Debolinaa Nandy: জনসমক্ষে আবারও এলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী দেবলীনা নন্দী(Debolina Nandy)। দীর্ঘদিনের শারীরিক অ’সু’স্থ’তা, মানসিক টানাপোড়েন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় চলা একাধিক বিতর্কের পর অবশেষে একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে নিজের বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট করলেন তিনি। শরীরের দিক থেকে অনেকটাই সু’স্থ হলেও, মনের গভীরে জমে থাকা ক্ষ’ত যে এখনও টাটকা, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট।
সম্প্রতি দেবলীনার শারীরিক অবস্থা ও একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে ঘিরে। ‘৭৮’যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে নেটদুনিয়ায় কম জলঘোলা হয়নি। সেই প্রসঙ্গেই শিল্পী নিজে মুখ খুলে জানান, বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকলে কেউই বুঝতে পারবে না এমন পরিস্থিতির ভ’য়া’ব’হ’তা কতটা। তাঁর ভিডিও বার্তায় যেমন ছিল আবেগ, তেমনই ছিল তীব্র প্রতিবাদ।
ভিডিওতে দেবলীনা জানান, গত ১৫ দিন তাঁর জীবনে ছিল এক ভ’য়ং’ক’র ঝড়ের মতো। শারীরিকভাবে তিনি যে কতটা সংকটজনক অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, তা বোঝাতে গিয়ে শিল্পী বলেন, “প্রায় আড়াই দিন আমি আইসিইউ-তে ছিলাম। তখন আমার কোনো হুঁশ ছিল না।” তাঁর স্মৃতির ভাণ্ডার থেকেও যেন সেই সময়ের বহু অংশ মুছে গিয়েছে। পিজি হাসপাতালে স্থানান্তরের পর প্রথম পাঁচ দিনে কে কে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, কী ঘটেছিল সে সবই তাঁর মনে নেই।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছে বলেই মনে করছেন অনেকে। কারণ, একজন শিল্পী যিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষের সামনে গান করেন, সেই মানুষটিই একসময় জীবন-মৃ’ত্যু’র সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিলেন, একথা শুনেই শিউরে উঠছেন তাঁর অনুরাগীরা।
হা’স’পা’তা’ল থেকে ছাড়া পেলেও যে শরীর এখনও পুরোপুরি সঙ্গ দিচ্ছে না, তা গোপন করেননি দেবলীনা। তাঁর কথায় উঠে এসেছে একাধিক শারীরিক সমস্যার কথা। লিভার ও কিডনির জটিলতার জন্য বর্তমানে তাঁকে কড়া মেডিকেশনের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখা দিচ্ছে প্রবল শ্বাসকষ্ট।
তিনি স্পষ্ট করে জানান, কথা বলতে বা গান গাইতে গেলেই মাঝপথে হাঁপিয়ে উঠছেন। তবুও কাজ থেকে দূরে থাকতে চাননি। চিকিৎসকের পরামর্শেই তিনি নিজের কাজে নিজেকে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। দেবলীনাই জানান, “ডাক্তার বলেছেন, নিজের কাজের মধ্যে থাকলে ভালো লাগবে। তাই সত্যজিৎ দার সহযোগিতায় ১৫ তারিখ থেকে শো শুরু করেছি।” তবে শারীরিক অসুবিধা হলে মাঝেমধ্যে ব্রেক নিচ্ছেন, জল খাচ্ছেন, তবুও গান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে যে সব গুঞ্জন, ক’টা’ক্ষ আর ট্রো’লিং চলছে, তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে একটি সংখ্যা— ‘৭৮’। এই সংখ্যা নিয়েই তাঁকে বারবার বিদ্রুপের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁর। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, হা’স’পা’তা’লে থাকাকালীন তাঁর মতো একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া বহু মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রে ওষুধের সংখ্যা ছিল ১২০ বা ১৩০-ও, তবুও সময়মতো চিকিৎসা পেয়ে তাঁরা সুস্থ হয়েছেন।
এই উদাহরণ টেনে দেবলীনা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে নিয়ে তাঁকে বারবার নিশানা করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, যারা সবকিছুতেই মেয়েদের দোষ খোঁজে, বা না জেনেই মন্তব্য করে, তারা কোনোদিনই তাঁর মানসিক অবস্থাটা বুঝতে পারবে না।
