Dev-Anirban: টলিপাড়ার অন্দরমহলে দীর্ঘদিন ধরে চলা ফেডারেশন বনাম পরিচালকদের দ্বন্দ্ব একসময় সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য(Anirban Bhattacharya)-এর কেরিয়ারে। সেই সময় তাঁকে কার্যত অলিখিতভাবে ‘ব্যান’ করা হয়েছিল ইন্ডাস্ট্রি থেকে এমন অভিযোগ বহুদিন ধরেই ঘুরপাক খেয়েছে। কাজ হারানো, প্রোজেক্ট আটকে যাওয়া, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সব মিলিয়ে অনির্বাণের কেরিয়ার এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। ঠিক সেই আবহেই একসময় ফেডারেশনের কাছে অনির্বাণকে কাজে ফেরানোর জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে দেখা যায় সুপারস্টার দেব(Dev)-কে। সেই ঘটনার পর এবার মুখ খুললেন অনির্বাণ নিজেই।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য(Anirban Bhattacharya)। দেবের ভূমিকাকে তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেননি, বরং কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন। তবে একই সঙ্গে ‘ক্ষমা’ শব্দটি নিয়ে নিজের আপত্তির জায়গাটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন অভিনেতা। অনির্বাণের বক্তব্য, এই গোটা বিষয়টিকে শুধুমাত্র ক্ষমা চাওয়ার আঙ্গিকে দেখলে তা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
সাক্ষাৎকারে অনির্বাণ বলেন, দেব একা নন এই ইস্যুতে রাজ চক্রবর্তী(Raj Chakrabarty), প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়(Prosenjit Chatterjee)-এর মতো ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সারির মানুষও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের এই অবস্থান তিনি দেখেন ভালোবাসা, স্নেহ এবং সহানুভূতির জায়গা থেকে। অনির্বাণের কথায়, তাঁরা কেউই তাঁর ক্ষ’তি চাননি, বরং তাঁর ভালোর কথাই ভেবেছেন। সেই কারণে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেও পিছপা হননি অভিনেতা।তাঁর কথায়, “আমি দেবের প্রতি কৃতজ্ঞ। শুধু দেব কেন? রাজদা (পরিচালক রাজ চক্রবর্তী), বুম্বাদাও (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) বলেছেন। তাঁরা যে কথাটা বলেছেন সেটা আমার প্রতি অপত্য স্নেহ বা ভালোবাসা থেকেই বলেছেন, এবং আমার ভালো চেয়েই বলেছেন।..”
তবে সমস্যা তৈরি হয় ‘ক্ষমা’ শব্দটি ঘিরে। অনির্বাণ স্পষ্ট করে জানান, ক্ষমা চাওয়া বা করানো তখনই অর্থবহ, যখন কোনও অন্যায় স্বীকার করার জায়গা থাকে। তাঁর মতে, কেউ অন্যায় করলে তবেই ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন ওঠে। তাই তিনি চান না, কেউ তাঁর হয়ে ক্ষমা চাইুক। অনির্বাণের যুক্তি, সমস্যার সমাধানের জন্য আলোচনা হতে পারে, কথাবার্তা হতে পারে, প্রয়োজনে তিনি নিজেও সেই আলোচনায় বসতে রাজি। কিন্তু এমন কিছু না বুঝিয়ে যদি শুধুই ক্ষমা চাইতে বলা হয়, তা তাঁর কাছে অস্বস্তিকর।তাঁর কথায়, “কিন্তু যদি ক্ষমা শব্দটার উপর জোর দিই, তাহলে আমি বলতে চাই, ক্ষমা মানুষ অন্যায় করলে চায়। তাই আমিও চাইবো ওঁরা যেন কেউ আমার হয়ে ক্ষমা না চান। সমস্যাটা নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা করতে পারেন। সেই আলোচনায় আমিও সামিল হতে পারি। আমি আলোচনা বিরোধী নই। কিন্তু ক্ষমা জিনিসটা বড়ো জিনিস।”
অভিনেতা আরও বলেন, জীবনে বহুবার তিনি নিজে ক্ষমা চেয়েছেন। যখনই মনে হয়েছে তাঁর কোনও ভুল আছে, তখন এক মুহূর্ত দেরি না করে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু সেই ক্ষমা এসেছে নিজের উপলব্ধি থেকে। অনির্বাণের বক্তব্য, আগে তাঁকে বোঝাতে হবে, কোন জায়গায় তিনি অন্যায় করেছেন। সেই অন্যায় প্রমাণিত হলে ক্ষমা চাইতে তাঁর কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু ‘অন্যায় কোথায়’ সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ক্ষমা দাবি করা হলে, তিনি তা মেনে নিতে পারবেন না।তাঁর কথায়,”পৃথিবীতে অনেক মানুষের কাছে অনেকবার ক্ষমা চেয়েছি। কিন্তু তখনই চেয়েছি, যখন বুঝেছি আমার অন্যায় আছে। অন্যায় থাকলে আমার ক্ষমা চাইতে পয়েন্ট এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না। কিন্তু আমাকে আগে বুঝিয়ে দিতে হবে অন্যায় কোনটা।”
