Jojo Mukherjee: সঙ্গীত জগতে বদলে গিয়েছে সাফল্যের সংজ্ঞা আর সেই পরিবর্তন নিয়েই সরব হলেন কলকাতার জনপ্রিয় গায়িকা ও অভিনেত্রী জোজো মুখার্জি(Jojo Mukherjee )। অভিনয়, সঙ্গীত ও বিনোদনের পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা এই বহুমুখী শিল্পী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তুলে ধরলেন বর্তমান সময়ের মঞ্চ শিল্পীদের কঠিন বাস্তবতা এবং রিয়েলিটি শো-কেন্দ্রিক জনপ্রিয়তার নতুন সমীকরণ। তাঁর কথায়, আজকের দিনে স্রেফ ভালো গানের জোরে পরিচিতি পাওয়া আর আগের মতো সহজ নয়, বরং বড় পরিসরে কাজের সুযোগ পেতে হলে রিয়েলিটি শোর মঞ্চ প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে।
একসময় পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিল্পীরা কোনও একটি পাড়ায় বা এলাকায় গান গেয়ে মানুষের মন জয় করলে সেই সুনাম ছড়িয়ে পড়ত আশেপাশের অঞ্চলগুলিতেও। মুখে মুখে প্রচার অর্থাৎ ‘মাউথ পাবলিসিটি’ ছিল জনপ্রিয়তার প্রধান হাতিয়ার। কোনও শিল্পী যদি একটি অনুষ্ঠানে প্রশংসা পেতেন, তবে অন্য পাড়া, অন্য শহর থেকেও ডাক আসত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা টেলিভিশনের অতিরিক্ত নির্ভরতা ছাড়াই শুধুমাত্র পারফরম্যান্সের জোরে গড়ে উঠত পরিচিতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারা প্রায় বিলুপ্তির পথে বলেই মনে করছেন জোজো।
সাক্ষাৎকারে আলোচনার সময় তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, একসময় যারা শুধুমাত্র মঞ্চে গান গেয়ে নিজেদের পরিচিতি ও অবস্থান তৈরি করেছিলেন, তাঁরা এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য, “মঞ্চ শিল্পী যারা ছিলেন, তারা একদমই এখন আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছেন…”, এই মন্তব্যেই যেন ফুটে ওঠে বর্তমান সঙ্গীত জগতের কঠিন বাস্তব। তাঁর মতে, নিয়মিত মঞ্চে গান গেয়ে ধাপে ধাপে বড় হয়ে ওঠার যে প্রক্রিয়া ছিল, তা এখন কার্যত অচল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যাঁরা সঙ্গীত জগতে সক্রিয় এবং নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশই কোনও না কোনও রিয়েলিটি শো থেকে উঠে এসেছেন এমনটাই দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, “এখন যারা কাজ করছে তারা সবাই অলমোস্ট রিয়েলিটি শো-এর।” অর্থাৎ টেলিভিশনের প্রতিযোগিতামূলক মঞ্চ যেন হয়ে উঠেছে শিল্পী পরিচিতির প্রধান প্ল্যাটফর্ম। সেখান থেকে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারলেই মিলছে বড় অনুষ্ঠান, অ্যালবাম বা অন্যান্য কাজের সুযোগ।
জোজো মনে করেন, আগের দিনের মতো পাড়ায় পাড়ায় অনুষ্ঠান করে ধীরে ধীরে নিজের নাম ছড়িয়ে দেওয়া এখন আর তেমন কার্যকর নয়। তিনি বলেন, “আগে যেরকম এই পাড়ায় ওই পাড়ায় গান গেয়ে নাম করলে পরে আরেকটা পাড়ার ডাক আসত… এখন রিয়েলিটি শো-তে জনপ্রিয় হলে পরে তাদের ডাক আসে।” তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, জনপ্রিয়তার পথ এখন অনেকটাই বদলে গেছে। স্থানীয় অনুষ্ঠান বা ছোট পরিসরের মঞ্চ আর সেই পুরনো প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না।
আলোচনার একাধিক পর্যায়ে তিনি ‘মাউথ পাবলিসিটি’র প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর মতে, মানুষের মুখে মুখে পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ার যে সুযোগ ছিল, তা এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। “মাউথ পাবলিসিটি যেটা, সেটার সুযোগ বন্ধই প্রায়”, এই মন্তব্যে ধরা পড়ে তাঁর আক্ষেপ। প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং মিডিয়ার বিস্তার যেখানে নতুন দরজা খুলেছে, সেখানেই হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে পুরনো কিছু পথ।
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর জন্য রিয়েলিটি শো-কে তিনি প্রায় অপরিহার্য বলে মনে করছেন। তাঁর বক্তব্য, এখন যদি কোনও শিল্পী রিয়েলিটি শোর মাধ্যমে দর্শকের সামনে না আসেন, তাহলে বৃহত্তর পরিসরে তাঁকে চেনার সুযোগ খুবই কম। “এখন তোমাকে যেকোনো রিয়েলিটি শো থেকে আসতে হবে, নাহলে মানুষ জানতে পারবে না”, এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে বিতর্ক উসকে দিতে পারে। কারণ এতে একদিকে যেমন রিয়েলিটি শোর গুরুত্ব স্বীকার করা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি শুধুমাত্র মঞ্চকেন্দ্রিক শিল্পচর্চার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত?
সঙ্গীতের জগতে টিকে থাকার লড়াই যে দিন দিন কঠিন হচ্ছে, সেটিও পরোক্ষে উঠে এসেছে তাঁর কথায়। প্রতিযোগিতা, প্রচার মাধ্যমের চাপ এবং দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জনের দৌড়ে শিল্পীদের এখন নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হচ্ছে। আগের মতো বছরের পর বছর মঞ্চে গান গেয়ে ধীরে ধীরে শ্রোতাদের মন জয় করার সময় বা সুযোগ দুটোই যেন কমে এসেছে। দর্শকরাও এখন দ্রুত পরিচিত মুখের দিকে ঝুঁকছেন, আর সেই পরিচিতি গড়ে দিচ্ছে টেলিভিশনের রিয়েলিটি শো।
তবে তাঁর বক্তব্যে কেবল সমালোচনা নয়, রয়েছে সময়ের পরিবর্তনের স্বীকৃতিও। তিনি সরাসরি বলেননি যে রিয়েলিটি শো খারাপ, বরং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বর্তমান ব্যবস্থায় সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় সিঁড়ি। আধুনিক যুগে শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে এই প্ল্যাটফর্মকে গুরুত্ব দিতেই হবে এমনটাই যেন তাঁর পর্যবেক্ষণ।
আরও পড়ুন:Rahul Arunoday Banerjee:ভোটের আগে রাজ্যের বাস্তবতা নিয়ে বি’স্ফো’র’ক রাহুল বন্দোপাধ্যায়
সব মিলিয়ে, সঙ্গীত জগতের পুরনো ও নতুন ধারার টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই সাক্ষাৎকারে। একদিকে হারিয়ে যেতে বসা মঞ্চ শিল্পীদের আক্ষেপ, অন্যদিকে রিয়েলিটি শো-নির্ভর নতুন প্রজন্মের উত্থান এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে জোজো মুখার্জির মন্তব্য নিঃসন্দেহে আলোচনার জন্ম দেবে। প্রশ্ন একটাই ভবিষ্যতের সঙ্গীত মানচিত্র কি পুরোপুরি রিয়েলিটি শো-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, নাকি আবারও ফিরবে ‘মাউথ পাবলিসিটি’র সেই দিন? সময়ই দেবে তার উত্তর।