Tanuka Chatterjee: অভিনয় জীবনের দীর্ঘ পথচলায় সাফল্য, জনপ্রিয়তা, স্বীকৃতি সবই পেয়েছেন। তবু কোথাও যেন এক অপূর্ণতার সুর। নিজের অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে খুশির কথা বললেও অন্তরের গভীরে কি জমে রয়েছে আক্ষেপ? সমাজমাধ্যমে একটি মাত্র শব্দবন্ধ ‘ইন্ডাস্ট্রি?’ তার পাশে ভয়ের ইমোজি। আর তাতেই শুরু জল্পনা। অভিনেত্রী তনুকা চট্টোপাধ্যায়(Tanuka Chatterjee)-এর সেই পোস্ট ঘিরে নেটমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে নানা ব্যাখ্যা, নানা মত।
অর্থনীতিতে স্নাতক স্তরের ছাত্রী ছিলেন তিনি। বয়স তখন মাত্র ২১ কিংবা ২২। সামনে ছিল এক উজ্জ্বল একাডেমিক ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই পথ ছেড়ে হঠাৎই পা বাড়ান অভিনয়ের জগতে। প্রথমে মঞ্চ, তারপর ছোটপর্দা। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। ‘গাঁটছড়া’, ‘গুড্ডি’, ‘কথা’ একাধিক জনপ্রিয় ধারাবাহিকে তাঁর উপস্থিতি দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
তবে সম্প্রতি তাঁর একটি পোস্ট ঘিরে প্রশ্নের ঝড় ওঠে। ‘ইন্ডাস্ট্রি?’ এই শব্দের পাশে আতঙ্কের ইঙ্গিতবাহী ইমোজি দেখে অনেকে অনুমান করেন, হয়ত কোনও অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত দিচ্ছেন তিনি। কেউ কেউ সরাসরি জানতে চান, কিছু কি ঘটেছে? কিন্তু অভিনেত্রী নীরব থাকেন। স্পষ্ট কোনও অভিযোগ তোলেননি। বরং এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, “আমি ভালো আছি। একের পর এক ধারাবাহিকে অভিনয় করছি। দর্শক প্রশংসা করছেন। ভালো লাগছে।”
তবে কথার ফাঁকে ফাঁকেই যেন বেরিয়ে আসে অন্য সুর। একটু থেমে তিনি যোগ করেন, “চারপাশে মাঝেমধ্যে এমন অনেক কিছু চোখে পড়ে, যা দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। তখন দীর্ঘশ্বাস পড়ে। বেরিয়ে আসে টুকরো কথা।” এর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি। কিন্তু এই সামান্য স্বীকারোক্তিই যেন ইঙ্গিতবাহী।
অতীতে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয় তাঁর পথচলার লড়াই। অর্থনীতির পড়াশোনা ছেড়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত মোটেই সহজ ছিল না। পরিবারের সমর্থন তখন ছিল না তাঁর পাশে। মা-বাবা এবং বাড়ির বড়রা নাকি রাগে সাত দিন কথা বলেননি তাঁর সঙ্গে। কিন্তু সিদ্ধান্ত থেকে সরেননি তনুকা। অভিনয় ছিল তাঁর প্রথম প্রেম বিশেষ করে মঞ্চ।
মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার পর ছোটপর্দায় আসা। সেই সময়কার কাজের প্রসঙ্গে তাঁর গলায় আজও নস্টালজিয়ার সুর। তাঁর মতে, সেই সময়ের চরিত্রগুলিতে অভিনয়ের বিস্তর সুযোগ ছিল। চিত্রনাট্যে প্রতিটি চরিত্রের আলাদা মাত্রা থাকত। গল্পের পরতে পরতে থাকত আবেগ, গভীরতা। এখনো মঞ্চে সেই সুযোগ আছে বলেই মনে করেন তিনি। তবে ছোটপর্দার চিত্রনাট্যে আগের সেই বহুমাত্রিকতা আর খুঁজে পান না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদল এসেছে তাঁর চরিত্রচয়নেও। একসময় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করলেও এখন তিনি অনায়াসে মা, কাকিমা, মাসিমা কিংবা ঠাকুরমার চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রের পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয় তা তিনি মানেন। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেই যেন জমেছে এক অদৃশ্য প্রশ্ন।
হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, “আমার নিজের কোনও গল্প নেই। আমি যেন অন্যের গল্পের অংশমাত্র!” এই একবাক্যেই ধরা পড়ে তাঁর মনের অবস্থান। যেন তিনি বহু গল্পে উপস্থিত থেকেও কোনও গল্পের কেন্দ্র নন। অতীতের কথা মনে পড়লে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, “আমার কি কিছুই পাওনা নেই? ইন্ডাস্ট্রির থেকে কিছুই কি ‘ডিজার্ভ’ করি না?”
