Manali Manisha Dey: বাংলা টেলিভিশনের পরিচিত মুখ মানালি দে (Manali Manisha Dey) দীর্ঘদিন ধরেই দর্শকের কাছে জনপ্রিয়। শিশুশিল্পী হিসেবে কেরিয়ার শুরু করে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন টেলিভিশন ও সিনেমা দুই মাধ্যমেই। ১৯৯৯ সালে বাংলা ছবি ‘কালী আমার মা’ (Kali Aamar Maa)-এর মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবনের সূচনা। এরপর টেলিভিশনে ‘নীড় ভা’ঙা ঝড়’ (Neer Bhanga Jhor) ধারাবাহিক দিয়ে ছোটপর্দায় আত্মপ্রকাশ। তবে স্টার জলসার জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘বউ কথা কও’ (Bou Kotha Kao)-তে ‘মৌরি’ চরিত্রে অভিনয়ের পরই তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন। এর পাশাপাশি ‘গোত্র'(Gotro), ‘নিমকি ফুলকি’ (Nimki Fulki), ‘ইন্দু'(Indu)–সহ একাধিক বাংলা সিনেমা ও ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিচ্ছেদ-পরবর্তী মানসিকতা এবং বৈবাহিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন মানালি। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে একদিকে সম্পর্ক ভা’ঙা’র বাস্তবতা, অন্যদিকে নিজের সত্ত্বাকে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় মনোভাব।
সাক্ষাৎকারে মানালি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, প্রাক্তন স্বামী সপ্তকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এখন আর বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। তিনি কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেন, সম্পর্ক যদি ভালো থাকত, তাহলে বিচ্ছেদের প্রশ্নই উঠত না। যেহেতু সম্পর্ক ভে’ঙে’ছে, সেখানে বন্ধুত্ব বজায় রাখার কোনো বাস্তবতা নেই। এই বক্তব্যেই স্পষ্ট যে, বিচ্ছেদের তিক্ততা তিনি অস্বীকার করছেন না, আবার অযথা আবেগেও ভাসছেন না। বরং বাস্তবকে বাস্তব হিসেবেই গ্রহণ করেছেন।
অতীত নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই মানালির কণ্ঠে শোনা যায় দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। তিনি বলেন, “যে চলে গিয়েছে বা যাকে পেছনে ফেলে এসেছি, তার দিকে আমি আর ফিরে তাকাই না।” এই এক লাইনের মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁর মানসিক শক্তি। অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে না ধরে তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চান। তাঁর মতে, জীবন থেমে থাকে না, আর সম্পর্ক ভাঙলেই নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মানসিকতা তিনি বিশ্বাস করেন না।
তবে বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়িতে তিনি বিশ্বাসী নন। সম্পর্ক যখন ভালো ছিল, সেই সময়টা যে সত্যিই সুন্দর ছিল এ কথাও তিনি স্বীকার করেন। তাই অতীতের সম্পর্ক নিয়ে আজ কারো নামে খারাপ কথা বলতে তিনি নারাজ। মানালির মতে, তখনকার অনুভূতি মিথ্যে ছিল না বলেই সেই সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বিচ্ছেদের পর সেই সত্যকে অস্বীকার করা বা পরনিন্দায় মেতে ওঠা তাঁর চরিত্রের সঙ্গে যায় না।
বৈবাহিক জীবন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মানালি তুলে ধরেন একেবারে অন্য বাস্তবতার ছবি। ছোটবেলা থেকে রূপকথার গল্প, সিনেমা বা উপন্যাসে বিয়েকে যেভাবে দেখানো হয়, বাস্তব জীবন তার থেকে অনেকটাই আলাদা, একথা তিনি অকপটে স্বীকার করেন। বিয়ের আগে যে স্বপ্ন, কল্পনা বা প্রত্যাশা তৈরি হয়, সংসারে পা রাখার পর অনেক ক্ষেত্রেই তা ভে’ঙে যায়। বাস্তব জীবনে সম্পর্ক মানে শুধুই ভালোবাসা নয়, তার সঙ্গে দায়িত্ব, সমঝোতা এবং মানিয়ে নেওয়ার বড় প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে।
এই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, “আমি হয়ত বাড়ির মেয়ে হয়েই থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা সম্ভবত আমাকে বাড়ির বউ হিসেবে দেখতে চেয়েছিল।” এই একটি বাক্যেই ধরা পড়ে তাঁর অভিজ্ঞতার গভীরতা। নিজের সত্ত্বা, নিজের পরিচয় আর অন্যের প্রত্যাশার মধ্যে যে ফারাক তৈরি হয়েছিল, সেটাই ধীরে ধীরে তাঁকে ওই পরিবেশে মানিয়ে নিতে বাধা দেয়। তাঁর কথায় “আমার কখনই ওদের বাড়িটাকে বাড়ি মনে হয়নি এবং আমার কখনই নিজেকে ওদের বাড়ির মেয়ে মনে হয়নি তাই আমি থাকতে পারিনি…”। মানালির বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি নিজেকে বদলে ফেলার চেয়ে নিজের মতো থাকতে চেয়েছিলেন, আর সেখানেই তৈরি হয়েছিল দূরত্ব।
তবে বর্তমান জীবনে পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মানালির কণ্ঠে শোনা যায় স্বস্তির সুর। তিনি জানান, বর্তমানে অভিমন্যুর বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো। তাঁদের তিনি নিজের বাবা-মায়ের মতোই শ্রদ্ধা করেন। এই সম্পর্কের ভিতটা তৈরি হয়েছে পারস্পরিক সম্মান আর বোঝাপড়ার উপর।
মানালির কথায়, বর্তমান শ্বশুরবাড়িতে তিনি একজন ‘বউ’ নয়, একজন ‘মেয়ে’র মর্যাদা পেয়েছেন। আর এই জায়গাটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, একটি মেয়ে যখন নতুন বাড়িতে যায়, তখন যদি তাকে নিজের মেয়ের মতো আপন করে নেওয়া হয়, তবেই সেই বাড়ি তার কাছে সত্যিকারের ঘর হয়ে ওঠে। শুধু দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে বা নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলার চেষ্টা করলে সম্পর্ক টেকে না।
এই সাক্ষাৎকারে মানালি দে যেন শুধু নিজের গল্পই বলেননি, অনেক নারীর জীবনের অভিজ্ঞতাকেও তুলে ধরেছেন। সম্পর্ক ভা’ঙা’র যন্ত্রণা, সমাজের প্রত্যাশা, নিজের সত্ত্বা বজায় রাখার ল’ড়া’ই। সব মিলিয়ে তাঁর কথায় ধরা পড়েছে বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য। গ্ল্যামার দুনিয়ার আড়ালে যে একজন সাধারণ মানুষ নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করেন, মানালির বক্তব্য সেই ছবিটাকেই আরও স্পষ্ট করে দেয়।