Mimi Chakraborty: বনগাঁয় একটি অনুষ্ঠানে সম্প্রতি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী(Mimi Chakraborty)। তাঁর দাবি, মঞ্চে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে যেতে বলা হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে সংশ্লিষ্ট ক্লাবের এক সদস্যের বিরুদ্ধে তিনি বনগাঁ থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন। এবার সেই বিতর্কিত ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন অভিনেত্রী ও সাংসদ মিমি চক্রবর্তী। ভাইরাল হওয়া নানা ভিডিও, সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনা, মিডিয়া ট্রায়াল এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি মুখ খুললেন তিনি। সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকারে মিমি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আর এমন কাউকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে চান না, যাঁরা সেই প্রচারের যোগ্য নন। তাঁর কথায়, “আমি মনে করি আমরা এমন একজন ব্যক্তিকে যথেষ্ট পাবলিসিটি দিয়ে ফেলেছি, যে সেটা ডিজার্ভ করে না।” এমনকি তিনি এও জানিয়েছেন, বিতর্কিত ভিডিওগুলো তিনি দেখেননি, কারণ তাঁর কাছে আসল বিষয় অন্য জায়গায়।
মিমির বক্তব্যের মূল সুর একটাই, এই ল’ড়া’ই কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার বিরুদ্ধে নয়, এই ল’ড়া’ই সত্যের পক্ষে এবং একজন নারীর সম্মানের পক্ষে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তাঁর প্রতিবাদ কখনও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে আসেনি। বরং তাঁর অবস্থান সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। একজন নারীকে প্রকাশ্যে অসম্মান করা হলে, সেটার প্রতিবাদ করাই তাঁর দায়িত্ব বলে তিনি মনে করেন।
এই প্রসঙ্গে অতীতের একাধিক ঘটনার কথাও টেনে এনেছেন মিমি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই প্রথম নয়। আগেও তিনি একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো ব্যক্তিকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। এমনকি ট্যাক্সিতে অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগে চালকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পিছপা হননি। প্রয়োজনে থানায় গিয়ে অপরাধীকে শনাক্ত করার সাহসও দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রতিবাদ মানে শুধু কথা বলা নয়, প্রয়োজনে একা দাঁড়িয়ে সঠিক কাজটা করাও প্রতিবাদ।মিমি স্পষ্ট করে দেন যে তিনি কোনো ভয় পাচ্ছেন না। তাঁর মতে, তিনি কেবল তাঁর কাজের (কর্ম) প্রতি দায়বদ্ধ।তাঁর কথায়, “আমার ভয়েস কেউ নিচে করতে পারবে না, আজ অব্দি পারেনি, পারবে না। আমি ভয় পাই না, আমি যেটাকে ভয় পাই সেটা হলো আমার কর্ম।”
বর্তমান সমাজব্যবস্থা এবং মিডিয়ার ভূমিকা নিয়েও ক্ষো’ভ উগরে দিয়েছেন অভিনেত্রী। তাঁর কথায়, “এটা একটা পুরুষশাসিত সমাজ।” তিনি বলেন, এখনও অনেকের মানসিকতা এমন যে, মেয়েদের ওপর চিৎকার করা, অপমান করা যেন স্বাভাবিক বিষয়। আর সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে অতিরিক্ত মিডিয়া ট্রায়াল। মিমির অভিযোগ, আজকাল এমন একটা ধারণা তৈরি করা হচ্ছে যে, সেলিব্রিটি মানেই খারাপ। সত্য যাচাই না করেই গল্প বানানো হচ্ছে, চরিত্র হননের চেষ্টা চলছে।তাঁর কথায়, “.. আজকাল মিডিয়া ট্রায়াল এত বেশি হয়ে গেছে যে লোকে ভাবে সেলিব্রিটি মানেই খারাপ।”
এই বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে যায় আরেকটি অভিযোগ, সময়ানুবর্তিতা বা পাঙ্কচুয়ালিটি। মিডিয়াতে দাবি করা হয়েছিল, শিল্পীরা নাকি দেরি করে পৌঁছানোর কারণে গোটা পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। এই অভিযোগ একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছেন মিমি। তিনি জানান, তাঁর প্রায় ১৫ বছরের দীর্ঘ কেরিয়ারে, ২০০৯-১০ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত, কেউ কখনও প্রমাণ করতে পারবে না যে তিনি কোনো শুটিং বা প্রোগ্রামে পাঁচ মিনিটও দেরি করে পৌঁছেছেন। তাঁর দাবি, ‘দেরিতে আসা’র গল্পটি পুরোপুরি সাজানো হয়েছে, যাতে মূল অপমানের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া যায়।
