Kunal Ghosh: সাংবাদিকতা ও রাজনীতির জগতে দীর্ঘদিন ধরেই এক পরিচিত নাম তিনি। বিতর্ক, স্পষ্টবক্তৃতা আর সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব উপস্থিতির জন্য বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কুণাল ঘোষ(Kunal Ghosh)। এবার সেই পরিচিত পরিসর ছাপিয়ে তাঁকে দেখা যাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভূমিকায় অভিনেতা হিসেবে। পরিচালক দুলাল দে(Dulal Dey)-র আসন্ন রাজনৈতিক থ্রিলারে অভিনয় করতে চলেছেন কুণাল ঘোষ, যা ইতিমধ্যেই টলিউডে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নিজের এই নতুন সফর, ব্যক্তিগত বিতর্ক, টলিউড তারকাদের সঙ্গে সম্পর্ক, সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক দিক, ধর্ম–জাতপাতের রাজনীতি এবং সাম্প্রতিক ‘অলি পাব’ বিতর্ক নিয়ে অকপট মতামত রাখলেন তিনি।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই নিজের স্বভাবসিদ্ধ রসিকতা বজায় রেখে কুণাল ঘোষ বলেন, “ফাঁদে পড়লাম তো! দুলালদের ফাঁদে পড়ে গেলাম।”
যদিও অভিনয়ের জগতে পা রাখছেন, তবু নিজের শিকড় ভুলে যাননি তিনি। নিজেকে ‘জ্যাক অফ অল ট্রেডস’ আখ্যা দিয়ে কুনাল জানান, লেখালেখি আর সাংবাদিকতাই তাঁর প্রথম ভালোবাসা। অভিনয়কে তিনি দেখছেন এক নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে কোনো পেশা পরিবর্তন নয়।
রাজনৈতিক থ্রিলারধর্মী এই ছবিতে তাঁকে ঠিক কোন চরিত্রে দেখা যাবে, তা নিয়ে এখনো রহস্য বজায় রেখেছেন নির্মাতারা। তবে রাজনীতির বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়ে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েই দর্শকদের আগ্রহ তুঙ্গে।
গত কয়েক মাস ধরে অভিনেতা ও সাংসদ দেবের সঙ্গে কুণাল ঘোষের সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ইস্যুতে প্রকাশ্যে মন্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছিল বিতর্ক। সেই প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠতেই কুণাল ঘোষ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সম্পর্কের অবনতি নয়, বরং ভুল ব্যাখ্যাই বেশি হয়েছে।
তিনি বলেন, “দেব(Dev)-এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালো। অভিনেতা বা তারকা হিসেবে ও আকাশছোঁয়া। কোনো ইস্যুতে আমি আমার জায়গা থেকে কথা বলেছি, কিন্তু তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বা অভিনয় সংক্রান্ত কোনো সংঘাত নেই।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইস্যুভিত্তিক মতামত আর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এক জিনিস নয়।
এক সময় প্রযোজক রানা সরকার(Rana Sarkar)-এর সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র সংঘাতে জড়িয়ে ছিলেন কুণাল ঘোষ। কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে ব্যক্তিগত আক্রমণ সবই হয়েছিল প্রকাশ্যে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক বদলেছে।এই বিষয়ে কুনাল বলেন, “একটা ইস্যুতে ঠোকাঠুকি হয়েছিল বলে সেটা সারাজীবন ধরে রাখা উচিত নয়। এখন আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কথা বলছি।” তাঁর মতে, পেশাগত বা মতাদর্শগত মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তা ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নেওয়া অপ্রয়োজনীয়।
পাবলিক ডোমেনে বিতর্ক প্রসঙ্গে কুনাল ঘোষের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, বিতর্ক মানেই কাদা ছোড়াছুড়ি নয়। বরং যুক্তির লড়াই হওয়া উচিত। তিনি বলেন, “আমার বিপক্ষে যিনি, তিনি তাঁর বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করবেন। আমিও আমার লজিক তুলে ধরব। বিচারটা মানুষই করবে। এটা স্পোর্টিংলি নেওয়াই ভালো।”
সাম্প্রতিক ‘অলি পাব’ বিতর্ক নিয়েও কুণাল ঘোষ রাখেন কড়া অবস্থান। নাম না করে এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের আচরণকে তিনি সস্তা নাটক ও প্রচারের চেষ্টা বলে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর প্রশ্ন, “যে রেস্টুরেন্ট বিফের খাবারের জন্য পরিচিত, সেখানে গিয়ে আবার হিন্দুত্ব দেখানোর নাটক কেন?”
তিনি এটিকে আদর্শের দ্বিচারিতা বলে আখ্যা দেন এবং স্পষ্ট জানান, এই ধরনের আচরণ শুধুই পাবলিসিটির জন্য করা।
বর্তমান প্রজন্মের একাংশের কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন কুনাল ঘোষ। তাঁর মতে, প্রযুক্তি যেমন ভালো কাজে লাগানো যায়, তেমনই কিছু মানুষ তা ভয়ংকরভাবে অপব্যবহার করছে। তিনি ক্ষো’ভ প্রকাশ করে বলেন, “শুধু লাইক আর ভিউয়ের নেশায় এরা প্রযুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করছে। এরা এক একজন মানসিক রোগী।” কুণালের মতে, এই ধরনের কন্টেন্ট সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সাক্ষাৎকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ধর্ম ও জাতপাত নিয়ে তাঁর বক্তব্য। বিভেদের রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করে তিনি বাংলার ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
কুণাল ঘোষ বলেন,বাংলা বরাবরই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জায়গা। জাতপাত বা ধর্মভেদে কোনো লাভ নেই। জীবনের আসল সংগ্রাম ‘রুটি, কাপড় আর মকান’-এর। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “কারোর চামড়া কাটলে রক্তের রং লালই বের হয়। হাসপাতালে গিয়ে কেউ বলে না, আমি অমুক ধর্মের রক্ত চাই।”
সাক্ষাৎকারের শেষভাগে এসে অভিনেতা–ইনফ্লুয়েন্সার সায়ক চক্রবর্তী(Sayak Chakraborty)-কে নিয়ে সরাসরি আক্রমণ করেন কুনাল ঘোষ। তাঁর মতে, সায়কের মতো কিছু তরুণ সোশ্যাল মিডিয়ার পরিবেশের জন্য ক্ষ’তি’ক’র।
তিনি বলেন, “ছেলেটি অত্যন্ত ডেপো এবং অত্যন্ত পাকা।” সায়াকের আচরণকে তিনি ‘অকালপক্ক’ ও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চালাক হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও রাজনৈতিক যোগসূত্রের প্রসঙ্গ উঠে আসে, কুণাল মূলত তাঁর সামাজিক আচরণ ও ডিজিটাল প্রভাব নিয়েই প্রশ্ন তোলেন।
সবশেষে কুণাল ঘোষ আশাবাদ প্রকাশ করেন যে, এই ধরনের সাময়িক বিতর্ক সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষ’তি করতে পারবে না। তাঁর বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত যুক্তি, মানবিকতা আর বাস্তব প্রয়োজনই মানুষের ভাবনাকে পরিচালিত করবে।
রাজনীতির ময়দান থেকে এবার রুপোলি পর্দা বিতর্ক, বক্তব্য আর স্পষ্ট অবস্থানের মাঝেই কুণাল ঘোষের এই নতুন অধ্যায় কতটা সফল হয়, সেদিকেই এখন নজর।