Aishwarya Sharma: বিয়ের মতো জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তেও যে গভীর শূন্যতা বুকের ভিতর নিঃশব্দে বাসা বাঁধতে পারে, তারই এক আবেগঘন ছবি উঠে এল সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে। প্রয়াত অভিনেত্রী ঐন্দ্রিলা শর্মা(Aindrila Sharma)-র দিদি ঐশ্বর্য শর্মা(Aishwarya Sharma) নিজের জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত যন্ত্রণার কথা খুলে বললেন ক্যামেরার সামনে। বোনকে হারানোর পর থেকে তাঁর জীবন যে কীভাবে বদলে গিয়েছে, কীভাবে প্রতিটি আনন্দের মুহূর্ত আজও এক অদৃশ্য অভাবে ঢেকে যায়, সে কথাই উঠে এসেছে এই ভিডিওর প্রতিটি অংশে।
ঐশ্বর্য অকপটে স্বীকার করেন, ২০২২ সালে ঐন্দ্রিলার চলে যাওয়ার পর তাঁর জীবনের ছন্দ পুরোপুরি ভে’ঙে পড়েছে। বোনের মৃ’ত্যু’র পর থেকে জীবন আর আগের মতো নেই, এই সত্যটা তিনি লুকোনোর চেষ্টা করেননি। তাঁর কথায়, বোন চলে যাওয়ার পর সবকিছু যেন হঠাৎ করেই বদলে যায়। যে মানুষটার সঙ্গে তিনি নিজের জীবনের সব অনুভূতি, সব না বলা কথা ভাগ করে নিতেন, সেই মানুষটার অনুপস্থিতি তাঁকে নিঃসঙ্গতার এক চরম জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
নিজের স্বভাব প্রসঙ্গে ঐশ্বর্য বলেন, তিনি বরাবরই অন্তর্মুখী। কথা বলার, মনের কথা ভাগ করে নেওয়ার জায়গাটা ছিল একমাত্র বোন। সেই জায়গাটা হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় একাকিত্ব যেন তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, বোনকে হারানোর পর থেকে তিনি এক ধরনের তীব্র একাকিত্ব অনুভব করেন, যা কোনওভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। এই অভাব আজীবন থেকে যাবে, এমনটাই তাঁর উপলব্ধি। সময়ের সঙ্গে হয়ত মানুষ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়, কিন্তু এই শূন্যতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে করেন তিনি।
এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে নিজেকে সামলে রাখতে ঐশ্বর্য বেছে নিয়েছেন কাজকে। হাসপাতাল, বাড়ি কিংবা শ্যুটিং, নিজেকে সবসময় কোনও না কোনও কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর কথায়, ব্যস্ত থাকলে অন্তত কিছু সময়ের জন্য মনটা অন্যদিকে থাকে। কিন্তু একা হলেই, নিঃশব্দ মুহূর্তগুলোতেই কষ্টটা সবচেয়ে বেশি করে ফিরে আসে। তখনই বোনের অভাব আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
এই সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আবেগঘন অংশ উঠে আসে ঐশ্বর্য -এর বিয়ের প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, ঐন্দ্রিলা যদি আজ বেঁচে থাকত, তাহলে তাঁর বিয়ের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিত সে। তাঁকে কোনও কিছু ভাবতেই হতো না। ঐশ্বর্য বলেন, “ওঁ যদি থাকত তাহলে আমাকে কিছু ভাবতে হতো না, সবটাই ওই করত।” বাড়ির যেকোনো অনুষ্ঠান, পূজা, জন্মদিন, অ্যানিভার্সারি, সবকিছুর মূল আয়োজক ছিল ঐন্দ্রিলাই। স্বাভাবিকভাবেই দিদির বিয়ের ক্ষেত্রেও ঐন্দ্রিলা থাকলে সে-ই সব কিছু পরিকল্পনা করত, এই বিশ্বাস আজও অটুট।
আক্ষেপের সুরে ঐশ্বর্য বলেন, ঐন্দ্রিলা বেঁচে থাকলে হয়ত সবকিছুর গতিপথই আলাদা হতো। তাঁর ধারণা, তখন হয়ত সব্যসাচীর সঙ্গে তাঁর বিয়েটাই আগে হয়ে যেত। তাঁর কথায়, “বোন থাকলে বোনের বিয়েটাই আগে হতো সব্যসাচী(Sabyasachi Chowdhury)-র সাথে”। শুধু তাই নয়, বোনের বিয়ের জন্যও তাঁর নিজের অনেক স্বপ্ন ছিল। কোন লেহেঙ্গা পরবেন, কোন ঘাঘরা পরবেন, সব কিছুই তিনি মনে মনে ভেবে রেখেছিলেন। আজ সেই স্বপ্নগুলো শুধু স্মৃতি হয়েই রয়ে গেছে। তাঁর কথায়,”ওঁর বিয়েতেও আমার অনেক প্ল্যানিং ছিল… এই লেহেঙ্গাটা পরব, এই ঘাঘরাটা পরব।”