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ওই দিন তিনি মঞ্চের পিছনে ২০ থেকে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু সেই সত্যটা না দেখিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য গল্প সামনে আনা হয়েছে, কারণ তাতে টিআরপি বাড়ে। মিমির কথায়, “শিল্পীরা দেরি করে এসেছে, এই কথা বললে আপনাদের টিআরপি বাড়ে। কিন্তু এটা আসলে ডাইভারশন।”
সাক্ষাৎকারে বারবার উঠে এসেছে ‘সত্য’ এবং ‘সম্মান’-এর প্রসঙ্গ। মিমি অভিযোগ করেন, মূল ঘটনা থেকে নজর ঘোরাতে নানা অপ্রাসঙ্গিক ইস্যু সামনে আনা হচ্ছে। অথচ একজন নারীর সম্মান নিয়ে কেউ কথা বলছে না। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, সত্যকে সামনে রাখাই সবচেয়ে জরুরি। সত্য চাপা দিলে বা বারবার মিথ্যা বললে, তা কখনও সত্য হয়ে যায় না। এই কথাও জোর দিয়ে বলেন তিনি।
ভুল হলে ক্ষ’মা চাইতে তাঁর কোনো দ্বিধা নেই, একথাও পরিষ্কার করে দিয়েছেন মিমি। কিন্তু এই ঘটনায় তিনি নিশ্চিত, তিনি ভুল করেননি। তাই ক্ষ’মা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর ভাষায়, যদি তিনি সত্যিই ভুল করতেন, তাহলে অনেক আগেই ক্ষমা চেয়ে নিতেন। কিন্তু অপমানকে অপমান না বলে, সেটাকে ঘুরিয়ে অন্যভাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, এবং তার ওপর বারবার নানা ভিডিও ছড়ানো হয়েছে, সেটাই তাঁর আপত্তির মূল জায়গা। তাঁর কথায়,”আমি যদি ভুল করতাম, আমি ক্ষ’মা চেয়ে নিতাম। কিন্তু ভুলটাকে ভুল না বলে, অপমানটাকে অপমান না বলে, সেটার ওপর বারবার অন্যরকম ভিডিও… সেটা তো হয়নি।”
এই লড়াই যে শুধুমাত্র তাঁর নিজের জন্য নয়, সেটাও বারবার উল্লেখ করেছেন মিমি। তিনি জানান, অনেক ছোট শিল্পী, বিশেষ করে কম বয়সি মেয়েরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের অনেকেরই একই ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, কিন্তু ক্যারিয়ারের ভয়েই তাঁরা মুখ খুলতে সাহস পান না। মিমির কথায়, “আজ যদি আমি চুপ করে যাই, তাহলে ভাবুন ওই বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলো কী করবে?” কাজ হারানোর ভয়ে তাঁরা চুপ করে থাকেন, আর সেই নীরবতাই অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
একটি প্রশ্নের উত্তরে মিমি স্পষ্ট জানান, তিনি আর ‘ফেক পাবলিসিটি’র অংশ হতে চান না। বিতর্কিত একটি প্রসঙ্গে তাঁকে যখন নির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হয়, তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা এড়িয়ে যান। তাঁর বক্তব্য, একে একে প্রশ্ন-উত্তর করে এমন লোকেদের আরও প্রচার দেওয়ার কোনো মানে নেই। তিনি চান না, নেতিবাচক বিষয় আবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে আসুক।
সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে ধর্ম এবং বাহ্যিক ধর্মচর্চা নিয়ে। অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় মিমি বলেন, “ভগবানের নাম করে রুদ্রাক্ষ পরলেই ধার্মিক হওয়া যায় না।” তাঁর মতে, মানুষের আসল চরিত্র পোশাক বা বাহ্যিক সাজসজ্জায় বোঝা যায় না। ধর্ম মানে কেবল প্রতীক নয়, ধর্ম মানে কাজ। মিমির ব্যাখ্যায়, “ধর্ম কর্ম থেকে হয়। কর্ম স্বচ্ছতা আর সত্য দিয়ে হয়।” অর্থাৎ, কেউ যদি সত্যের পথে না চলে, কাজের মধ্যে স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে শুধু ধর্মীয় চিহ্ন ধারণ করলেই তাকে ধার্মিক বলা যায় না।
সবশেষে তিনি পুরো বিষয়টি আইনের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা জানান। কোনো তর্ক-বিতর্কে না গিয়ে তাঁর সোজা কথা, “আদালতকে ঠিক করতে দিন কোনটা সঠিক”(লেট দ্য কোর্ট ডিসাইড হোয়াট ইজ রাইট)।পুলিশ এবং আদালতের ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। মিমির বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত সত্যই জয়ী হবে।
সব মিলিয়ে সাক্ষাৎকারে মিমি চক্রবর্তীর অবস্থান একেবারে পরিষ্কার, তিনি ভয় পান না, আপস করেন না। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় বিচারক তাঁর নিজের কর্ম। নারীসম্মান, পেশাদারিত্ব এবং সত্যের প্রশ্নে তিনি কোনোভাবেই পিছিয়ে আসতে রাজি নন। আর সেই বার্তাই এবার সরাসরি, স্পষ্ট এবং কড়া ভাষায় পৌঁছে দিলেন তিনি।