Puja Banerjee: গ্ল্যামার জগতের আলো ঝলমলে পর্দার আড়ালে থাকে অসংখ্য সংগ্রাম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্প। সেই রকমই এক অনুপ্রেরণামূলক যাত্রার নাম অভিনেত্রী পূজা ব্যানার্জী (Puja Banerjee)। কলকাতার সাধারণ এক মেয়ের স্বপ্ন দেখা থেকে শুরু করে মুম্বইয়ের বিনোদন দুনিয়ায় নিজের জায়গা তৈরি করা তাঁর জীবনকথা অনেক তরুণ-তরুণীর কাছেই সাহস জোগানোর মতো।
পূজার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতাতেই। এই শহরের মাটিতেই প্রথম বড় অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি সেই স্বপ্নকেই লালন করেছেন তিনি। কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং শিল্পচর্চার আবহ তাঁর মনে অভিনয়ের বীজ বপন করেছিল বলেই মনে করেন অনেকে।
শিক্ষাজীবনের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন নিয়মিত ও মনোযোগী। কলকাতার সুপরিচিত সেন্টস পলস মিশন স্কুল (St. Paul’s Mission School)-এ পড়াশোনা করেন পূজা। স্কুলজীবন শেষ করে তিনি ভর্তি হন স্কটিশ চার্চ কলেজে এবং সেখান থেকেই স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই তাঁর মনে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, অভিনয়ই হবে তাঁর ভবিষ্যতের পথ।
সেই লক্ষ্যেই একসময় কলকাতা ছেড়ে মুম্বইয়ের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। স্বপ্নের শহর মুম্বইয়ে নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ নয় এ কথা অনেকেই জানেন। তবু দৃঢ় আত্মবিশ্বাস আর অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। ধীরে ধীরে টেলিভিশনের জগতে সুযোগ পেতে শুরু করেন পূজা।
হিন্দি টেলিভিশনের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা ঘটে। জনপ্রিয় ধারাবাহিক “কাহানি হামারী মহাভারত কি” (Kahaani Hamaaray Mahaabhaarat Ki)-তে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রথমবার দর্শকদের সামনে আসেন। এই ধারাবাহিকের মাধ্যমেই অভিনয় জগতে তাঁর আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়।
তবে দর্শকদের কাছে সত্যিকারের জনপ্রিয়তা এনে দেয় আরেকটি ধারাবাহিক “তুঝ সাং প্রীত লাগাই সাজনা” (Tujh Sang Preet Lagai Sajna)। এই সিরিয়ালে এক সাধারণ পাঞ্জাবি মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন পূজা। চরিত্রটির সরলতা এবং তাঁর অভিনয়ের সাবলীলতা খুব দ্রুত দর্শকদের মন জয় করে নেয়। কলকাতার মেয়ে হয়েও মুম্বইয়ের দর্শকদের কাছে তিনি অল্প সময়েই পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
টেলিভিশনে সাফল্যের পাশাপাশি বড় পর্দাতেও নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেন তিনি। দক্ষিণী চলচ্চিত্র জগতেও কাজের সুযোগ পান পূজা। তেলুগু ছবি “ভেডু থেডা” (Veedu Theda)-তে অভিনয়ের মাধ্যমে দক্ষিণী সিনেমায় তাঁর অভিষেক ঘটে। এই ছবির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে ভাষা আলাদা হলেও অভিনয়ের শক্তি দিয়ে দর্শকের মন জয় করা সম্ভব।
এরপর ধীরে ধীরে বাংলা সিনেমাতেও নিজের উপস্থিতি জানান দেন তিনি। টলিউডে তাঁর প্রথম কাজ ছিল “মাচো মাস্তানা” (Macho Mustanaa) ছবিতে, যেখানে তাঁর বিপরীতে ছিলেন অভিনেতা হীরণ চট্টপাধ্যায়( Hiranmoy Chattopadhyaya)। এই ছবির মাধ্যমে বাংলা দর্শকদের কাছেও তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।
পরবর্তীতে টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা দেব (Dev)-এর সঙ্গে “চ্যালেঞ্জ২” (Challenge 2) ছবিতে অভিনয় করেন পূজা। এই ছবিটি মুক্তির পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। একই সঙ্গে অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী (Soham Chakraborty)-র বিপরীতে “লাভেরিয়া” (Loveria) ছবিতেও অভিনয় করেন তিনি। ফলে বাংলা চলচ্চিত্র জগতেও ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন।
পেশাগত জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনও নানা সময়ে আলোচনায় এসেছে। পূজা বন্দ্যোপাধ্যায় দু’বার বিয়ে করেছেন। তাঁর একটি সন্তান রয়েছে, যার নাম কৃষিভ। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী কুনাল বর্মা (Kunal Verma)-ও পেশায় একজন অভিনেতা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, দু’জনের পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল সেই একই ধারাবাহিকে কাজ করতে গিয়ে “তুঝ সাং প্রীত লাগাই সাজনা” (Tujh Sang Preet Lagai Sajna)।
ব্যক্তিগত জীবনের নানা ওঠাপড়া সত্ত্বেও অভিনয়ের জগতে নিজের কাজ থেকে কখনও দূরে সরে যাননি পূজা। বরং নতুন নতুন চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজেকে আরও প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন।
কলকাতার এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে থেকে মুম্বইয়ের গ্ল্যামার জগতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। শহর বদলানো, নতুন ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, প্রতিযোগিতার মধ্যে টিকে থাকা সব মিলিয়ে এই পথ ছিল কঠিন। কিন্তু পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা দিয়েই সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন তিনি।
আজ বাংলা, হিন্দি এবং তেলুগু তিনটি ভিন্ন ভাষার বিনোদন জগতে পরিচিত নাম হয়ে উঠেছেন পূজা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর জীবনকাহিনি অনেকের কাছেই প্রমাণ করে যে বড় স্বপ্ন দেখতে পারলে এবং সেই স্বপ্নের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে পারলে সাফল্য একদিন না একদিন আসবেই।
কলকাতার মাটি থেকে শুরু হওয়া সেই স্বপ্ন আজ বহু দূর এগিয়ে গেছে। আর সেই পথচলাই প্রমাণ করে স্বপ্ন যদি সত্যিই বড় হয়, তবে শহর বদলালেও লক্ষ্য কখনও বদলে যায় না।