এই সাক্ষাৎকারে শুধু নিজের অভিজ্ঞতা বা ফেডারেশন বিতর্কেই থেমে থাকেননি অনির্বাণ। প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন দেব-শুভশ্রী জুটিকেও, যাকে তিনি সংক্ষেপে ‘দেশু’ বলে উল্লেখ করেন। ব্যক্তিগতভাবে এই জুটিকে ঘিরে তাঁর কোনও বড় আবেগ নেই বলেই স্বীকার করেন অভিনেতা। তবে ব্যক্তিগত অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে তিনি দেখেন গোটা বাংলা বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির কথা।তাঁর কথায়, “ব্যক্তিগত ভাবে দেব-শুভশ্রী নিয়ে আমার যে খুব বড় ইমোশান আছে তা নয়। কিন্তু আমার থাকলো কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের বাংলা বিনোদন জগতের ক্ষেত্রে ‘দেশু’ একটা বড় ইমোশান।”
অনির্বাণের মতে, দেব(Dev)-শুভশ্রী(Subhashree Ganguly) জুটি শুধুমাত্র দু’জন অভিনেতা-অভিনেত্রীর রসায়ন নয়, বরং বাংলা ছবির দর্শকদের কাছে এক বড় ইমোশান। বহু বছর আটকে থাকার পর ‘ধূমকেতু’(Dhumketu) ছবির মুক্তি এবং সেই ছবি ঘিরে দর্শকদের উন্মাদনা তাঁকে সত্যিই অবাক করেছে। এতদিন পরও একটি ছবিকে কেন্দ্র করে যে এই ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, তা বাংলা সিনেমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন তিনি।তাঁর কথায়, “..’ধূমকেতু’ এত বছর পর মুক্তি পাওয়ার পরও এত উন্মাদনা ছিল। সেটা তো একটা হাঁ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়। কিন্তু আবার শুনছি যে পুজোয় দেশু জুটি ফিরবে।”
এখানেই শেষ নয়। অনির্বাণ জানান, পুজোয় আবার দেশু জুটি ফিরছে। এই খবর তাঁকে আশাবাদী করে তুলেছে। তাঁর বক্তব্য, যদি এই ধরনের বাণিজ্যিক ছবির হাত ধরে বক্স অফিসে নতুন করে জোয়ার আসে, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। গোটা ইন্ডাস্ট্রি তাতে উপকৃত হবে। প্রযোজক, পরিবেশক, টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে শিল্পীদের কাজের সুযোগ বাড়বে, এটাই তাঁর বিশ্বাস।তিনি বলেন, “আমাদের বাংলা ছবির মড়া গাঙে যদি বক্স অফিসে একটা জোয়ার আসে এই ধরনের ছবির হাত ধরে তাহলে বাংলা ইন্ড্রাস্ট্রির একজন হিসেবে আমার থেকে বেশি খুশি কেউ হবে না।”
অনির্বাণ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ছবি ব্যবসা করা মানে শুধু হিরো-হিরোইন বা প্রযোজকের লাভ নয়। একটি ছবি হিট হলে তার সুফল পৌঁছে যায় গোটা ইন্ডাস্ট্রিতে। তাঁর কথায়, “ছবি ব্যবসা করা মানে শুধু সেই ছবি হিরো-হিরোইন, বা তার প্রযোজক নয় গোটা ইন্ড্রাস্ট্রিটা উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।” বাংলা সিনেমা যদি আবার ঘুরে দাঁড়ায়, যদি বক্স অফিসে নিয়মিত দর্শক ফেরে, তাহলে একজন ইন্ডাস্ট্রির মানুষ হিসেবে তার চেয়ে বেশি খুশি তিনি আর কিছুতেই হবেন না।
সব মিলিয়ে, দেবের ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের এই বক্তব্য টলিপাড়ায় নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একদিকে কৃতজ্ঞতা, অন্যদিকে নিজের আত্মসম্মান ও অবস্থান, দু’য়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অনির্বাণ বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি আলোচনা চান, সমাধান চান, কিন্তু অকারণ ‘ক্ষমা’ নয়। তাঁর এই স্পষ্ট বক্তব্য আবারও প্রমাণ করল, টলিপাড়ার বিতর্ক শুধু পর্দার আড়ালে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বারবার উঠে আসছে প্রকাশ্য আলোচনায়।