Probase Ghorkonna: সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ব্যক্তিগত জীবন আর কতটা ব্যক্তিগত এই প্রশ্ন ফের সামনে এনে দিলেন জনপ্রিয় প্রবাসী বাঙালি ইউটিউবার মহুয়া গঙ্গোপাধ্যায়(Mahua Gangopadhyay)। ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী এই ভ্লগার তাঁর চ্যানেল ‘প্রবাসে ঘরকন্না’(Probase Ghorkonna)-র মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরেই বাঙালি দর্শকদের কাছে পরিচিত মুখ। কিন্তু সাম্প্রতিক দুটি ভ্লগ ঘিরে নেটদুনিয়ায় তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। শাশুড়ির মৃ’ত্যু’কে কেন্দ্র করে তৈরি করা ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই একাংশের ক্ষো’ভে ফেটে পড়া আবার অন্যদিকে সমর্থনের সুরও কম শোনা যাচ্ছে না।
মহুয়ার শ্বশুরবাড়ি পশ্চিমবঙ্গের হালিশহরে। সেখানেই থাকেন তাঁর স্বামীর পরিবার। ক্যালিফোর্নিয়ায় সংসার গড়লেও শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ বরাবরই বজায় রেখেছেন তিনি। সম্প্রতি তাঁর শাশুড়ির মৃ’ত্যু সংবাদ আসে। দুঃসংবাদ পাওয়ার পর মহুয়া ও তাঁর পরিবার তড়িঘড়ি করে ভারতে ফিরে আসেন। এত পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ স্বাভাবিকই ছিল। বিতর্কের সূত্রপাত হয় এরপর।
হালিশহরের বাড়িতে পৌঁছে শাশুড়ির শেষকৃত্যের আগের মুহূর্ত, বাড়িতে শ’ব’দে’হ আনা, শোকস্তব্ধ পরিবেশ—সবকিছুই ক্যামেরাবন্দি করেন মহুয়া। শুধু তাই নয়, নিয়মিত ভ্লগের মতোই সেই ভিডিও সম্পাদনা করে আপলোডও করা হয় তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে। মৃ’ত্যুশোকের আবহে এমন ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয় জোর চর্চা।
‘প্রবাসে ঘরকন্না’ চ্যানেলটি ইতিমধ্যেই বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বিদেশের মাটিতে থেকেও বাঙালি সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ, সন্তান প্রতিপালন এই বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে তাঁর কনটেন্ট বহু মানুষের মন জয় করেছে। বিশেষ করে ভারত, এবং তার মধ্যে বাংলা থেকে প্রচুর দর্শক নিয়মিত তাঁর ভিডিও দেখেন। সংসারের খুঁটিনাটি, বিদেশে জীবনযাত্রা, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে উৎসব সবই জায়গা পায় তাঁর ক্যামেরায়। বিদেশে থেকেও সন্তানদের বাঙালি রীতিনীতিতে বড় করে তোলার চেষ্টা এবং সুসংগঠিত পারিবারিক জীবনযাপনের চিত্র দর্শকদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে বহুবার।
কিন্তু সদ্য প্রকাশিত দুটি ভ্লগ যেন সেই প্রশংসার ধারায় ছন্দপতন ঘটিয়েছে। একাংশের মতে, মৃ’ত্যু অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ব্যক্তিগত একটি মুহূর্ত। প্রিয়জন, বিশেষ করে মা বা শাশুড়ির মতো মাতৃস্থানীয় মানুষের প্রয়াণের সময় সাধারণত পরিবার শোকে আচ্ছন্ন থাকে। সেই আবহে ক্যামেরা অন রেখে ভিডিও ধারণ করা অনেকের চোখে অসংবেদনশীল বলেই মনে হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সমালোচনার ঝড় ওঠে। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন শোকের মুহূর্তেও কি কনটেন্ট তৈরি করতেই হবে? বাড়িতে যখন শ’ব’দে’হ রাখা হয়েছে, শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে, পরিবারের সদস্যরা আবেগে ভেঙে পড়ছেন তখন সেই দৃশ্য ধারণ করে প্রকাশ্যে আনা কি শোভন? অনেকেই মন্তব্য করেছেন, ব্যক্তিগত বেদনা আর পাবলিক কনটেন্টের সীমারেখা কোথায় টানা উচিত, সেই বোধ থাকা জরুরি।
কেউ বলছে,’দিদিভাই মায়ের মৃ’ত্যু আর হেসে প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরা সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বড্ড বেশি চোখে লাগল।’
কেউ লিখছে,’ধুর না আসলেই ভালো হতো …ব্লগ দিয়ে ইনকাম করতে এসেছেন’। কেউ বা লিখছে, ‘চোখে জলটাই শুধু অভিনয়, বাকি সবই স্বাভাবিক। ধিক্কার জানাই এদের মানসিকতার।’ একজন লিখেছেন,’নিজের মা মা’রা গেলে এত সুন্দর হাসিমুখে ব্লগ করতে পারতেন?’ আরেকজন লিখছেন,’মায়ের মৃত্যুর জন্যই অপেক্ষায় ছিলেন হয়ত, কারণ ভিউস বেশি হয় এবং ইনকামটাও বেশি আসে’। আবার কেউ লিখেছে, ‘আজকে বুঝলাম মানুষের জীবনে পয়সা রোজগার করাটাই সব! খুব দুঃখ পেলাম! এরকম একটা থাম্বনেল কি ইচ্ছে করেই দেওয়া হয়েছে?’
