Dipsita-Saayoni: পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে রাজ্য সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের ‘ভাতা’ নিয়ে সরব হলেন দীপ্সিতা ধর(Dipsita Dhar)। তিনি একজন ভারতীয় ছাত্রনেত্রী এবং ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের (SFI) সর্বভারতীয় যুগ্ম সম্পাদক। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২১-এ বালি কেন্দ্র থেকে ভারতের মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআইএম))-এর প্রার্থী হিসেবেও লড়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে রাজ্য সরকারের একাধিক অনুদানভিত্তিক প্রকল্প নিয়ে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন এবং স্থায়ী কর্মসংস্থান বনাম ভাতানীতির বিতর্ককে নতুন করে সামনে আনেন।
সাক্ষাৎকারে দীপ্সিতা স্পষ্ট করে জানান, অস্থায়ী আর্থিক সহায়তার বদলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে রাজ্যের বহুল আলোচিত প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী এবং বিভিন্ন ক্লাবকে দেওয়া সরকারি অনুদান। এই প্রকল্পগুলিকে কেন্দ্র করে তিনি সরকারের অগ্রাধিকার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
দীপ্সিতার মতে, হাতে গোনা কিছু টাকা মাসিক ভাতা হিসেবে দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয় না। বরং যুবসমাজের জন্য স্থায়ী চাকরি, শিল্পোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই হওয়া উচিত প্রশাসনের মূল ফোকাস। তিনি মনে করেন, আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভোগা তরুণ প্রজন্মকে স্বাবলম্বী করে তোলার বদলে ভাতার ওপর নির্ভরশীল করে তোলা এক ধরনের বিপজ্জনক প্রবণতা।
নিজের বক্তব্যে সাধারণ পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতার উদাহরণ টেনে আনেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, কেন একজন মানুষ, যিনি দিনে আট ঘণ্টা পরিশ্রম করেন, তিনিও নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সরকারি সহায়তার দিকে তাকিয়ে থাকবেন?
সাক্ষাৎকারে তিনি অভিনেত্রী ও রাজনীতিবিদ সায়নী ঘোষ(Saayoni Ghosh)-এর সম্প্রতি করা একটা মন্তব্য নিয়ে মুখ খোলেন।সায়নির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সায়নী সেদিন মাইকে বলেছে, ‘এখন দাদারা আসে বৌদির কাছে বলছে লক্ষীর ভাণ্ডারের টাকাটা ঢুকেছে একশোটা টাকা দেবে একটু পেট্রল ভরতাম বাইকে ‘শুনতে খুব ভালো লাগছে মনে হচ্ছে উম্যান ইম্পওয়ারমেন্ট(woman impowerment)। কিণ্তু তাঁর প্রশ্নটা এখানেই। দীপ্সিতা বলেন, “আমার বাড়ির যিনি দাদা, যিনি দিনে আট ঘণ্টা কাজ করেন, তিনি আট ঘণ্টা কাজ করার পরেও নিজের বাইকের পেট্রোল নিজেই ভরাতে পারছেন না কেন? তাঁকে কেন সেই ২০০০ টাকার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে?”
এই বক্তব্যে তিনি মূলত শ্রমের যথাযথ মূল্য এবং আয়ের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, কাজ থাকা সত্ত্বেও যদি জীবনযাত্রার মৌলিক ব্যয় মেটানো না যায়, তবে তা বৃহত্তর অর্থনৈতিক ব্যর্থতারই ইঙ্গিত বহন করে। ভাতা সেই কাঠামোগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয় বরং তা সাময়িক উপশম মাত্র।
সরকারের নীতির সমালোচনায় আরও কড়া সুর শোনা যায় তাঁর কথায়। দীপ্সিতার অভিযোগ, একদিকে সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ বিলিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে স্থায়ী চাকরি, ডিএ (Dearness Allowance) কিংবা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক অধিকারের ক্ষেত্র সংকুচিত করছে।
তিনি বলেন, “আমি ক্লাবে টাকা দিচ্ছি, তাই আমি সরকারি চাকরির ডিএ-টা বন্ধ করে দিলাম। আমি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিচ্ছি, তাই আমি স্থায়ী চাকরি আর দেব না। আমি তোমাকে কন্যাশ্রী দিচ্ছি, তাই মেয়েদের বাকি যে বৃত্তিগুলো বা চাকরির জায়গাগুলো ছিল, সেই জায়গাগুলো আমি বন্ধ করে দিলাম এটা ‘আইদার দিস অর দ্যাট’ হতে পারে না।”
এই মন্তব্যে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প এবং স্থায়ী কর্মসংস্থান এই দুইকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখানো উচিত নয়। তাঁর মতে, একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দেবে। একটি দিয়ে অন্যটি ঢেকে দেওয়া নীতিগতভাবে ভুল।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পকে অনেকেই নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। একইভাবে কন্যাশ্রী-কে মেয়েদের শিক্ষায় উৎসাহ ও আর্থিক সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়। কিন্তু দিপ্সিতার বক্তব্যে উঠে এসেছে অন্য দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর মতে, এই প্রকল্পগুলোর ইতিবাচক দিক থাকলেও এগুলোর আড়ালে বৃহত্তর কর্মসংস্থানের সংকটকে আড়াল করা হচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যখন অসংখ্য যোগ্য চাকরিপ্রার্থী SSC বা PSC পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও দীর্ঘদিন চাকরি পাচ্ছেন না, তখন মাসিক ভাতা দিয়ে কি সেই বেকারত্বের যন্ত্রণা কমানো সম্ভব? তাঁর মতে, শিক্ষিত বেকারদের জন্য প্রকৃত সমাধান হলো স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং স্থায়ী পদে নিয়োগ, সামান্য আর্থিক অনুদান নয়।
রাজ্যে ক্লাব সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন উৎসব ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ক্লাবগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ক্লাবগুলিকে সরকারি অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দিপ্সিতা। তাঁর মতে, যখন রাজ্যে কর্মসংস্থান ও শিল্পোন্নয়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন অর্থের অগ্রাধিকার নির্ধারণে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
তিনি ইঙ্গিত দেন, সরকারি অর্থের ব্যবহার যদি উৎপাদনশীল খাতে যেমন শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কর্মসংস্থান বেশি বিনিয়োগ করা হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তার সুফল অনেক বেশি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, দীপ্সিতা ধর যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয় বরং রাজ্যের উন্নয়ন মডেল নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার ইঙ্গিত। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প কি স্বনির্ভরতার পথে সেতুবন্ধন, নাকি তা নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি তৈরি করছে এই প্রশ্ন এখন জনপরিসরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ভাতা বনাম চাকরি এই দ্বন্দ্বের সহজ উত্তর নেই। তবে দিপ্সিতা ধরের বক্তব্য স্পষ্ট করেছে, যুবসমাজের বড় অংশ স্থায়ী কাজ, ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ চাইছে। রাজ্যের নীতিনির্ধারণে এই বার্তা কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। আপাতত তাঁর কড়া মন্তব্য রাজনীতির অঙ্গনে নতুন বিতর্কের আগুন জ্বালিয়েছে।