Nikita Das:সম্প্রতি যাদবপুরে এক ট্রাফিক চেকিংকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একটি ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। ঘটনাটির সঙ্গে যুক্ত অভিনেত্রী নিকিতা দাস(Nikita Das) এবার প্রকাশ্যে এসে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাঁর দাবি, পরিস্থিতি যতটা দেখানো হচ্ছে, বাস্তবটা ততটা সরল নয়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো আইন ভা’ঙা হয়নি, বরং পারিবারিক জরুরি পরিস্থিতির চাপে কিছু ভুল হয়েছে এমনটাই জানালেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত যাদবপুর এলাকায়। অভিযোগ অনুযায়ী, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেলে বের হয়েছিলেন নিকিতা এবং সঙ্গে ছিলেন এক যুবক। কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ তাদের থামায়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, জরিমানার অঙ্ক ও পুলিশের আচরণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বচসা শুরু হয়। সেই ভিডিওতেই উঠে আসে ‘তিনটি বাড়ির পর দোকান’ মন্তব্যটি, যা নিয়ে পরে নেটিজেনদের একাংশ প্রশ্ন তোলেন।
এই মন্তব্য প্রসঙ্গে নিকিতা জানান, উত্তেজনার মুহূর্তে মানুষ সবসময় গুছিয়ে কথা বলতে পারে না। তাঁর কথায়, “ওটা কথার কথা ছিল। আসলে আমাদের বাড়ি থেকে গলি পেরিয়ে যাদবপুর বাজারের কাছে ওষুধের দোকানে যাওয়ার কথা ছিল।” তিনি বোঝাতে চান, পরিস্থিতির চাপে কথাবার্তায় অসংলগ্নতা থাকতে পারে, কিন্তু তাতে উদ্দেশ্যের বিকৃতি খোঁজা ঠিক নয়।
তবে ট্রাফিক নিয়ম ভা’ঙা’র বিষয়টি এড়িয়ে যাননি তিনি। হেলমেট না পরা এবং লাইসেন্স সঙ্গে না থাকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিয়ে নিকিতা বলেন, তারা কখনও দাবি করেননি যে হেলমেট না পরে ঠিক কাজ করেছেন। তাঁর কথায়,“আমরা একবারও বলিনি যে হেলমেট না পরে বেশ করেছি। আমরা ফাইন দিতেও রাজি ছিলাম,” জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়িতে তাঁর মায়ের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। সেই জরুরি পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়েই এই ভুল হয়েছে।
লাইসেন্স ও অন্যান্য কাগজপত্র প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, হার্ডকপি সঙ্গে না থাকলেও ডিজিটাল নথি দেখানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সরকারি ‘mParivahan’ অ্যাপের মাধ্যমে লাইসেন্স দেখাতে চেয়েছিলেন বলেও জানান। তাদের লক্ষ্য ছিল দ্রুত বিষয়টি মিটিয়ে ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফেরা। কিন্তু সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনেকে অভিযোগ তোলেন, এটি নাকি পূর্বপরিকল্পিত কন্টেন্ট। এ প্রসঙ্গে নিকিতা স্পষ্ট করে বলেন, “কোনো সুস্থ মানুষ এমার্জেন্সি পরিস্থিতিতে ভিডিও বানানোর প্ল্যান করে না।” তাঁর দাবি, পুলিশের আচরণ অস্বাভাবিক ও রূঢ় হয়ে ওঠায় নিজেদের সুরক্ষার জন্যই ক্যামেরা অন করতে বাধ্য হন তারা। যদি শুরু থেকেই ভিডিও বানানোর উদ্দেশ্য থাকত, তাহলে গোটা ঘটনাই প্রথম থেকে রেকর্ড করা হতো এমন যুক্তিও দেন তিনি।
জরিমানার অঙ্ক নিয়েই বিতর্কের সূত্রপাত বলে দাবি নিকিতার। ভিডিওতে শোনা যায়, প্রায় ৬,৫০০ টাকার জরিমানা দাবি করা হয়েছে। এত বিপুল অঙ্কের কারণ জানতে চাওয়াতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় বলে অভিযোগ। নিকিতার বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণত হেলমেট না পরা বা লাইসেন্স সংক্রান্ত অপরাধে ৫০০ বা ২০০০ টাকা জরিমানা হয়। “আমি একটা প্রশ্ন তুলতেই পারি না যে স্যার কিসের এটা কেস?” ভিডিওতে বলতে শোনা যায় তাঁকে।
অভিযোগ, জরিমানার কারণ জানতে চাওয়ায় পুলিশ ক্ষু’ব্ধ হয়ে ওঠেন। নিকিতার ভাষ্যমতে, অত্যন্ত রূঢ় সুরে বলা হয়, “কী হয়েছে? তোমাকে উত্তর দিতে হবে এখন? কিসের জন্য সাড়ে ছয় হাজার টাকা? এই ওর বাইক তোল, বাইক তোল!” এরপর পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়। যুবকের অভিযোগ, তিনি স্পট ফাইন বা অনলাইন কেস দেওয়ার অনুরোধ করলেও তা শোনা হয়নি। বরং তাঁর হাত থেকে জোর করে বাইকের চাবি নিয়ে নেওয়া হয়।
