অভিযুক্ত তনয় শাস্ত্রীকে তাঁর নিজ বাসগৃহ থেকে গ্রেফতার করা হয়। এই গ্রেফতারের খবর সামনে আসতেই বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কেন বারবার মঞ্চে, প্রকাশ্যে মহিলা শিল্পীদের এভাবে অপদস্ত হতে হচ্ছে?
এই আবহেই প্রথমবার প্রকাশ্যে মুখ খুললেন অভিনেত্রী শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়(Subhashree Ganguly)। সম্প্রতি একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি যে বক্তব্য রাখেন, তা মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। স্পষ্ট ভাষায় শুভশ্রী জানান, এই ধরনের ঘটনাকে আর ‘নরমাল’ বলে মেনে নেওয়া যায় না।
শুভশ্রী বলেন, বিগত কিছু সময় ধরে তিনি লক্ষ্য করছেন, বিশেষ করে মহিলা সেলিব্রিটিরা ক্রমশ মানুষের কাছে “সফট টার্গেট” হয়ে উঠছেন। তাঁর কথায়, “এই বিষয়টা কি আমরা সত্যিই মেনে নিচ্ছি? নাকি ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি?” অভিনেত্রীর এই প্রশ্ন যেন সমাজের দিকেই ছুড়ে দেওয়া এক তীব্র আয়না।
মিমির ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে শুভশ্রী আরও বলেন, “শুধু মিমি নয়, কিছুদিন ধরে লগ্নজিতা, মৌনি রায়ের সঙ্গেও যা ঘটছে, তা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তাঁর মতে, এই ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বড় মানসিকতার প্রতিফলন। তাই শুধু একজন বা দু’জন নয়, সকলের একসঙ্গে প্রতিবাদ করা জরুরি।
শুভশ্রী স্পষ্ট করে দেন, শিল্পীরা মঞ্চে ওঠেন সম্মানের জন্য, ভালোবাসার জন্য। তাঁরা পারিশ্রমিক পান ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে কেউ তাঁদের সম্মান কিনে নিয়েছে। তাঁর কথায়, “আমরা পারিশ্রমিক পাই, কিন্তু যাঁরা আমাদের পারিশ্রমিক দেন, তাঁরা আমাদের মাথা কিনে নেননি।” এই বক্তব্য ঘিরেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
শুধু মঞ্চের ঘটনা নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় চলা ক’টা’ক্ষ, কুৎসিত মন্তব্য নিয়েও ক্ষো’ভ প্রকাশ করেন শুভশ্রী। তিনি বলেন, যারা অনলাইনে বসে মন্তব্য করেন, তাঁদের উদ্দেশ্যেই তাঁর এই বার্তা, এই সমাজ কেবল সেলিব্রিটিদের নয়, সবার। সমাজকে সুস্থ রাখার দায়িত্ব শুধু অভিনেতা বা শিল্পীদের একার নয়, সাধারণ মানুষেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। তাই কিছু লেখার বা বলার আগে একটু ভেবে দেখা জরুরি।
প্রসঙ্গত, মিমি চক্রবর্তীই প্রথম নন। কিছুদিন আগেই মঞ্চে গান গাইতে গিয়ে হে’ন’স্থা’র শিকার হয়েছিলেন গায়িকা লগ্নজিতা। সেই ঘটনায় তিনি থানায় অভিযোগও দায়ের করেন। পাশাপাশি সম্প্রতি একটি লাইভ শো চলাকালীন অশালীন আচরণের শিকার হতে হয় মৌনি রায়কেও। একের পর এক এই ধরনের ঘটনার জেরে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক বাড়ছে শিল্পীমহলে।
প্রতি বছর বিশেষ করে শীতকাল এলেই রাজ্যজুড়ে মাচা অনুষ্ঠান, লাইভ শো-র সংখ্যা বেড়ে যায়। অভিনয়, গান, নাচ, সব মিলিয়ে বহু তারকা এই অনুষ্ঠানগুলিতে অংশ নেন। কিন্তু যদি প্রতিনিয়ত এই ধরনের অপমান, হে’ন’স্থা ও বিশৃঙ্খলার মুখে পড়তে হয়, তাহলে আগামী দিনে মঞ্চে উঠতে যাওয়ার আগে শিল্পীরা যে দু’বার ভাববেন, তা বলাইবাহুল্য।
বিনোদন মহলের একাংশের মতে, এই ঘটনাগুলি শুধুই আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং সামাজিক অসুস্থতার প্রতিফলন। জনপ্রিয় মুখ দেখলেই তাঁদের ‘সহজ টার্গেট’ ভাবার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে মহিলা শিল্পীদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও প্রকট।
শুভশ্রীর বক্তব্যের পর অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এতদিন পরে কেন এই প্রতিবাদ? তবে অধিকাংশের মতেই, অন্তত এই ধরনের স্পষ্ট অবস্থান ভবিষ্যতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
মিমি চক্রবর্তীর বনগাঁ কাণ্ড শুধুমাত্র একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে জনপ্রিয়তা যত বাড়ে, সম্মান ততটাই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। শিল্পীরা যতই পরিচিত মুখ হন না কেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত মানুষ, সম্মান পাওয়ার অধিকার তাঁদেরও সমান।
এই মুহূর্তে প্রশ্ন একটাই, এই ধরনের ঘটনা কি এবার সত্যিই সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে? নাকি কয়েকদিনের আলোচনার পর সব আবার আগের মতোই থেকে যাবে? শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, সমাজকে সুস্থ রাখার দায়িত্ব কারও একার নয়। সেই দায়িত্ব আমরা কতটা নিতে পারছি, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।