টলিউড ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ ছবি রিলিজ পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে খোলামেলা ও স্পষ্ট বক্তব্য রাখলেন অভিনেতা-প্রযোজক দীপক অধিকারী (Deepak Adhikari)ওরফে দেব (Dev)। কথাবার্তায় উঠে এল ক্ষো’ভ, হ’তা’শা, দায়িত্ববোধ এবং বাংলা সিনেমার প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের দায়বদ্ধতার কথা। বিশেষ করে ২০২৬ সালের পুজোর রিলিজ ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে দেবের মন্তব্য ইতিমধ্যেই ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
সাক্ষাৎকারে দেব প্রথমেই টলিউডে পেশাদারিত্বের অভাব এবং পারস্পরিক ঈর্ষার বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁর মতে, ইন্ডাস্ট্রির ভিতরে সুস্থ প্রতিযোগিতার বদলে এক ধরনের পরশ্রীকাতরতা কাজ করছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে এত বন্ধুত্ব আছে যে, সেখানে যে যত পড়বে, তার তত বেশি লাভ হবে, তত বেশি হাসবে আর কি। মানে কারও ছবি যদি ফ্লপ হয়, অন্যদিকে বিরিয়ানি বাটা হয়।”
দেবের এই মন্তব্যে স্পষ্ট, কারও ব্যর্থতায় আনন্দ পাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা তিনি মেনে নিতে পারছেন না।
২০২৬ সালের পুজোর রিলিজ ঘিরে একটি নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার তৈরির প্রস্তাব নিয়েও তিনি তীব্র আপত্তি জানান। দেবের মতে, এই ধরনের রিলিজ ক্যালেন্ডার নতুন পরিচালক ও প্রযোজকদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, “তুমি যদি ক্যালেন্ডার সেট করে দাও, তাহলে নতুন ডিরেক্টররা কোনোদিন সুযোগ পাবে না। নতুন প্রডিউসাররা ইনভেস্ট করার আগে ভয় পাবে যে সব ডেট তো সবাই নিয়ে নিয়েছে, তাহলে আমি যে ইনভেস্ট করব সেই টাকাটা রিটার্ন হবে কী করে?” দেব মনে করেন, এভাবে আগাম সব তারিখ দখল করে রাখলে ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন রক্ত প্রবেশ করার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।
এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে আরও গুরুতর একটি বিষয়। দেব জানান, ইন্ডাস্ট্রির একটি কমিটির পক্ষ থেকে তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছিল যেন তিনি ২০২৬ সালের পুজোয় তাঁর ছবি রিলিজ না করেন। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “প্রথম লাইনটা ছিল যে ‘দেব তুমি ২০২৬ পুজোতে রিলিজ কোরো না’। আমি বললাম তুমি আমাকে দুটো লাইনে লিখে দাও আমি কেন ২০২৬ পুজোতে রিলিজ করব না? কাল যখন আমাকে প্রেস জিজ্ঞেস করবে, আমাকে তো কিছু বলতে হবে।” দেবের বক্তব্যে স্পষ্ট, কোনও যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া তাঁকে এই সিদ্ধান্ত মানতে বলা হলে তিনি তা মেনে নিতে প্রস্তুত নন।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেব বাংলা ছবির জন্য তাঁর অতীতের অবদানের কথাও মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “যে লকডাউনে ছবি রিলিজ করেছে, তখন কেউ রিলিজ করেনি। সাউথ বা বোম্বে বড় বড় হিরোদের সামনে কোনো বাংলা ছবি রিলিজ হয় না, সেখানে আমি গিয়ে বাংলার সম্মান রাখার জন্য রিলিজ করেছি।” তাঁর মতে, কঠিন সময়েও তিনি ঝুঁকি নিয়ে ছবি মুক্তি দিয়েছেন শুধুমাত্র বাংলা সিনেমাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়বদ্ধতা থেকেই।
কোনও যুক্তিহীন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেব আরও বলেন, “তুমি এমন একটা ছেলেকে বলছ তুমি ছবি করবে না কোনো যুক্তি ছাড়া, যে ছেলেটা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বাংলা ছবির প্রচার করে যাচ্ছে। বাংলা ভাষাকে ধরে রেখেছে, ইন্ডাস্ট্রিকে ধরে রেখেছে।” এই বক্তব্যে তাঁর আবেগ যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনই ইন্ডাস্ট্রির প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার কথাও উঠে এসেছে।
সাক্ষাৎকারে দেব আরও জানান, বর্তমানে ইন্ডাস্ট্রিতে অসহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, কেউ আর সামগ্রিকভাবে টলিউডের ভালোর জন্য লড়ছে না। বরং তিনি অনুভব করছেন, “সবাই দেবের বিরুদ্ধে লড়তে ব্যস্ত।” কেন তাঁকে ঘিরে এত বিরোধিতা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেতা। তিনি বলেন, “আমার ভুলটা কী? যে ব্যাক টু ব্যাক ভালো ছবি করছি?”
ইন্ডাস্ট্রির মানসিকতা বোঝাতে দেব একটি শক্তিশালী উপমাও ব্যবহার করেন। তাঁর কথায়, “আগে হত যে গাছে ফল হয় সেই গাছটাকে ঝুঁকতে হয়… কিন্তু এখন হচ্ছে যে গাছে ফল হয় সেই গাছটাকে কেটে ফেলে দাও কারণ অন্য গাছে ফল হচ্ছে না।”
এই তুলনার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সফল কাউকে সমর্থন করার বদলে তাঁকে টেনে নামানোর প্রবণতাই এখন বেশি।
রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলেও দেব স্পষ্ট করে দেন, বিষয়টি কোনও নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নয়। তাঁর মতে, যারা বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁরা হয়ত কোনও না কোনও দলের অংশ হতে পারেন, কিন্তু সমস্যাটা আরও গভীরে। মূল সমস্যা হল পারস্পরিক সমঝোতার অভাব।
এই জায়গা থেকেই তিনি মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। দেবের মতে, ইন্ডাস্ট্রির কমিটির কাজ হওয়া উচিত প্রযোজকদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা। তিনি বলেন, “এই কমিটির মানেটা হওয়া উচিত মিউচুয়ালি আন্ডারস্ট্যান্ডিং করানো… কোথায় আমার দুটো লাগবে, কোথায় তোমার বাড়তি আরও দুটো লাগবে এভাবে মিউচুয়ালি আন্ডারস্ট্যান্ডিং করে লাভ আছে।”
আরও পড়ুন:Anindita Bose:এক নয়, একাধিক স’ম্প’র্ক ভা’ঙ’ন! অনিন্দিতা বসুর জী’ব’নে প্রে’ম কি শুধুই অধ্যায় বদল?
সবশেষে, নতুনদের আটকানোর যে সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, তার বিরুদ্ধেও সাফ অবস্থান নেন দেব। তিনি বলেন, “কেউ আসবে না আর তুমি তাঁকে আসতে দেবে না এই কালচারটা ভুল। আমি তাঁর বিরুদ্ধে।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করে দেন, টলিউডের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে হলে নতুন প্রতিভাদের জন্য দরজা খোলা রাখাই একমাত্র পথ।
সব মিলিয়ে, এই সাক্ষাৎকারে দেবকে দেখা গেছে আবেগপ্রবণ, স্পষ্টভাষী এবং টলিউডের বর্তমান রাজনীতিতে গভীরভাবে বিরক্ত একজন শিল্পী হিসেবে। তাঁর বক্তব্য যে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনা তৈরি করবে, তা বলাইবাহুল্য।