তিনি দাবি করেন, শুধু রাস্তাতেই নয়, থানার ভেতরেও তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি তাঁর অসুস্থ মাকেও দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ। তিনি বলেন, “থানার ভেতরে ক্যামেরা থাকে। আমি বলছি সেই ক্যামেরা চেক করা হোক। উনি ভেতরে যেভাবে কথা বলছিলেন, তাতে স্পষ্ট যে উনি ক্ষমতার অপব্যাবহার (মিসইউজ) করছেন।”
নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনার জবাবও দিয়েছেন তিনি। অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে এটি সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেষ্টা। এর উত্তরে তিনি বলেন, তাঁর কোনো ‘ফেম’ পাওয়ার ইচ্ছা নেই। “আমার কোনো ইনটেনশন নেই দাদা… আমি আজ অব্দি এমন কোনো ভিডিও বানাইনি যেখানে আমি নিজে ফেম পাওয়ার জন্য এসব করবো,” জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন তোলার অধিকার রয়েছে, সেটাই প্রয়োগ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রশ্ন তোলার কারণেই তাঁদের বাইক সিজ করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অভিযোগ, বলা হয়েছে “থানায় আসবি এসে বাইকটা নিয়ে যাবি।” এই ব্যবহারে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন বলেই জানিয়েছেন। তাঁর মতে, একজন শক্তিশালী মানুষ ভুল করতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি প্রশ্ন তোলে, সেটাকে ইগোর বিষয় বানানো উচিত নয়।
নিজের ভুল তিনি স্বীকার করেছেন এমন কথাও বারবার বলেছেন। “আমি একবারও বলিনি যে আমি কোনো ভুল করিনি,” জানান তিনি। হেলমেট না পরার দায় স্বীকার করে তিনি বলেন, আইনের নির্ধারিত জরিমানা দিতে তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তাঁর মতে, অপরাধের তুলনায় শাস্তি যেন অনেক বেশি হয়ে গেছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি করেছি চু’রি আর আমাকে দেওয়া হচ্ছে ফাঁসি” অর্থাৎ ছোট অপরাধের জন্য বড় শাস্তি।
এই ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য হয়েছে। কেউ কেউ ভয় দেখানোর চেষ্টাও করেছেন বলে অভিযোগ। তাঁর আশঙ্কা, এভাবে যদি প্রতিবাদী কণ্ঠকে চাপে রাখা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষ পুলিশের সামনে প্রশ্ন তুলতে বা ক্যামেরা ধরতে ভয় পাবে।“মানুষ ভয়ে আরও প্রশ্ন তুলতে পারবে না… বড় লোকের সামনে ক্যামেরা ধরা যাবে না, তাহলে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হবে,” বলেন তিনি।
তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করছেন না। যদি তাঁর প্রশ্ন তোলা বড় অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে তিনি ক্ষমা চাইতে রাজি। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজেকে ‘গিল্টি’ ভাবছেন না। তাঁর কথায়, “আমি এই মুহূর্তে নট গিল্টি। যদি হয়ে থাকি তবে আপনারা আমাকে বলে দিন। আমাকে যেখানে যেতে হবে, যা শাস্তি পেতে হবে আমি পাবো।”
এই ভিডিও সামনে আসার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একাংশ মনে করছেন, ট্রাফিক আইন মানা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব এবং হেলমেট না পরার মতো বিষয়কে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে আরেক অংশের দাবি, আইন ভা’ঙা হলেও প্রশ্ন তোলার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না এবং পুলিশের আচরণ সর্বদা সংযত ও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাটির সম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হয়নি। তবে একটি ভাইরাল ভিডিওকে ঘিরে নাগরিক অধিকার, পুলিশের ভূমিকা, জরিমানার স্বচ্ছতা এবং সামাজিক মাধ্যমে বিচার সবকিছু মিলিয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে যাদবপুরের এই ট্রাফিক বিতর্ক।
ঘটনার শেষ পরিণতি যা-ই হোক, একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের শাস্তি যেমন প্রযোজ্য, তেমনই কি প্রশ্ন তোলার অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত? এই বিতর্কের মধ্যেই সেই উত্তর খুঁজছেন অনেকেই।