N.K. Salil: বাংলা সিনেমার বর্তমান অবস্থা, দর্শকের মানসিকতা, নির্মাতাদের দায়বদ্ধতা এবং তারকা খ্যাতির বাস্তবতা সব মিলিয়ে একেবারে স্পষ্ট, দ্বি’ধা’হী’ন ও কখনও কখনও অস্বস্তিকর মন্তব্য করলেন বিশিষ্ট চিত্রনাট্যকার এন কে সলিল (N.K. Salil)। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি শুধুমাত্র বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্র নয়, বরং গোটা ইন্ডাস্ট্রির দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনবোধ এবং দর্শকের সঙ্গে সংযোগের জায়গাটাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালেন।
সলিলের কথায় বারবার উঠে এসেছে একটি বিষয়। সিনেমা বানানোর আগে মানুষকে জানতে হবে। তাঁর মতে, আজকের বাংলা সিনেমা ক্রমশ মানুষের জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে গেলেও, আবেগ, অভিজ্ঞতা আর সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বকে উপেক্ষা করেই তৈরি হচ্ছে অধিকাংশ ছবি।
এন কে সলিল(N.K. Salil) বর্তমান সময়ের পরিচালকদের প্রসঙ্গে গিয়ে প্রথমেই অতীতের কিছু নামের কথা স্মরণ করেন। স্বপন সাহা(Swapan Saha), হরনাথ চক্রবর্তী(Haranath Chakraborty), রবি কিনাগী(Ravi Kinagi) বা সুজিত গুহ(Sujit Guha)এই পরিচালকদের নাম উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়,”না স্বপন সাহা আছে, না হরনাথ চক্রবর্তী আছে, না রবি কিনাগী আছে, না সুজিত গুহ আছে।” তিনি বলেন, এঁরা সবাই এমন এক সময়ের প্রতিনিধি ছিলেন, যাঁরা দর্শকের নাড়ি বুঝতেন। তাঁদের সিনেমা হয়ত সবসময় তথাকথিত ‘আর্ট ’ ক্যাটাগরিতে পড়ত না, কিন্তু হলে দর্শক টানার ক্ষ’ম’তা রাখত।
সলিলের মতে, আজকের পরিচালকদের বড় স’ম’স্যা হল তাঁরা সাধারণ মানুষকে চেনেন না। তাঁর ভাষায়, কাউকে ছোট না করেই তিনি বলছেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেক পরিচালক মানুষের মানসিক গঠন, দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম কিংবা আবেগের ভাষা বোঝেন না। ফলে সিনেমা হয়ে উঠছে টেকনিক্যালি নিখুঁত, কিন্তু আত্মাহীন।
এই মন্তব্যটাই হয়ত গোটা সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে তীব্র ও গ’ভী’র লাইন। এন কে সলিল মনে করেন, আজকের প্রজন্ম সিনেমার ফর্মুলা জানে, ট্রেন্ড বোঝে, কিন্তু মানুষের জীবনের গল্পকে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাঁর মতে, একটি সফল সিনেমার ভিত্তি শুধুমাত্র চিত্রনাট্য বা ক্যামেরার কাজ নয় জীবনের অভিজ্ঞতা। তাঁর কথায়, “এখন সবাই সিনেমা বোঝে কিন্তু মানুষের জীবনটাকে বোঝে না।”
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, সিনেমার গল্পের চেয়েও জীবনের গল্প বেশি শ’ক্তি’শা’লী হওয়া দরকার। কারণ দর্শক নিজের জীবনের ছায়া না দেখলে, কোনও সিনেমা তাকে দীর্ঘদিন স্পর্শ করতে পারে না।
নিজের কাজ নিয়েও একেবারে সোজাসাপটা অবস্থান নিয়েছেন এন কে সলিল। তিনি স্বীকার করেন, বর্তমান সময়ে যে ধরনের সিনেমা হচ্ছে, সেগুলো তাঁর সঙ্গে মানানসই নয়। এমনকি যদি কোনও ছবির অফার আসে, তাও তিনি গ্রহণ করবেন না কারণ তিনি আগেভাগেই বুঝতে পারেন ছবিটির ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে। তিনি বলেন, “আজকে যেই ছবিগুলো হচ্ছে সেগুলো আমি করতে পারব না।”
সলিল বলেন, তিনি জানেন কোন ছবি বক্স অফিসে ব্যর্থ হবে। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজেকে সরিয়ে রাখেন। তাঁর কাছে কাজের সংখ্যা নয়, বরং দর্শকের প্রত্যাশা এবং নিজের দায়িত্ববোধই মুখ্য।
যে কোনও কাজ শুরুর আগে সলিল নিজেকে কিছু প্রশ্ন করেন – তিনি কি দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন? তিনি কি প্রয়োজনীয় সাপোর্ট পাবেন?
