Nandini Bhattacharya:সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সমাজকর্মী নন্দিনী ভট্টাচার্য(Nandini Bhattacharya) বর্তমান সময়ের সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্ট ও তথাকথিত ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র ও স্পষ্ট ভাষায় ক্ষো’ভ প্রকাশ করলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় কাকে কন্টেন্ট বলা হচ্ছে, কারা ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে পরিচিত হচ্ছেন এবং ভিউ ও লাইকের দৌড়ে সমাজ ঠিক কোন দিকে এগোচ্ছে, এই সমস্ত প্রশ্নের সামনে দাঁড় করালেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে সামাজিক দায়বদ্ধতা, রুচির অবক্ষয়, ঝুঁকিপূর্ণ কন্টেন্ট এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর এর প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ।
নন্দিনী ভট্টাচার্যের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আজকের দিনে ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ শব্দটির মানে কী দাঁড়িয়েছে? তাঁর মতে, শুধুমাত্র গয়নার দোকানে গিয়ে কেনাকাটার ভিডিও তোলা, সাজগোজ দেখানো বা ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি প্রকাশ করলেই কাউকে ইনফ্লুয়েন্সার বলা যায় না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই ধরনের ভিডিওতে কোনো গঠনমূলক বার্তা বা সমাজের জন্য ইতিবাচক প্রভাব নেই। বরং এই কন্টেন্টগুলো মানুষের কৌতূহল বা বিনোদনের ক্ষণিক চাহিদা মেটালেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো মূল্য যোগ করে না।
সাক্ষাৎকারে তিনি একটি নির্দিষ্ট ভিডিওর উদাহরণ তুলে ধরে আরও কড়া অবস্থান নেন। তাঁর ভাষায়, সম্প্রতি তিনি এমন একটি ভিডিও দেখেছেন যেখানে রাস্তার ধারে কুয়োর মুখে দাঁড়িয়ে এক মহিলা দু’টি ছোট বাচ্চাকে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে ধরে রেখে নাচ করছেন, তাও আবার ভোজপুরি গানের তালে। এই দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে নন্দিনী ভট্টাচার্য প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “এটাই কি কন্টেন্ট? এটাই কি একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের কাজ?” তাঁর মতে, এই ধরনের কাজ শুধুমাত্র দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়, বরং ভয়ংকরও। কারণ এতে শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, অথচ ভিউ পাওয়ার নেশায় সেই ঝুঁকিকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
বর্তমান প্রজন্মের এই প্রবণতা নিয়ে তিনি শুধু ক্ষো’ভই প্রকাশ করেননি, বরং গভীর লজ্জা ও দুঃখের কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, এক মা যদি কুয়োর পাড়ে দাঁড়িয়ে নিজের সন্তানদের ঝুঁকির মুখে ফেলে নাচের ভিডিও বানান, তাহলে প্রশ্ন শুধু সেই ব্যক্তির নয়, প্রশ্ন গোটা সমাজের। নন্দিনী ভট্টাচার্য বলেন, “আমাদের নিজেদের লজ্জা পাওয়া উচিত, আমরা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছি?” এই ঘটনাকে তিনি সামাজিক অবক্ষয়ের স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবেই দেখছেন।
সাক্ষাৎকারে বেকারত্বের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি আরও সরাসরি মন্তব্য করেন। সঞ্চালক যখন বলেন, অনেকেই উপার্জনের পথ হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নিচ্ছেন, তখন নন্দিনী ভট্টাচার্য স্পষ্টভাবে জানান যদি মানুষের রোজগারের একমাত্র রাস্তা হয়ে দাঁড়ায় এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নমানের কন্টেন্ট তৈরি, তাহলে বুঝতে হবে সামনে খুবই “দুর্দিন” অপেক্ষা করছে। তাঁর মতে, এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক সংকটেরও পূর্বাভাস।
পুরো সাক্ষাৎকার জুড়ে নন্দিনী ভট্টাচার্যের বক্তব্য একাধিক প্রশ্নের জন্ম দেয় কন্টেন্ট তৈরির নামে আমরা ঠিক কীকে স্বাভাবিক করে তুলছি? ভিউ আর লাইকের দৌড়ে আমরা কি মানুষের জীবন, বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা, ভুলে যাচ্ছি? সমাজ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব কোথায়? এই সাক্ষাৎকার আসলে শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার সমালোচনা নয়, বরং একটি সামাজিক সতর্কবার্তা। বর্তমান সময়ের ট্রেন্ড যদি এভাবেই চলতে থাকে, তবে তার পরিণতি যে ভয়াবহ হতে পারে, সেই আশঙ্কাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন নন্দিনী ভট্টাচার্য।
সব মিলিয়ে, এই সাক্ষাৎকার সোশ্যাল মিডিয়ার চকচকে দুনিয়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলেছে। জনপ্রিয়তার সংজ্ঞা, কন্টেন্টের মান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা এই তিনটি প্রশ্নকে সামনে এনে নন্দিনী ভট্টাচার্য যেন আমাদের সবাইকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।