Pinky Banerjee: টলিউডে বহুদিন ধরেই পরিচিত নাম পিঙ্কি ব্যানার্জি(Pinky Banerjee)। অভিনেত্রী হিসেবে দীর্ঘ পথচলা, পর্দার আলো-ছায়া, সাফল্য-ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা, সব মিলিয়ে তাঁর জীবন নিজেই যেন এক চলমান গল্প। সম্প্রতি সেই গল্পে যুক্ত হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। একটি অনুষ্ঠানে পিঙ্কি ব্যানার্জি হাজির হয়েছিলেন তাঁর পুত্র ওশ(Osh Banerjee)-এর সঙ্গে। মা-ছেলের এই যৌথ উপস্থিতি কেবল তাঁদের আগামী কাজের খবরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সেই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে জীবনের দর্শন, সম্পর্কের গভীরতা এবং মূল্যবোধের কথা, যা ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকার প্রশ্নে উঠে আসে এক বিশেষ প্রাপ্তির প্রসঙ্গ, যা পিঙ্কি ব্যানার্জির কাছে নিঃসন্দেহে গর্বের। খুব শিগগিরই একই পর্দায় দেখা যাবে বাংলা সিনেমার তিন প্রজন্মকে প্রবীণ অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়(Sabitri Chatterjee), পিঙ্কি ব্যানার্জি(Pinky Banerjee) নিজে এবং তাঁর পুত্র ওশ। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি তাঁর জীবনের অন্যতম বড় ‘অ্যাসেট’ বলে ব্যাখ্যা করেন। পিঙ্কির মতে, একই ফ্রেমে তিন প্রজন্মের সহাবস্থান শুধুমাত্র অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নয়, বরং এটি এক বিরল আবেগের জায়গা, যা বারবার ফিরে আসে না।
সাক্ষাৎকারে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ উঠতেই পিঙ্কি ব্যানার্জি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি জানান, ৩০০-রও বেশি ছবিতে অভিনয় করা সত্ত্বেও সাবিত্রী দেবীর কাজের প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে আজও বিস্মিত করে। তাঁর কথায়, “এত কাজ করার পরও উনি এখনো শর্ট ফিল্মের স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করতে দুলে দুলে হাঁটেন, চরিত্রের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এই জায়গাটাই আমাদের শেখায় যে শেখার কোনও শেষ নেই।” পিঙ্কির মতে, অভিজ্ঞতা কখনই অহংকারের কারণ হওয়া উচিত নয়, বরং তা দায়িত্ববোধকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
আড্ডার ছলে, কিন্তু গভীর অর্থে পিঙ্কি ব্যানার্জি নিজের জীবনদর্শনকে ব্যাখ্যা করেন এক ব্যতিক্রমী উপমার মাধ্যমে। পুরানো বোরোলিনের বিজ্ঞাপনের লাইন টেনে তিনি বলেন, “জীবনটা আসলে ছক্কা-পাঞ্জার ভূত।” তাঁর ব্যাখ্যায়, জীবনে ওঠা-পড়া থাকবেই, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা যেন মনে স্থায়ী ক্ষ’ত তৈরি না করে। তিনি স্পষ্ট করে দেন, সাফল্যের আনন্দের চেয়েও ব্যর্থতার সময়কার কষ্ট মানুষকে বেশি শিক্ষা দেয়। কারণ সেই সময়েই মানুষ নিজেকে নতুন করে চিনতে শেখে।তাঁর কথায়, “ওঠার আনন্দের চেয়েও পড়ার সময়ের দুঃখটাই আসলে আমাদের প্রকৃত শিক্ষা দেয়।”
এই জীবনবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি স্লোগানও মা-ছেলে সাক্ষাৎকারে ভাগ করে নেন। তাঁদের কথায়, “We break, we burn, we repair, and lastly we grow।” অর্থাৎ, মানুষ ভা’ঙে, যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যায়, নিজেকে আবার গড়ে তোলে এবং শেষে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই বক্তব্য ইতিমধ্যেই নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই একে জীবনের বাস্তব চিত্র বলে উল্লেখ করছেন।
মা-ছেলের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সাক্ষাৎকারে। উত্তরে ওশ অকপটে জানায়, তার কাছে মা মানেই বেস্ট ফ্রেন্ড। সে বলে, “সবসময়, সব দিন আমি মাকে পাশে পাই।” এই কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে পিঙ্কি জানান, তাঁদের সম্পর্কটা অনেকটাই ‘বাডি সিস্টেম’-এর মতো। মা হিসেবে শাসন আছে, আবার বন্ধুর মতো বোঝাপড়াও আছে।
