Sayak Chakraborty: পার্কস্ট্রিটের এক নামী রেস্তোরাঁয় রাতের ডিনার যে এমন বিতর্কের জন্ম দেবে, তা বোধহয় ভাবতেও পারেননি জনপ্রিয় ইউটিউবার ও অভিনেতা সায়ক চক্রবর্তী(Sayak Chakraborty)। শুক্রবার রাতে ঘটে যাওয়া এক খাবার সংক্রান্ত বিভ্রাটকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন। মটন স্টেক অর্ডার করেও টেবিলে গোমাংস পরিবেশন এই অভিযোগ ঘিরেই সরগরম নেটদুনিয়া। তবে সায়ক নিজে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই ঘটনার সঙ্গে ধর্ম বা রাজনীতির কোনও যোগ নেই।
ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল, তা বিস্তারিতভাবে এক সংবাদমধ্যমকে জানিয়েছেন সায়ক নিজেই। তাঁর কথায়, শুক্রবার রাতে তিনি তাঁর দুই বন্ধু, সুকান্ত কুণ্ডু(Sukanta Kundu) ও অনন্যা গুহ(Ananya Guha)-র সঙ্গে পার্কস্ট্রিটের ওই রেস্তোরাঁয় ডিনার করতে যান। তিনজনের অর্ডার ছিল আলাদা আলাদা। সায়ক অর্ডার করেন চিকেন আলা কিভ, সুকান্ত নেন মটন স্টেক এবং অনন্যা নেন চিলি চিকেন ও চিলি মাটন। প্রথমে টেবিলে আসে চিলি চিকেন ও চিলি মটন, যা তাঁরা খেয়ে নেন।
সায়ক জানান, শারীরিক কিছু সমস্যার কারণে তিনি এমনিতেই মাটন খান না। ফলে তিনি মূলত নিজের অর্ডার করা চিকেন আইটেমের দিকেই নজর রাখছিলেন। কিছুক্ষণ পর মেইন কোর্স হিসেবে টেবিলে আসে চিকেন আলা কিভ এবং একটি স্টেক। রেস্তোরাঁর কর্মী স্টেকের প্লেটটি টেবিলে রেখে দ্রুত চলে যান। তখনও টেবিলে আগের খাবারের ব্যবহৃত প্লেট পড়ে ছিল। সেগুলি সরানোর জন্য বললেও কর্মী তাতে বিশেষ কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ সায়কের।
এর মধ্যেই কৌতূহলবশত সায়ক স্টেকের একটি ছোট অংশ টেস্ট করেন। তাঁর ধারণা ছিল, সেটি মটন স্টেক। ঠিক সেই সময় ওই কর্মী আবার একটি নতুন প্লেট হাতে নিয়ে ফিরে আসেন। নতুন প্লেটটি টেবিলে রাখতেই সায়ক জানতে চান, সেটি কী। উত্তরে কর্মী জানান, সেটি মাটন স্টেক। তখনই সায়ক প্রশ্ন তোলেন, “তাহলে আমি এতক্ষণ কী খাচ্ছি?” এই প্রশ্নের উত্তরে কর্মী জানান, আগে যে স্টেকটি পরিবেশন করা হয়েছিল, সেটি ছিল বিফ বা গরুর মাংস।
এই উত্তর শুনে মুহূর্তের মধ্যে স্তম্ভিত হয়ে যান সায়ক, সুকান্ত এবং অনন্যা। সায়ক তখনই প্রতিবাদ জানান এবং বলেন, তিনি কখনও গোমাংস অর্ডার করেননি। কেন তাঁকে না জানিয়ে এমন খাবার পরিবেশন করা হল, তা নিয়েই শুরু হয় বচসা। কর্মী প্রথমে বিষয়টিকে ভুল বলে স্বীকার করে প্লেটটি সরিয়ে নিয়ে যান। পরে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মীর তরফ থেকে ক্ষমা চাওয়া হয় বলেও জানান সায়ক।
তবে বিষয়টি এখানেই শেষ হয়নি। পুরো ঘটনার একটি ভিডিও সায়ক সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার পর তা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিও ঘিরে শুরু হয় নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, গোমাংস আর পাঁঠার মাংসের স্বাদে পার্থক্য বোঝা গেল না কেন? এই প্রসঙ্গে সায়কের সাফ জবাব, “যাঁরা কখনও গোমাংস খান না, তাঁরা কীভাবে তার স্বাদ চিনবেন? আর আমি তো ভাবতেই পারিনি, মটনের বদলে বিফ পরিবেশন করা হবে।”
