Nandiinii Urvi Saha:একটি আবেগঘন, দীর্ঘ এবং গভীর স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিওতে নিজের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর পর্দা সরালেন অভিনেত্রী নন্দিনী উর্ভি সাহা(Nandiinii Urvi Saha)। ভিডিওর শুরুতেই তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ইন্ডাস্ট্রিতে এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর সঙ্গে যা যা ঘটেছে, আজ তিনি সবকিছু প্রকাশ করবেন। তবে এই প্রকাশ কোনোভাবেই ভিউ বা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য নয় বরং তাঁর মতো পরিস্থিতিতে যাতে আর কাউকে পড়তে না হয়, সেই সতর্কবার্তা দিতেই এই ভিডিও। নন্দিনীর কথায়, এতদিন তিনি চাইলেও এই ভিডিও পোস্ট করতে পারেননি, কারণ একাধিক বাধা ও চাপ তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
ভিডিওতেই নন্দিনী এমন এক ঘোষণা করেন, যা স্বাভাবিকভাবেই আলোড়ন ফেলে দেয় টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে। তিনি জানান, দর্শকরা হয়ত আর কোনোদিনই তাঁকে টিভি সিরিয়ালে দেখতে পাবেন না।তিনি দর্শকদের বলেন,“হয়ত তোমরা আর কোনোদিনও আমাকে টিভি সিরিয়ালে দেখতে পাবে না। এটা আমার অভিমত যে আমি আর করব না।”
এই সিদ্ধান্ত কোনো ক্ষণিকের আবেগ নয়, বরং তাঁর নিজস্ব আদর্শ ও মানসিক অবস্থান থেকেই নেওয়া। তাঁর কথায়, তিনি টা’কা’র জন্য কাজ করেন না এবং কারও কাছে কোনোভাবে বাঁধা পড়ে থাকতে চান না। কাজের বিনিময়ে যদি নিজের নৈতিকতা বা আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হয়, তাহলে সেই কাজ তিনি আর করতে রাজি নন।
ভিডিওতে নন্দিনী তাঁর বা’ইপো’লার ডি’স’অর্ডার নিয়ে প্রথমবার এত খোলাখুলি কথা বলেন। তিনি জানান, এই মা’ন’সি’ক সমস্যার জ’ন্ম হঠাৎ করে হয়নি। তাঁর মতে, ছোটবেলা থেকে দীর্ঘদিন ধরে চলা মা’ন’সি’ক অ’ত্যা’চা’র, অবদমন এবং ভ’য়ে’র পরিবেশ থেকেই এই অ’সু’স্থ’তা’র সূত্রপাত। যদিও তিনি স্পষ্ট করেন, কে বা কোন লি’ঙ্গে’র মানুষ এই অ’ত্যা’চা’রে’র জন্য দায়ী সে বিষয়ে তিনি কোনো নাম প্রকাশ করতে চান না। তাঁর কাছে ব্যক্তি নয়, বরং দোষী, অন্যায়, ন্যায় এবং সত্য এই ধারণাগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের কাজের প্রতি চূড়ান্ত ডেডিকেশন নিয়েও কথা বলেছেন নন্দিনী। তিনি জানান, যখন তিনি মন দিয়ে কোনো কাজ করেন, তখন তাঁর শরীরের য’ন্ত্র’ণা, খিদে, তেষ্টা, কিছুই তাঁর কাছে আর অনুভূত হয় না। তাঁর ভাষায়, তিনি তখন সম্পূর্ণভাবে সেই কাজের মধ্যে ডুবে যান। শুধু অভিনয় নয়। নাচ, গান, আঁকা, আবৃত্তি কিংবা রান্না সব ধরনের শিল্পকলার প্রতিই তাঁর গভীর অনুরাগ এবং নিষ্ঠা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ভিডিওতে উঠে আসে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক – ‘না’ বলতে না পারার মানসিকতা। নন্দিনী বলেন, যারা সহজে প্রতিবাদ করতে পারেন না বা কাউকে না বলতে শেখেননি, তারা আসলে খুব পবিত্র আত্মা হন। তাঁর কথায়,”আমরা যারা ‘না’ করতে পারি না এরা খুব পিওর সোল(pure soul) হয় একচুয়ালি… এরা সবাইকে নিজের মতো ভাবতে শুরু করে।“ এই মানুষগুলো সবাইকে নিজের মতো ভেবে নেয়, আর সেখান থেকেই শুরু হয় সমস্যার সূত্রপাত। মানুষ নিজের চরিত্র ও মানসিকতা অনুযায়ী অন্যকে বিচার করে এই বক্তব্য বোঝাতে তিনি গঙ্গার ঘাটে চোর ও সাধুর উদাহরণ টেনে আনেন। তাঁর কথায়, “যে যেমন, সে তেমনই অন্যকে দেখে।”