ঐশ্বর্য আরও জানান, এই মুহূর্তে তাঁর জীবনে যা ঘটছে, তা মূলত এনগেজমেন্ট। এখনই তিনি শ্বশুরবাড়িতে চলে যাচ্ছেন না। সময়টা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে, তেমনই সিদ্ধান্তগুলোও নেওয়া হচ্ছে ভেবেচিন্তে। বর্তমান সময়ের সামাজিক বাস্তবতা নিয়েও তিনি কথা বলেন। তাঁর মতে, এখন সময় বদলেছে। আজকাল ছেলেরাও মেয়ের বাড়িতে থাকে, মেয়েরাও ছেলের বাড়িতে যায়। তাই সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে দু’পক্ষকেই মিলেমিশে সব কিছু ম্যানেজ করতে হবে এটাই তাঁর বিশ্বাস।
এই সাক্ষাৎকারে খুব সংক্ষিপ্ত হলেও গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে সব্যসাচী চৌধুরী(Sabyasachi Chowdhury)-র প্রসঙ্গ। ঐন্দ্রিলার সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন সব্যসাচী। সাক্ষাৎকারে তাঁর প্রসঙ্গ আসলে তাঁর সঙ্গে এখনও যোগাযোগ আছে কি না সেই বিষয়ে তখন পরিবারের তরফ থেকে ইতিবাচক উত্তরই পাওয়া যায়। জানানো হয়, সব্যসাচী আজও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং এই বিশেষ দিনেও তিনি উপস্থিত থাকবেন। এই কথার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়, ঐন্দ্রিলার চলে যাওয়ার পরেও সব্যসাচীর সঙ্গে তাদের পরিবারের একটি গভীর আত্মিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
নিজের হবু জীবনসঙ্গীকে নিয়েও অকপটে কথা বলেন ঐশ্বর্য। তিনি জানান, তাঁর জীবনে পারিবারিক দায়িত্বের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। সেই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মতো একজন মানুষকে পাশে পাওয়া তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর হবু সঙ্গী সেই জায়গায় সবসময় তাঁকে সমর্থন করেন। পরিবার, কাজ সবকিছুতেই তিনি পাশে থাকেন বলেই ঐশ্বর্য নিজেকে কিছুটা হলেও শক্ত রাখতে পারেন
শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, নিজের পেশাগত জীবন নিয়েও তিনি সমর্থন পান বলে জানান ঐশ্বর্য।তাঁর কথায়,”সবথেকে বড় কথা হচ্ছে আমার যেহেতু ফ্যামিলি রেসপনসিবিলিটি একটা বিশাল আছে, তো ওটা কিছুটা ভাগ করে নিতে পেরেছি। কারণ ওঁ সবসময় সাপোর্ট করে।” মুম্বাই যাওয়া, পড়াশোনা কিংবা অভিনয়ের জগতে নিজের জায়গা তৈরি করা,এই সবকিছুর ক্ষেত্রেই তাঁর সঙ্গীর সহযোগিতা তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অভিনয় জগতকে কেন্দ্র করেই তাঁর জীবনের অনেক সিদ্ধান্ত, আর সেই জায়গায় সমর্থন পাওয়া তাঁর কাছে বড় মানদণ্ড ছিল বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
উল্লেখ্য, ঐন্দ্রিলা শর্মা(Aindrila Sharma) ছিলেন বাংলা টেলিভিশনের এক পরিচিত মুখ। ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া এই অভিনেত্রী খুব অল্প বয়সেই দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। সান বাংলা(Sun Bangla)-র জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘জিয়ন কাঠি’(Jiyon Kathi) তাঁকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। টেলিভিশনের পাশাপাশি তিনি ‘লাভ কেফ’ ও ‘আমি দিদি নং ওয়ান’(Ami Didi No 1)-এর মতো টেলিফিল্মেও কাজ করেছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর দুপুর ১২টা ৫৯ মিনিটে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে তাঁর আকস্মিক মৃ’ত্যু বাংলা বিনোদন জগতে গভীর শোকের ছায়া ফেলে।
আজও ঐন্দ্রিলার স্মৃতি ঘিরে রয়েছে তাঁর পরিবার। বোনের অনুপস্থিতি যে কোনও দিনই পূরণ হওয়ার নয়, সে কথা জানেন ঐশ্বর্য নিজেও। তবু জীবনের পথে এগোতে হয় বলেই তিনি এগোচ্ছেন কখনও কাজের ব্যস্ততায়, কখনও নতুন সম্পর্কের আশ্রয়ে। কিন্তু বিয়ের আনন্দের মাঝেও যে এক চিলতে কষ্ট লুকিয়ে থাকে, এই সাক্ষাৎকার সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনে দিল।