এই প্রসঙ্গেই পিঙ্কি একটি ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা শেয়ার করেন, যা শুনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই আবেগে ছুঁয়ে যান। একদিন তিনি ওশকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “ তুমি আমার জীবনে দেখা সেরা ভালো মানুষ(You are the best good man I have met in my life)।” উত্তরে ওশ যে কথা বলেছিল, তা পিঙ্কির জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি বলে তিনি মনে করেন। ওশ বলেছিল, “কারণ আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে তোমাকে ভেতর থেকে দেখেছি(Because I am the only person who has seen you from inside।” পিঙ্কির মতে, একজন মা হিসেবে এর চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু হতে পারে না।
পরিবারের মানসিকতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পিঙ্কি ব্যানার্জি জানান, তাঁদের পরিবার ভীষণ ইতিবাচক। তিনি একে আশীর্বাদ হিসেবেই দেখেন। সেই সঙ্গে তিনি তাঁর বাবার দেওয়া একটি উপদেশের কথাও তুলে ধরেন, যা আজও তাঁর জীবনের পথচলার দিশা দেখায়। উপদেশটি ছিল, যদি কখনো বোঝা যায়, আপনি যে ট্রেনে উঠেছেন তা আপনার গন্তব্যে যাচ্ছে না, তবে কারও সঙ্গে ঝগড়া না করে পরের স্টেশনেই নেমে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। পিঙ্কির মতে, যেখানে শান্তি নেই বা যা নিজের জন্য নয়, সেখান থেকে সম্মানের সঙ্গে সরে আসাই জীবনের সঠিক সিদ্ধান্ত।
ওশ ভবিষ্যতে কী হতে চায়, সেই প্রশ্নের উত্তরেও সে একদম স্পষ্ট। তার ইচ্ছে, সে অভিনেতা হতে চায়। অনুপ্রেরণা হিসেবে সে গর্বের সঙ্গে তার মায়ের নাম নেয়। “মা, আমার মামণি”, এই দুই নামই তার কাছে সবচেয়ে বড় শক্তি বলে জানায় সে।
সন্তান মানুষ করা প্রসঙ্গে পিঙ্কি ব্যানার্জির বক্তব্যও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, বড় হওয়াটা স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। তিনি বিশ্বাস করেন, এই মূল্যবোধ তৈরিতে জীবনমুখী গল্প, শর্ট ফিল্ম এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা রয়েছে।
একজন কর্মরতা মা হিসেবে পিঙ্কি মনে করেন, তাঁর কাজের প্রভাব সন্তানের ওপর ইতিবাচকভাবেই পড়েছে। তাঁর কথায়, “ছেলেরা যখন ছোট থেকেই দেখে যে তাদের মা কাজ করছে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিচ্ছে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই নারীদের সম্মান করতে শেখে।” এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের সমাজে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করছেন অনেকেই।
ওশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আকাশপ্রদীপ’ নিয়েও সাক্ষাৎকারে কথা ওঠে। নিজের প্রথম কাজ নিয়ে সে ভীষণ উচ্ছ্বসিত। একই সঙ্গে বিনয়ী স্বীকারোক্তিও করে তার এখনও অনেক কিছু শেখার আছে। তবে অভিনয়ের প্রতিটি মুহূর্ত সে উপভোগ করছে, এটুকু বলতে ভোলেনি।
সবচেয়ে চমকপ্রদ উত্তর আসে তখন, যখন ওশকে জিজ্ঞেস করা হয় সে জীবনে সবচেয়ে বেশি কী করতে ভালোবাসে। তার উত্তর- “লিভিং লাইফ।” জীবনের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সে বলে, “জীবন একটা রোলার কোস্টারের মতো। এটা কখনও উপরে ওঠে, কখনও নীচে নামে, কখনও বা আঁকাবাঁকা পথে চলে। তবে টিকে থাকতে হলে একে শক্ত করে ধরে রাখতে হয়।”
সবশেষে পিঙ্কি ব্যানার্জি তাঁর ছেলেকে দেওয়া কিছু উপদেশের কথা শেয়ার করেন। ভুল করার স্বাধীনতা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং ক্ষমা চাইতে শেখা, এই তিনটি বিষয়কে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করে জানান, ছেলে বড় হয়ে ধনী না হলেও তাঁর আক্ষেপ নেই। কিন্তু বড় হয়ে যদি সে অমানুষ হয়, তাহলে মা হিসেবে তিনি ভীষণ কষ্ট পাবেন। তাঁর কাছে মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই আসল পরিচয়। তিনি বলেন, “ছেলে বড় হয়ে বড়লোক নাহলেও আমার আক্ষেপ নেই, কিন্তু বড়লোক হয়ে যদি ছোটলোক (অমানুষ) হয়, তবে মা হিসেবে খুব কষ্ট পাব।”
মা ও ছেলের এই খোলামেলা কথোপকথন, ইতিবাচক মানসিকতা এবং গভীর জীবনবোধ ইতিমধ্যেই নেটদুনিয়ায় প্রশংসা কুড়িয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একজন আধুনিক মা ও এক উঠতি শিল্পীর এই দৃষ্টিভঙ্গি যে বহু মানুষের ভাবনায় নতুন আলো ফেলেছে, তা বলাই যায়।