এই দীর্ঘ বক্তব্যে নন্দিনী বারবার ফিরে যান জীবনের শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক শক্তির কথায়। তাঁর বিশ্বাস, যারা অতিরিক্ত সহনশীল, সমাজ অনেকসময় তাদের ‘ইউজ অ্যান্ড থ্রো’ করে ফেলে দেয়। ঈশ্বর মানুষকে তার সহ্য ক্ষমতা অনুযায়ী কষ্ট দেন এই ধারণার সঙ্গে একমত হলেও, তিনি মনে করেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শেখাটাই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
নিজেকে মফস্বলের মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিয়ে নন্দিনী বলেন, চুঁচুড়ার মতো জায়গা থেকে উঠে এসে বড় স্বপ্ন দেখা সহজ নয়। মফস্বলের কোনো মেয়ে যখন বড় হওয়ার জেদ ধরে, তখন তার চারপাশের পরিবেশই অনেক সময় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও নিজের মনকে বিশ্বাস করেই তিনি এগিয়ে এসেছেন। ইন্ডাস্ট্রিতে ‘কম্প্রোমাইজ’ প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট তিনি এতে বিশ্বাসী নন। তাঁর মতে, নিজে ভালো থাকলে তবেই চারপাশের জগৎ ঠিক থাকবে।
মডেলিং দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও, অভিনয়ই ছিল তাঁর আসল লক্ষ্য। পোর্টফোলিও তৈরির প্রয়োজনে তিনি মডেলিং করেছিলেন এবং প্রথম অডিশনেই লিড রোলের জন্য নির্বাচিত হন। তবে সেই পথ একেবারেই মসৃণ ছিল না। পরিবারের অমত, ভ’য় এবং সামাজিক চাপের মধ্যেই তাঁকে এগোতে হয়েছে। সেই সময়ের মানসিক যন্ত্রণা আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে বলে জানান নন্দিনী।
ভিডিওতে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের একাধিক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার কথাও উঠে আসে। একটি প্রজেক্টে তাঁকে প্রথমে লিড হিসেবে নির্বাচিত করা হলেও পরে অপেক্ষা করতে বলা হয়। তাকে লিড দেওয়া হয়েছিল ‘আলতা ফড়িং’-য়ে। তিনি বলেন, “আলতা ফড়িং-এ আমি লিড করব বলে সিলেক্টেড হই… কিন্তু আমাকে বলা হলো যে এই ক্যারেক্টারটা তুমি পাচ্ছ না, তুমি কিছুদিন অপেক্ষা করে যাও তোমাকে আমরা লিড দেব”। কাজের পরিবেশে ধীরে ধীরে শুরু হয় র্যা’গিং এবং মা’ন’সি’ক চাপ। তাঁর দাবি, এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর ছোটবেলার ট্রমাগুলোকে সারিয়ে তোলার বদলে আরও গভীর ক্ষ’ত তৈরি করেছে।
সবচেয়ে নাড়া দেওয়া অংশগুলোর মধ্যে অন্যতম তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা। তিনি জানান, একাধিকবার মানসিক ও শারীরিকভাবে অ’ত্যা’চা’রে’র শিকার হয়েছেন। এমনকি ছোটবেলায় একজন ডাক্তারের এবং এক ধর্মীয় ব্যক্তির দ্বারাও। এই সব অভিজ্ঞতা তাঁকে ভিতর থেকে ভে’ঙে দিয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। সমাজের প্রশ্ন, “তোর সাথেই কেন হয়?”—এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পিউরিটির মানে না বুঝেই মানুষ বিচার করে।
আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এই ভিডিওর আরেকটি বড় স্তম্ভ। নন্দিনী জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি শিবভক্ত। কোনো কামনা-বাসনা নয়, বরং ঈশ্বরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল একেবারেই ব্যক্তিগত। ঋতুস্রাব নিয়ে সমাজের কুসংস্কার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, যেখান থেকে সৃষ্টি আসে, সেটাকে অপবিত্র বলা কীভাবে সম্ভব?