তবে ছবিটা একপাক্ষিক নয়। সমালোচনার পাশাপাশি সমর্থনের সুরও শোনা গিয়েছে জোরালোভাবে। মহুয়ার দীর্ঘদিনের অনুগামীদের একাংশের বক্তব্য, তিনি বরাবরই নিজের জীবনের নানা মুহূর্ত খোলামেলাভাবে ভাগ করে নিয়েছেন দর্শকদের সঙ্গে। লিখেছেন কেউ,’সুখ-দুঃখ মিলিয়েই তো জীবন। সেই সূত্রে এই ঘটনাও তিনি গোপন করেননি মাত্র।’ লিখেছেন কেউ,’ ওনার চোখ মুখ এর ভাষাতেই বোঝা যাচ্ছে উনি কতটা শোকাহত। কে কি বলছে এই নিয়ে আপনি বিচলিত হবেন না মহুয়া দি…।’
ভ্লগের শুরুতেই মহুয়া নিজে এই বিতর্কের সম্ভাবনা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেন। তিনি জানান, পরিবারের সদস্যদের অনুরোধেই এই ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। তাঁদের ইচ্ছা ছিল, শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটির স্মৃতি ভিডিওর মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকুক। সেই কারণেই ক্যামেরা চালু রাখা হয়েছিল বলে জানান তিনি। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও সামনে আনেন মহুয়া এই ভ্লগ থেকে কোনওরকম আর্থিক লাভ তিনি করতে চান না। তাই ভিডিওটির মনিটাইজেশন বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
এই ঘোষণার পর অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের যুক্তি, যদি সত্যিই আর্থিক লাভের উদ্দেশ্য না থাকে এবং পরিবারের সম্মতিতেই ভিডিওটি করা হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি একান্তই তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কেউ কেউ বলেছেন, বর্তমান সময়ে অনেকেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ভিডিও করে রাখেন বিয়ে, জন্মদিন, সন্তানের জন্ম তাহলে মৃত্যু কেন তার বাইরে থাকবে? স্মৃতি ধরে রাখার নিজস্ব পদ্ধতি প্রত্যেকের আলাদা হতে পারে।
তবে সমালোচকেরা পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন জনপ্রিয় ভ্লগারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও জনসমক্ষে আলোচিত হবেই। কারণ তাঁর কনটেন্ট লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখেন। ফলে সংবেদনশীল ঘটনার উপস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভিউ’ আর ‘এনগেজমেন্ট’-এর চাপ ক্রমশ বাড়ছে, তখন মানবিকতা ও ব্যক্তিগত পরিসরের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ার নৈতিকতা নিয়ে চিরন্তন বিতর্ক। কোথায় ব্যক্তিগত জীবনের সীমানা শেষ হয় আর কোথা থেকে শুরু হয় কনটেন্ট তার নির্দিষ্ট সংজ্ঞা বোধহয় এখনও তৈরি হয়নি। একদিকে রয়েছে স্মৃতি সংরক্ষণের ইচ্ছা, অন্যদিকে রয়েছে শোকের মর্যাদা রক্ষার দায়।
মহুয়া গঙ্গোপাধ্যায়ের এই ভ্লগ ঘিরে মতভেদ যতই থাকুক, একটি বিষয় স্পষ্ট ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তই জনসমালোচনার মুখে পড়তে পারে। আর সেই সমালোচনার মধ্যেই হয়তো তৈরি হচ্ছে নতুন সামাজিক মানদণ্ড, যেখানে সংবেদনশীলতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং জনদায়িত্ব তিনটিরই ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।