এই প্রশ্ন কি শুধুই ব্যক্তিগত? নাকি বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন? ইন্ডাস্ট্রির বদলে যাওয়া পরিবেশ কি তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে? তিনি অস্বীকার করেননি। জানিয়েছেন, পরিবর্তন তো সময়ের স্বাভাবিক নিয়ম। তাঁর নিজের মধ্যেও তো বদল এসেছে। তিনি আগের মতো নেই। তবে তাঁর অভিজ্ঞতায়, একসময় ইন্ডাস্ট্রিতে সংবেদনশীলতা এবং সহনশীলতা বেশি ছিল। মানুষ একে অপরের প্রতি বেশি অনুভূতিপ্রবণ ছিলেন।
তাঁর কথায়, “আমাদের সময়ের সমাজ বেশি অনুভূতিপ্রবণ ছিল। এখনকার প্রজন্ম শুধুই নিজেরটুকুই বোঝে।” তবে এই মন্তব্যের মধ্যেও তিনি দোষারোপের সুর রাখেননি। বরং স্বীকার করেছেন, বর্তমান প্রজন্ম এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা, দ্রুততা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা হয়তো সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে সমালোচনার পাশাপাশি স্বীকারোক্তিও আছে। তনুকা জানাতে ভোলেননি, নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে তিনিও ভালবাসা পান। দর্শকদের প্রশংসা, সহকর্মীদের সমর্থন সব মিলিয়েই তাঁর চলার পথ এখনও থেমে নেই।
তবু প্রশ্নটা থেকে যায়। একজন শিল্পী কি শুধুই অন্যের গল্পের অংশ হয়ে থাকতে পারেন? নাকি প্রত্যেক শিল্পীর নিজেরও একটি কেন্দ্রীয় গল্প থাকা উচিত? তনুকার বক্তব্যে সরাসরি অভিযোগ নেই, আছে অভিমান মেশানো দীর্ঘশ্বাস। আছে আত্মসমীক্ষা।
সাফল্য সত্ত্বেও অপূর্ণতার অনুভব শিল্পীর জীবনে এ নতুন নয়। কিন্তু যখন একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী প্রকাশ্যে বলেন, তাঁর নিজের কোনও গল্প নেই, তখন তা নিছক ব্যক্তিগত মন্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা হয়ে ওঠে বৃহত্তর শিল্পমাধ্যমের প্রতিচ্ছবি।
তনুকা চট্টোপাধ্যায়ের কথায় স্পষ্ট, তিনি কাজ করছেন, দর্শকের ভালোবাসা পাচ্ছেন, নিজের অবস্থান নিয়ে অখুশি নন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি অনুভব করছেন সময়ের পরিবর্তন, চরিত্রের পরিবর্তন, সম্পর্কের পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের মাঝেই কোথাও জমে উঠছে প্রশ্ন প্রাপ্য সম্মান কি সত্যিই মিলছে?
ইন্ডাস্ট্রিকে উদ্দেশ্য করে একটিমাত্র প্রশ্নচিহ্ন। তার পাশে ভ’য়। কিন্তু সেই ভ’য় ঠিক কিসের পরিবর্তনের? অবমূল্যায়নের? না কি শুধুই সময়ের স্রোতে নিজের জায়গা হারানোর আশঙ্কা? উত্তর দেননি তনুকা। তবে তাঁর কথাগুলো ইঙ্গিত দেয়, শিল্পীর মনের ভেতরে যে গল্পগুলো লেখা হয়, সেগুলোর সবটাই পর্দায় ধরা পড়ে না।