আরও পড়ুন:Paayel Sarkar:“নিজের নয়, বাবা-মায়ের মনের মতো মানুষই সমস্যা”- অতীত পেরিয়ে ৪২-এও অবিবাহিত পায়েল সরকার
সময় এবং অভিজ্ঞতা তাঁকে বদলে দিয়েছে এই কথাও স্পষ্টভাবে উঠে আসে ভিডিওতে। আগে যেখানে তিনি চুপ করে সব সহ্য করতেন, এখন সেখানে প্রমাণের সঙ্গে সত্য বলার সাহস পেয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, দুনিয়া কেবল প্রমাণই বোঝে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অ’সু’স্থ হয়ে পড়ার একটি ভ’য়ং’ক’র অভিজ্ঞতার কথাও শেয়ার করেন তিনি, যেখানে একটি শারীরিক আ’ঘা’ত তাঁর জীবনকে মৃ’ত্যু’র মুখে ঠেলে দিতে পারত বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন।
এই দীর্ঘ ল’ড়া’ই’য়ে’র মাঝেও পরিবার তাঁর পাশে ছিল এই কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি নন্দিনী। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে তিনি একটি প্রোডাকশন হাউস তৈরির ইচ্ছার কথাও জানান, যেখানে সত্যিকারের অভিনয় জানা মানুষরা সুযোগ পাবেন। তাঁর কথায়, “রুটি তারই পাওয়া উচিত, যার সত্যি রুটির খিদে আছে।”
ভিডিওর শেষ অংশে কান্নাভেজা গলায় নন্দিনী নিজের কষ্টের হিসেব কষেন। তিনি তাঁর শারীরিক পরিবর্তন (মোটা হয়ে যাওয়া) এবং তা নিয়ে মানুষের কটূমন্তব্য বা গালিগালাজ করার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।তিনি বলেন, “আমি যেমন মোটা হয়ে গিয়েছিলাম, সবাই আবার সেম ফ্রিকোয়েন্সিতে ব্যাক করেছিল।“ তাঁর কথায়,”সবাই ভুলে গিয়েছিল… যারা আমাকে ‘আলতা ফড়িং’, ‘জগদ্ধাত্রী’ দেখাকালীন খুব ভালো কথা বলত তাঁরা সেই সময়… ট্রোল করেছে।“ তিনি বলেন, তিনি কোনোদিন কারও ক্ষ’তি করেননি, তবু কেন তাঁকে এতটা সহ্য করতে হলো। এই প্রশ্ন আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। শারীরিক অ’সু’স্থ’তা, মানসিক ল’ড়া’ই আর সামাজিক ট্রো’লে’র বিরুদ্ধে এই ভিডিও যেন এক দীর্ঘ আত্মকথন, যেখানে এক অভিনেত্রীর পাশাপাশি এক মানুষের ভে’ঙে পড়া এবং আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প উঠে এসেছে।