Sujoy Prasad Chatterjee:গতকাল রাত, শহর জুড়ে উত্তেজনা। অরিজিৎ সিং(Arijit Singh) আর বিশ্বখ্যাত সেতার শিল্পী অনুষ্কা শঙ্কর(Anoushka Shankar)-এর যুগলবন্দি শুনতে মুখিয়ে বাঙালি। ঠিক সেই সময়েই প্রকাশ্যে এল এক অস্বস্তিকর বিতর্ক। কনসার্টের সঞ্চালক হিসেবে চূড়ান্ত হওয়া সত্ত্বেও, অনুষ্ঠানের মাত্র এক ঘণ্টা আগে মঞ্চে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন বাচিক শিল্পী ও অভিনেতা সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়(Sujoy Prasad Chatterjee)। ঘটনায় তীব্র ক্ষো’ভ উগরে দিলেন তিনি। অভিযোগের তির সরাসরি উদ্যোক্তাদের দিকে চূড়ান্ত অপেশাদারিত্ব, সমন্বয়হীনতা এবং অসম্মানের।
সুজয় প্রসাদের দাবি, এই অনুষ্ঠানের ‘মাস্টার অফ সেরিমনি’ হিসেবে তাঁকে আগেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কথাবার্তা, পরিকল্পনা সবই চূড়ান্ত হয়েছিল অনেক আগে। এমনকি তাঁর পারিশ্রমিকও আগাম মিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল আয়োজকদের তরফে। ফলে অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক আগে আচমকা এই সিদ্ধান্ত যে তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে, তা গোপন রাখেননি শিল্পী।
অভিযোগে উঠে এসেছে, শহরের এক নামী আয়োজক সংস্থা রক্তিম পাল চৌধুরী ও কৌস্তভ দত্ত সুজয়কে সঞ্চালনার দায়িত্ব দিয়েছিল। শুধু দায়িত্ব পালনই নয়, সুজয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি পেশাদার গণ্ডির বাইরেও উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন। শঙ্কর পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ নম্বর জোগাড় করা থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানের ধারণা ও কাঠামো সাজানো নানা বিষয়ে তিনি সাহায্য করেছিলেন। তাঁর মেয়ে ও ম্যানেজার মেহেন্দি চক্রবর্তীতেও নাকি স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেছিলেন আয়োজকদের। কিন্তু এত কিছুর পরিণাম যে এমন ‘চরম অপমান’ হবে, তা ভাবতেই পারেননি তিনি।
ঘটনার মোড় ঘোরে কনসার্ট শুরুর ঠিক এক ঘণ্টা আগে। সুজয়ের কথায়, তখনই তাঁকে জানানো হয় যে অনুষ্কা শঙ্করের টিমের ‘কমিউনিকেশন ডিরেক্টিভ’ অনুযায়ী মঞ্চে কোনও সঞ্চালক রাখা যাবে না। এই সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে যান তিনি। কারণ তাঁর অভিযোগ, এই নির্দেশের কথা উদ্যোক্তারা আগেই জানতেন। তা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁকে কিছু না জানিয়ে রাখা হয়। ন্যূনতম পেশাদার সৌজন্য বা স্বচ্ছতার পরিচয় দেওয়া হয়নি বলেই দাবি সুজয়ের।
এই আচরণে ক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি লেখেন, আয়োজকদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ‘অত্যন্ত নিম্নমানের’। তাঁর মতে, জনসমক্ষে যেভাবে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা শুধুমাত্র পেশাগত অসম্মান নয় মানসিকভাবেও গভীর আঘাত। সুজয়ের কথায়, “এই অপমান আর মানসিক ট্রমা সহজে ভুলে যাওয়ার নয়।”
যদিও আয়োজকদের তরফে পারিশ্রমিক ফেরত দেওয়া হয়নি অর্থাৎ আর্থিক ক্ষ’তি হয়নি তবুও এই ঘটনায় যে তাঁর মন ভেঙেছে, তা স্পষ্ট। তবে সুজয় এটাও জানিয়েছেন, তিনি এই অভিজ্ঞতাকে নিজের পথচলার শেষ বলে মনে করছেন না। বরং সমাজমাধ্যমে তাঁর লেখা এক লাইনে ধরা পড়েছে কঠোর বাস্তববোধ, ‘পরজীবীদের টপকে যেতে আমি শিখে গেছি।’ তাঁর মতে, জীবনের পথে ছোটখাটো ধাক্কা আসবেই, কিন্তু তাতে গন্তব্য বদলে যায় না।
এই পোস্ট ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, আন্তর্জাতিক মানের শিল্পীর অনুষ্ঠানে এমন সিদ্ধান্ত কি একেবারেই শিল্পীর টিমের? নাকি উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনার অভাবেই তৈরি হল এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি? যদিও সুজয় নিজে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে এই পোস্ট লেখেননি। তাঁর বক্তব্য, ভবিষ্যতে যাঁরা এই সংস্থার সঙ্গে কাজ করবেন, তাঁদের সতর্ক করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
ঘটনার আরেকটি দিকও সামনে এসেছে। বহু দর্শক নাকি শুধুমাত্র সুজয় প্রসাদের সঞ্চালনা শুনবেন বলেই এই মহার্ঘ কনসার্টের টিকিট কেটেছিলেন। তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তা স্বীকার করেছেন সুজয় নিজেও। অনুরাগীদের উদ্দেশে তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং জানিয়েছেন, পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।
তবে এই বিতর্ক নিয়ে আরও আলোচনায় বসতে বা মিডিয়া বাইট দিতে আপাতত নারাজ সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি নিয়ে যা বলার, তিনি ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন। এখন তিনি নিজের কাজ ও আগামীর পথচলাতেই মন দিতে চান।
অন্যদিকে, আয়োজকদের তরফে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বিশ্বমানের এক কনসার্টের আড়ালে কীভাবে তৈরি হল এমন সমন্বয়হীনতা? শেষ মুহূর্তের এই সিদ্ধান্ত কি এড়ানো যেত না? আর তার দায়ভারই বা কার?
অরিজিৎ–অনুষ্কার যুগলবন্দি যেখানে সঙ্গীতপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে, ঠিক সেখানেই এই বিতর্ক কনসার্টের আড়ালে সংগঠন ও পেশাদারিত্বের প্রশ্ন তুলে দিল। সুজয় প্রসাদের অভিজ্ঞতা কি ভবিষ্যতে আয়োজকদের আরও সতর্ক করবে, নাকি এমন ঘটনাই বিনোদন দুনিয়ার নীরব সত্য হয়ে থেকে যাবে, সেই উত্তরই এখন খুঁজছে শহর।