সমালোচকদের উদ্দ্যেশ্য দেবলীনার বার্তা ছিল একেবারে সোজাসাপটা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যাদের আমাকে নিয়ে এত সমস্যা, যদি ভালো না লাগে আমাকে দেখো না, আমাকে শুনো না, কিচ্ছু করো না।” তাঁর মতে, যারা সারাক্ষণ অন্যের খুঁত ধরতেই ব্যস্ত, তাদের জীবন নিয়ে তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই।
ভিডিওতে তাঁকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেও দেখা যায়। বিশেষ করে ‘৭৮’ সংখ্যাটি নিয়ে চলা ট্রো’লিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতদিন তিনি শুধু এটুকুই বলেছেন, ভগবান না করুক, এমন অভিজ্ঞতা যেন কারও না হয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে তাঁকে বলতে বাধ্য হতে হচ্ছে, ভগবান করুক, যারা তাঁকে নিয়ে উপহাস করছে, তারা যেন জীবনে একবার অন্তত এমন কিছু অনুভব করে, যা তিনি ফেস করেছেন। তাঁর অভিযোগ, একজন মানুষ যখন মানসিকভাবে শক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, তখন বারবার সেই সংখ্যাটা দিয়ে খোঁচা মারা এক ধরনের মানসিক অ’ত্যা’চা’র।
মৃ’ত্যু’র মুখ থেকে ফিরে আসার পর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যে বদলে গিয়েছে, তা দেবলীনাই স্বীকার করেছেন। ভিডিওর শেষে তিনি বলেন, এমন অভিজ্ঞতার পরই মানুষ জীবনের দ্বিতীয় সুযোগের প্রকৃত মূল্য বুঝতে পারে। তাঁর মতে, যারা একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন, তারাই কেবল তাঁর যন্ত্রণার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারবেন।
এই উপলব্ধি তাঁকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে বলেই মনে করছেন অনেকে। সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে দুনিয়ার আড়ালে যে বাস্তব জীবন কতটা কঠিন হতে পারে, দেবলীনাই যেন তার এক জীবন্ত উদাহরণ।
নিজেকে একজন ‘ঠাকুরভক্ত’ হিসেবেই পরিচয় দেন দেবলীনা। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, তিনি মন থেকে কখনও কারও ক্ষতি চাননি, এখনও চান না। সারাক্ষণই তিনি ঈশ্বরের কথাতেই থাকেন। তাঁর বিশ্বাস, যারা তাঁকে ভুল বুঝছে বা ক’টা’ক্ষ করছে, তারা আসলে তাঁর মনের অবস্থাটা বোঝার ক্ষমতা রাখে না। এই বিশ্বাসই হয়ত তাঁকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করছে এমনটাই মনে করছেন তাঁর ঘ’নি’ষ্ঠমহলের একাংশ।
সম্প্রতি তাঁকে কেন নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন দেবলীনা। তিনি জানান, আপাতত ভ্লগিং থেকে কিছুটা দূরে থাকতে চান। গান-বাজনাতেই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চান এবং নিজের জন্য সময় নিতে চান। তবে ভক্তদের অনুরোধে মাঝেমধ্যে ভিডিও করার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
ভিডিও বার্তার শেষে দেবলীনা ধন্যবাদ জানিয়েছেন তাঁর সেইসব অনুরাগীদের, যারা এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানসিক সমর্থন এবং ইতিবাচক শক্তি দিয়ে তাঁকে ভরসা জুগিয়েছেন যারা, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “থ্যাঙ্ক ইউ সবাইকে, যারা এখনও আমাকে মেন্টাল সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছ এবং পজিটিভিটি আমার অব্দি পৌঁছে দিচ্ছ।”
সব মিলিয়ে, দেবলীনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক শুধু একটি সংখ্যা বা একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানসিক স্বাস্থ্যের মতো এক সংবেদনশীল বিষয়কে সামনে এনে দিয়েছে, যেখানে সহানুভূতির বদলে ক’টা’ক্ষ’ই বেশি জায়গা করে নিচ্ছে। দেবলীনাই যেন সেই বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, জীবন যু’দ্ধে’র ময়দান থেকে ফিরে এসে।