Biplab Chatterjee:দীর্ঘদিন পর আবার শুটিং ফ্লোরে দেখা গেল প্রবীণ অভিনেতা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়(Biplab Chatterje)-কে। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ইদানীং বড়পর্দায় তাঁর উপস্থিতি কমে গেলেও, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর উচ্ছ্বাসে এখনও কোনও ঘাটতি নেই। পায়ের ব্যথা, শারীরিক অস্বস্তি সবকিছুকেই যেন ‘অ্যাকশন’ শব্দটা মুহূর্তে ভুলিয়ে দেয় তাঁকে। সম্প্রতি অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়(Agnidev Chatterjee)-এর নতুন ছবি ‘চোর’-এর শুটিংয়ে অংশ নিতে গিয়ে নিজের কাজের কারণ এবং আর্থিক বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করেন তিনি। আর সেখানেই উঠে আসে এক বিতর্ক উসকে দেওয়া সংলাপ, “আমি তো চু’রি করিনি, তাই এখনও অর্থের জন্য কাজ করতে হয়।”
টলিপাড়ার দর্শকদের কাছে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় মানেই বড়পর্দার শক্তিশালী খলনায়ক। এক সময় তাঁর উপস্থিতিই ছিল ছবির আলাদা আকর্ষণ। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে কাজের ধরন, বদলেছে পারিশ্রমিকের অঙ্কও। বর্তমানে নিয়মিত কাজ না করলেও, অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটুট। কিন্তু শুধুই কি ভালোবাসা তাঁকে শুটিং ফ্লোরে ফিরিয়ে এনেছে? অভিনেতার বক্তব্যে স্পষ্ট আবেগের পাশাপাশি রয়েছে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতাও।
অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহু দিনের। সেই ব্যক্তিগত বন্ধন থেকেই আবার নতুন করে কাজের সূত্রপাত। এক সাক্ষাৎকারে বিপ্লব জানান, শরীর তাঁর খুব একটা সঙ্গ দিচ্ছে না। পায়ে দীর্ঘদিনের ব্যথা রয়েছে। তবুও যখন কেউ কাজের জন্য ডাকেন, তখন তিনি না বলতে পারেন না। অগ্নিদেবের পরিবারের সঙ্গেও দীর্ঘদিনের আত্মীয়তার মতো সম্পর্ক রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর কথায়, কারও সঙ্গে তাঁর কোনও শত্রুতা নেই, তাই কাজের প্রস্তাব এলে তা গ্রহণ করতেই ভালো লাগে।
তবে এই ফিরে আসার নেপথ্যে শুধুই আবেগ কাজ করছে না সেটাও অকপটে স্বীকার করেছেন অভিনেতা। তাঁর মতে, যে সময়ে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন, তখনকার পারিশ্রমিক বর্তমান সময়ের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। বহু বছরের অভিনয়জীবন সত্ত্বেও তিনি এত আর্থিক সঞ্চয় করতে পারেননি যে এখন নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারবেন। সেই কারণেই এখনও রোজগারের প্রয়োজন অনুভব করেন। আর সেই প্রসঙ্গেই তাঁর মন্তব্য, “আমরা যে সময়ে কাজ করতাম, তখন এত টাকা পাওয়া যেত না। খুব বেশি পারিশ্রমিক পেতাম না যে, এখন আর কাজ না করলেও চলবে। আর আমি তো নেতাদের মতো চুরি করিনি। তাই অর্থের জন্য আমাকে কাজ করতে হয়। অন্তত নিজের জন্য তো দরকারই।”
এই বক্তব্যই এখন চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। যদিও তিনি কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি, তবু তাঁর মন্তব্যে যে রাজনৈতিক ইঙ্গিত রয়েছে, তা অনেকে খেয়াল করেছেন। প্রবীণ অভিনেতার এই সরল অথচ তীক্ষ্ণ মন্তব্য ইতিমধ্যেই নানা মহলে আলোড়ন ফেলেছে।
অন্যদিকে, তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে অনুরাগীদের। বয়সজনিত সমস্যার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পায়ের ব্যথা তাঁকে কষ্ট দেয়। তবু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে যেন সমস্ত যন্ত্রণা দূরে সরে যায়। অভিনয়ের প্রতি এই অদম্য টানই তাঁকে বারবার ফিরিয়ে আনে সেটে। তাঁর কথাতেই, ‘অ্যাকশন’ শুনলেই বয়স আর অসুস্থতা যেন উধাও হয়ে যায়।
আগামী দিনে তাঁকে কি আরও বেশি করে বড়পর্দায় দেখা যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে অভিনেতা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কাজের জন্য তিনি কারও কাছে অনুরোধ করতে পারবেন না। তাঁর আত্মসম্মানবোধ এখনও অটুট। কেউ যদি কাজের প্রস্তাব দেন, তিনি অবশ্যই সাড়া দেবেন কিন্তু কাজ ভিক্ষা চেয়ে নেবেন না। এই সোজাসাপ্টা অবস্থানই যেন তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পরিচায়ক।প্রবীণ অভিনেতার কথায়, “কাজের জন্য ভিক্ষা চাইতে পারব না। যদি কেউ যোগাযোগ করেন, অবশ্যই কাজ করতে রাজি।”
অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়ের ‘চোর’ ছবিতে তাঁকে দেখা যাবে এক দুষ্টু নেতার ভূমিকায়। চরিত্রটি নিয়ে এখনও বিস্তারিত কিছু প্রকাশ না হলেও, খলনায়কের চরিত্রে তাঁর দক্ষতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। দর্শকরাও আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন, কেমনভাবে তিনি আবারও সেই পরিচিত শক্তিশালী উপস্থিতি নিয়ে বড়পর্দায় ধরা দেন।
সব মিলিয়ে, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের এই প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র একটি ছবির কাজ নয় বরং এক প্রবীণ শিল্পীর জীবনসংগ্রাম, আত্মসম্মান আর পেশাদারিত্বের এক বাস্তব চিত্র। ভালোবাসা তাঁকে টানে, কিন্তু বাস্তবতার দায়ও তাঁকে কাজের পথে ঠেলে দেয়। আর সেই পথেই হাঁটতে হাঁটতেই তিনি বলে ফেলেন এমন এক সংলাপ, যা নিছক ব্যক্তিগত মন্তব্যের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
শরীর সঙ্গ না দিলেও, মন যে এখনও অদম্য তা আর একবার প্রমাণ করলেন বড়পর্দার এই দুঁদে খলনায়ক। অভিনয় তাঁর নেশা, আবার প্রয়োজনও। আর সেই প্রয়োজনের কথাই অকপটে জানিয়ে দিলেন তিনি, “চু’রি করিনি বলেই এখনও কাজ করি।”