সায়ক আরও স্পষ্ট করেন, এই ঘটনার সঙ্গে ধর্মীয় কোনও দৃষ্টিভঙ্গি জড়িয়ে নেই। তাঁর কথায়, “আমি যেটা খাই না, সেটা আমাকে কেন দেওয়া হবে, প্রশ্নটা শুধু এটুকুই। আমি কোনওদিনই ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করি না।” তবে একইসঙ্গে তিনি এটাও বলেন, প্রত্যেক মানুষেরই কিছু ব্যক্তিগত সীমারেখা থাকে। তাঁর ক্ষেত্রে সেই সীমারেখা হল, তিনি গরু বা শূকরের মাংস খান না।
ভাইরাল ভিডিওতে আরও একটি অংশ নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। সেখানে সায়ককে বলতে শোনা যায়, “আমি একজন ব্রাহ্মণ। আমাকে না জানিয়ে কীভাবে গোমাংস খাওয়ানো হল?” ওই সময় তিনি সংশ্লিষ্ট ওয়েটারের ধর্ম নিয়েও প্রশ্ন করেন। ওয়েটার জানান, তিনি মুসলিম। তার পরিপ্রেক্ষিতেই সায়ক পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “আমি যদি আপনাকে না বলে শুয়োরের মাংস খাইয়ে দিই, আপনি কি খাবেন?” এই কথোপকথনের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ওয়েটার স্বীকার করে নেন, তাঁর ভুল হয়েছে।
ঘটনার জেরে রেস্তোরাঁর অন্দরমহলে বেশ কিছুক্ষণ তর্ক-বিতর্ক চলে বলে জানা যায়। সায়ক অভিযোগ জানান রেস্তোরাঁর অন্যান্য কর্মকর্তাদের কাছেও। যদিও অভিযুক্ত কর্মীর দাবি ছিল, তিনি অর্ডার শুনতে ভুল করেছিলেন। তবে সেই যুক্তি মানতে নারাজ ছিলেন সায়ক। পরে জানা যায়, সায়কের অভিযোগের ভিত্তিতে পার্কস্ট্রিট থানার পুলিশ ওই রেস্তোরাঁর এক কর্মীকে গ্রেফতার করেছে।
এই ঘটনার রেশ গিয়ে পড়েছে রাজনৈতিকমহলেও। সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজ্য বিজেপির একাংশ বিষয়টিকে তুলে ধরে সরব হয়েছে। যদিও সায়ক নিজে এই প্রসঙ্গে পরিষ্কার করে বলেছেন, তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের সমর্থক নন। তাঁর কথায়, “আমি রাজনীতি বুঝি না। সবকিছুর মধ্যে রাজনীতির গন্ধ খোঁজাটা আমাদের স্বভাব হয়ে গেছে। ভোটে দাঁড়াতে চাইলে অনেক আগেই দাঁড়াতাম। তৃণমূল বা বিজেপি, কোনও দলকেই আমি সমর্থন করি না।”
সায়ক আরও বলেন, “যেটা অন্যায়, সেটুকু বলার অধিকার আমার আছে।” তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, তাঁর খুব ভালো বন্ধু রিয়াজের বাড়িতে তিনি ঈদের সময়েও যান। সেখানে তাঁর জন্য আলাদা করে খাবার রান্না হয়। “এটাই তো সহাবস্থান। এখানে ধর্মের প্রশ্নটা কোথায়?”, প্রশ্ন সায়কের।
সব মিলিয়ে, একটি খাবার সংক্রান্ত ভুল কীভাবে সামাজিক, ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে, তা নিয়েই এখন আলোচনা সর্বত্র। সায়ক চক্রবর্তী অবশ্য বারবার একটাই কথা বলছেন, এই ঘটনার সঙ্গে ধর্ম বা রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁর কাছে বিষয়টি শুধুই ব্যক্তিগত পছন্দ ও সম্মানের প্রশ্ন। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সেই ব্যাখ্যা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা সময়ই বলবে।