Hiranmoy Chattopadhyaya:অভিনেতা ও বিজেপি বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়(Hiranmoy Chattopadhyaya)-এর ব্যক্তি জীবন ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক নতুন মোড় নিল আদালতে। তাঁর করা আগাম জামিনের আবেদন মঞ্জুর করল কলকাতা হাইকোর্ট। আনন্দপুর থানায় দায়ের হওয়া মামলার প্রেক্ষিতে বিচারপতি জয় সেনগুপ্তের এজলাসে এই স্বস্তি পান হিরণ। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, প্রতি ১৫ দিন অন্তর তদন্তকারী অফিসারের কাছে হাজিরা দিতে হবে তাঁকে।
ঘটনার সূত্রপাত হিরণের দ্বিতীয় বিয়ের ছবি প্রকাশ্যে আসার পর। সেই ছবি সামনে আসতেই আনন্দপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন তাঁর প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়(Anindita Chatterjee)। অনিন্দিতার দাবি, তাঁদের এখনও আইনি বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়নি। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মামলা রুজু করে। পরে বিষয়টি আদালতে গড়ায় এবং হিরণ আগাম জামিনের আবেদন জানান।
হিরণের আগাম জামিন সংক্রান্ত মামলার শুনানির দিন ধার্য ছিল ৪ ফেব্রুয়ারি। তবে নির্ধারিত দিনে শুনানি না হয়ে তা পিছিয়ে যায়। এর মধ্যেই রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় হয়ে ওঠেন বিজেপি বিধায়ক। দলীয় প্রচারে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সমাজমাধ্যমেও একাধিক পোস্ট শেয়ার করতে দেখা যায় তাঁকে। ফলে রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত দুই ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন হিরণ।
গত ২৮ জানুয়ারি তাঁর আইনজীবী দ্রুত শুনানির আবেদন জানিয়ে বিচারপতি জয় সেনগুপ্তের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আদালতে তিনি জানান, তাঁর মক্কেল বর্তমানে একজন বিধায়ক। সেই কারণেই আগাম জামিনের বিষয়ে দ্রুত শুনানি প্রয়োজন বলে আবেদন জানান তিনি। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত শুনানি গ্রহণ করে এবং আগাম জামিন মঞ্জুর করে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছিল, হিরণের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৪৯৪ ও ৪৯৮-এ ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী, স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পুনরায় বিবাহ করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে ৪৯৮-এ ধারায় বিবাহিত মহিলার উপর স্বামীর নির্যাতন ও গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানার কথা বলা হয়েছে।
এই মামলার বিষয়ে প্রকাশ্যে এখনও পর্যন্ত কোনও মন্তব্য করেননি হিরণ। একইভাবে প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতাও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানাননি, যদিও থানায় অভিযোগ জানানোর পর সংবাদমাধ্যমের সামনে কিছু মন্তব্য করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় স্ত্রী ঋতিকা গিরিও মুখ খুলেছেন, যার ফলে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।
হিরণের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে প্রথম থেকেই রাজনৈতিক এবং সামাজিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষত অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায় প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন যে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়নি। তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাক, তার পর নাচতে নাচতে বিয়ে করুক। সে হিরণ চ্যাটার্জি ওকে বিয়ে করে কি না আমরা দেখব।” এই মন্তব্য সামনে আসার পর বিষয়টি আরও চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় স্ত্রী ঋতিকা গিরি(Ritika Giri)-র বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নেয়। বিয়ের শংসাপত্র নিয়ে থানায় যান অনিন্দিতা। তিনি স্পষ্ট জানান, আইনি বিচ্ছেদ ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই আনন্দপুর থানায় মামলা দায়ের হয় এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ৪৯৪ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা গুরুতর আইনি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। কারণ বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন না হওয়া অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ ভারতীয় দণ্ডবিধি তথা বর্তমান ন্যায় সংহিতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য। পাশাপাশি ৪৯৮এ ধারার অভিযোগও সংবেদনশীল, কারণ তা সরাসরি গার্হস্থ্য হিংসা ও মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত।
এই পরিস্থিতিতে আগাম জামিন মঞ্জুর হওয়ায় সাময়িক স্বস্তি পেলেও তদন্ত প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি পাননি হিরণ। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, তাঁকে নিয়মিত তদন্তকারী অফিসারের কাছে হাজিরা দিতে হবে। ফলে আইনি প্রক্রিয়া চলবে নিজের গতিতেই।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদিও সরাসরি দলীয় স্তরে বড় কোনও বিবৃতি সামনে আসেনি, তবুও একজন বর্তমান বিধায়কের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে। এর মধ্যেই দলীয় প্রচারে সক্রিয় থাকা এবং সমাজমাধ্যমে উপস্থিতি বজায় রাখা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে।
সমগ্র ঘটনাপ্রবাহে তিনটি দিক স্পষ্ট ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব। আদালত আপাতত আগাম জামিন দিলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও বাকি। তদন্তের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ শুনানির উপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।
এই মুহূর্তে প্রশ্ন একটাই ডিভোর্স সম্পন্ন না হওয়ার অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয় এবং আদালতে সেই প্রমাণ কতটা টেকে। পাশাপাশি ৪৯৮এ ধারার অভিযোগের তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আদালতের নির্দেশ মেনে হিরণ নিয়মিত হাজিরা দিলে তদন্ত এগোবে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, অভিনেতা-বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়েকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন আদালতের পর্যায়ে। আগাম জামিনে আপাত স্বস্তি মিললেও আইনি লড়াই এখনও শেষ হয়নি। নজর এখন তদন্তের গতিপ্রকৃতি এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশের দিকে।