Anamika Saha:টলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেত্রী অনামিকা সাহা (Anamika Saha) আবারও ফিরছেন বড় পর্দায়। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে নানা ধরনের চরিত্রে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া এই অভিনেত্রীকে খুব শিগগিরই দেখা যাবে পরিচালক জুটি নন্দিতা রায় (Nandita Roy) ও শিবপ্রসাদ মুখার্জী (Shiboprosad Mukherjee)-র নতুন ছবিতে। ছবির নাম ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’ (Phul Pishi O Edward)। এই ছবির প্রচারের সময় এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয়জীবনের নানা অজানা গল্প তুলে ধরলেন তিনি। সেই আলাপচারিতাতেই উঠে এল কিংবদন্তি অভিনেত্রী গীতা দে (Gita Dey)-কে নিয়ে তাঁর আবেগঘন স্মৃতি এবং একসময় তাঁকে নিয়ে দর্শকদের ভুল ধারণার কথাও।
অনামিকা সাহা জানালেন, তাঁর অভিনয় জীবনের একটা দীর্ঘ সময় এমন কেটেছে যখন অনেকেই তাঁকে গীতা দে-র মেয়ে বলে ভাবতেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পর্দায় তিনি প্রায়ই নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং তাঁর অভিনয়ের ধরনেও অনেকটা গীতা দে-র ছাপ ছিল। বিশেষ করে মুখের অভিব্যক্তি ও সংলাপ বলার ধরনে অনেকেই মিল খুঁজে পেতেন। অভিনেত্রীর কথায়, “একটা সময় অনেকেই আমাকে গীতা দে-র মেয়ে ভাবত। আমি এত নেগেটিভ চরিত্র করেছি যে দর্শকরা বলতেন, একেবারে গীতা দে-র মতো মুখ ঝামটা দিয়ে অভিনয় করছি।”
তবে বাস্তবে তাঁদের সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম রক্তের নয়, কিন্তু আবেগের। অনামিকা জানান, তাঁর বয়স যখন প্রায় ষোলো-সতেরো বছর, তখনই প্রথম গীতা দে-র সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে এমন এক সম্পর্কের জন্ম দেয়, যেখানে তিনি কিংবদন্তি অভিনেত্রীকে ‘গীতা মা’ বলেই ডাকতেন। অভিনেত্রীর কথায়, প্রথম যে ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন, সেখানে তাঁর মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন গীতা দে। সেই থেকেই যেন সম্পর্কটা বাস্তবের মধ্যেও মা-মেয়ের মতো হয়ে ওঠে।
অনামিকা স্পষ্ট করে বলেন, “আমি আসলে গীতা দে-র মেয়ে নই। কিন্তু অনেকেই আমাকে গীতা দে পার্ট টু বলত।” দর্শকদের সেই মন্তব্যে কখনও অবাক হয়েছেন, কখনও আবার মজা পেয়েছেন তিনি। কারণ তাঁর নিজের কাছেও গীতা দে ছিলেন অত্যন্ত কাছের মানুষ, প্রায় মায়ের মতোই।
শুধু পর্দার সম্পর্ক নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও গীতা দে-র সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর। অনামিকা সাহা সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ছোটবেলায় তিনি প্রায়ই শুটিং ফ্লোরে গীতা দে-র সঙ্গে সময় কাটাতেন। মেকআপ রুমে বসে গল্প করতে করতে কখনও কখনও তিনি গীতা দে-র পা টিপে দিতেন। আর সেই সময়েই তিনি বলতেন, “মা, একটু অভিনয় শিখিয়ে দাও না।” সেই আবেগঘন মুহূর্তগুলোই ধীরে ধীরে তাঁদের সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করলেও, অনামিকা সাহার ক্যারিয়ারের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল নেতিবাচক চরিত্র। তিনি জানান, সেই কারণেই একসময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও তার প্রভাব পড়েছিল। বিয়ের পর তাঁর শ্বশুরমশাই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন অভিনয় ছেড়ে দিতে। কারণ তাঁর মতে, অনামিকার গলা খুব মিষ্টি এবং তিনি চাইতেন অনামিকা যেন অভিনয়ের বদলে শুধু রেডিওতে কাজ করেন।
অভিনেত্রী বলেন, “আমি যেহেতু নেগেটিভ চরিত্র বেশি করতাম, তাই আমার শ্বশুরমশাই বলেছিলেন, অভিনয় ছেড়ে শুধু রেডিওতে কাজ করো। তোমার গলা এত সুন্দর।” পরিবারের সেই পরামর্শ মেনে তিনি কিছু সময়ের জন্য সিনেমা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন এবং রেডিওর কাজে মন দিয়েছিলেন।
তবে সেই সময়ই গীতা দে তাঁকে অন্যভাবে ভাবতে বলেন। অনামিকার কথায়, গীতা দে তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে শুধুমাত্র কারও কথায় অভিনয় ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়। তাঁর মতে, অভিনয় এমন একটা জায়গা যেখানে নিজের ভালোবাসা ও প্রতিভা দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। গীতা দে-র সেই কথাই অনামিকাকে আবার অভিনয়ে ফিরে আসার সাহস দেয়।
রেডিওর জগতেও অনামিকা সাহার অবদান কম নয়। তিনি জানান, জীবনে প্রায় পাঁচ হাজারের মতো শ্রুতি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে অভিনয়ের আরেকটি আলাদা জগতের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এবার আবার বড়পর্দায় ফিরে আসছেন তিনি ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’ (Phul Pishi O Edward) ছবির মাধ্যমে। পরিচালক নন্দিতা রায় (Nandita Roy) এবং শিবপ্রসাদ মুখার্জী (Shiboprosad Mukherjee)-এর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে তিনি যে খুব খুশি, তা স্পষ্ট তাঁর কথাতেই। তিনি জানান, এই ছবিতে তাঁর চরিত্র দর্শকদের অবাক করবে।
নিজের চরিত্র সম্পর্কে খুব বেশি কিছু না বললেও একটু ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। অনামিকা বলেন, দর্শক তাঁকে এতদিন কমেডি, ভিলেন কিংবা ইতিবাচক নানা ধরনের চরিত্রে দেখেছেন। কিন্তু এই ছবিতে তাঁর চরিত্রে থাকবে অন্যরকম চমক। ছবির বেশিরভাগ সময়ই তাঁকে দেখা যাবে হুইলচেয়ারে বসে অভিনয় করতে। তবে সেই চরিত্রের মধ্যেই লুকিয়ে থাকবে বিশেষ এক চমক, যা দর্শকদের চমকে দেবে বলেই তাঁর বিশ্বাস।
দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতা, কিংবদন্তি শিল্পীদের সান্নিধ্য এবং নিজের সংগ্রামের গল্প সব মিলিয়ে অনামিকা সাহার এই খোলামেলা কথোপকথন যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়, টলিউডের এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর যাত্রাপথ কতটা সমৃদ্ধ এবং স্মৃতিতে ভরা। আর সেই স্মৃতির অন্যতম উজ্জ্বল অংশ হয়ে রয়েছেন তাঁর ‘গীতা মা’ অভিনেত্রী গীতা দে (Gita Dey)।