যদি নিজের ভেতর থেকে কোনও ইতিবাচক উত্তর না আসে, তাহলে সেই কাজ থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর মতে, নিজের বিবেকের সঙ্গে আপস করে কাজ করার কোনও মানে নেই।
বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান নিয়ে সবচেয়ে কড়া প্রশ্ন তুলেছেন এন কে সলিল। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র বাঙালি হওয়ার কারণে কোনও ছবিকে সমর্থন করা দর্শকের দায়িত্ব নয়। একজন দর্শক যখন প্রেক্ষাগৃহে যান, তখন তিনি তাঁর পরিশ্রমের টা’কা খরচ করেন।আজকের দিনে সিনেমা দেখা আর পাঁচ টাকা নয় দু’জন মানুষ হলে গেলে প্রায় দেড় হাজার টাকার মতো খরচ হয়। সেই সঙ্গে সময়ও ব্যয় হয়। সলিলের প্রশ্ন – নির্মাতারা কি সেই বিনোদন দিতে পারছেন?
যদি দর্শককে আনন্দ দিতে পারেন, তবে আলাদা করে আবেগ দেখানোর দরকার নেই। ভালো সিনেমা নিজের জায়গা নিজেই তৈরি করে নেয়।
এই সাক্ষাৎকারে অভিনেতা দেবকে নিয়েও খোলাখুলি কথা বলেন এন কে সলিল। তিনি জানান, দেবের কেরিয়ারের শুরুতে কিছু বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। নাম বদলানো, লুক বদলানো, এমনকি গল্পের ধরন বদলে ‘আই লাভ ইউ’(I Love You) ছবির মাধ্যমে দেবকে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়।
সলিলের মতে, দেবের মুখে একধরনের অদ্ভুত মায়া আছে। শুধু তাকিয়ে থাকলেও দর্শকের সঙ্গে এক ধরনের আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয়। এই ‘আপন করে নেওয়ার’ ক্ষমতাই একজন তারকাকে আলাদা করে।
তিনি স্পষ্ট বলেন, যতক্ষণ না দর্শক মনে করবে “ওঁ আমার খুব আপনার”, ততক্ষণ কোনও অভিনেতা প্রকৃত জনপ্রিয়তা পায় না।
দেব(Dev), সোহম(Soham Chakraborty), অঙ্কুশ(Ankush Hazra)-দের সঙ্গে একই সময় এলেও আবীর চট্টোপাধ্যায়(Abir Chatterjee)-কে সলিল একেবারেই অন্য ঘরানার অভিনেতা হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, আবীর এমন এক ধারার ছবি থেকে উঠে এসেছেন, যেগুলো কখনওই সর্বসাধারণের মূল স্রোতের অংশ ছিল না।
আরও পড়ুন:Dhanush-Mrunal:“বিয়ে নয়, ভুয়ো গুঞ্জন!”- ধনুষের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ইঙ্গিতেই জবাব ম্রুণাল ঠাকুরের
তবুও নিজের জায়গা নিজেই তৈরি করেছেন আবীর। কোনও তালিকার মধ্যে তাঁকে ফেলা যায় না। এই স্বতন্ত্র অবস্থানই তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি বলে মনে করেন এন কে সলিল।
এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের শেষে একটাই বার্তা স্পষ্ট সিনেমা বানানো মানে শুধু ছবি বানানো নয়, এটা মানুষের জীবনের সঙ্গে সংযোগ তৈরির দায়িত্ব। এন কে সলিল কাজের সংখ্যা দিয়ে নিজেকে বিচার করতে চান না। তাঁর কাছে দর্শকের ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং প্রত্যাশাই শেষ কথা।
আজকের বাংলা সিনেমার প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে বি’ত’র্ক তৈরি করবে। কিন্তু একই সঙ্গে হয়ত কিছু কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখিও দাঁড় করাবে ইন্ডাস্ট্রিকে, সিনেমা কি সত্যিই মানুষের জন্য, না শুধুই বাজারের জন্য?