Raj Chakrabarty:সরস্বতী পুজোর আবহে গত ২৩ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছে রাজ চক্রবর্তী(Raj Chakrabarty )পরিচালিত ছবি ‘হোক কলরব’(Hok Kolorob)। ছবি মুক্তির পর থেকেই বি’ত’র্ক যেন পিছু ছাড়ছে না পরিচালককে। বড়পর্দায় মুক্তি পাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই এবার আইনি নোটিশের মুখে পড়লেন রাজ। অভিযোগ উঠেছে, এই ছবির মাধ্যমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষু’ণ্ণ করা হয়েছে। অভিযোগকারী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তনী, যিনি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ও ইতিহাসের র’ক্ষ’ক হিসেবে সামনে এনেছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ছবিটির নাম ঘোষণার সময় থেকেই ‘হোক কলরব’ নিয়ে শুরু হয়েছিল জোর চ’র্চা। কারণ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্র আন্দোলনের সময় এই স্লোগানটি অত্যন্ত পরিচিত হয়ে ওঠে। ফলে, সেই ঐতিহাসিক স্লোগানকে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত এক পরিচালকের ছবির শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে প্রথম থেকেই নানা প্রশ্ন উঠছিল। ছবির পোস্টার প্রকাশ্যে আসার পর সেই আলোচনা আরও তীব্র হয়। অনেকের মধ্যেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, আদৌ এই ছবি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসকে কোন দৃষ্টিতে তুলে ধরবে।
বিতর্কের পারদ আরও চড়তে শুরু করে ছবির ট্রেলার প্রকাশের পর। ট্রেলারে অভিনেতা শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়(Saswata Chatterjee)-কে বলতে শোনা যায়, “নমস্কার, আমি ক্ষুদিরাম চাকী। না, আমি ঝুলি না, ঝোলাই!” এই সংলাপ ঘিরে তখনই একাধিকমহলে ক্ষো’ভ তৈরি হয়। ঐতিহাসিক বিপ্লবী ক্ষুদিরাম চাকীর নাম ও পরিচয়ের এই উপস্থাপনাকে অবমাননাকর বলেও অভিযোগ ওঠে। যদিও সেই সময় পরিচালক বা নির্মাতারা এই বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেননি।
এবার ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পর বিতর্ক আরও এক ধাপ এগোল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তনী সমাজমাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেন, যেখানে তিনি অভিযোগ তোলেন যে, “Legal Notice to Raj Chakraborty:সম্প্রতি ‘Hok Kolorob’ নামের এক সিনেমায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে লক্ষ্য করে নানাভাবে মিথ্যাচার করা হয় – যা তার trailer ও teaser দেখেই স্পষ্ট – পেট্রল বো’মা ছোড়া বা থানায় আ’গু’ন লাগিয়ে দেওয়ার মতো মা’রা’ত্ম’ক ক্রা’ই’ম দেখানো হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে; শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বা মিছিল হলেও বিগত ৫০ বছরের ইতিহাসে এর কোনো নিদর্শন নেই!
একজন প্রাক্তনী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানহানির বিরুদ্ধে এইটুকু প্রতিবাদ রইলো – ব্যক্তিগত আইনি নোটিশ পাঠালাম রাজ চক্রবর্তী কে – সাথে CBFC ও আরও সিনেমার রেগুলেশন বোর্ড কেও জানিয়েছি!
ভগবানে বিশ্বাস করলেও মূর্তি পুজোয় বিশ্বাস করিনা; আমার কাছে মন্দির একটাই – যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়| যাদবপুর ছাড়া পড়াশুনাটুকু চালিয়ে যেতে পারতো না আজও এরকম বহু পড়ুয়া সারা বাংলা তথা ভারত জুড়ে রয়েছে – মাত্র ১০,০০০ টা’কা’র মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া যাবে এমন কলেজ আছে আর? যেকোনো র্যাঙ্ক সিস্টেমে পশ্চিমবঙ্গের সেরা রাজ্য-সরকারি কলেজ আজও যাদবপুর – সারাক্ষন আমরা এসব করলে (সিনেমায় যা দেখানো হয়েছে) পড়াশুনা করলাম কখন?
হয়তো ল’ড়া’ই’য়ে জিততে পারবোনা (বা পারবো) কিন্তু এটা লেখা থাকবে যাদবপুরের ছাত্র ও প্রাক্তনীরা লড়েছিল; সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী ও প্রাক্তনী কে অনুরোধ আপনারা প্রতিবাদ টুকু করুন – যাদবপুর বাংলার অহংকার – একে শেষ হতে দেবেন না!
শিল্পীর স্বাধীনতা থাক, মিথ্যা না ছড়িয়ে”
তাঁর অভিযোগ, একটি সম্মানজনক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অপরাধপ্রবণ ও অরাজক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের নয়, প্রাক্তনীদের কাছেও অপমানজনক।
এই কারণেই তিনি রাজ চক্রবর্তী(Raj Chakrabarty)-র বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে আইনি নোটিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। শুধু পরিচালক নন, তিনি এই বিষয়ে সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC) এবং অন্যান্য সিনেমা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকেও বিষয়টি জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, শিল্পীর স্বাধীনতা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার নামে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে কোনও প্রতিষ্ঠানের মানহানি করা গ্রহণযোগ্য নয়।
নিজের পোস্টে ওই প্রাক্তনী আরও আবেগঘন ভাষায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেছেন। তিনি লেখেন, ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকলেও তিনি মূর্তি পুজোয় বিশ্বাসী নন, তাঁর কাছে একমাত্র ‘মন্দির’ হল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁর দাবি, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণেই বহু মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ছাত্রছাত্রী স্বল্প খরচে উচ্চমানের শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। মাত্র দশ হাজার টা’কা’র মধ্যেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ দেওয়া এমন প্রতিষ্ঠান আজও দেশের মধ্যে বিরল বলেই তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও জানান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আজও পশ্চিমবঙ্গের সেরা রাজ্য-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে অন্যতম এবং বিভিন্ন র্যাঙ্কিংয়েও তার অবস্থান উজ্জ্বল। সেই জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে যদি ছবিতে দেখানো কর্মকাণ্ডই বাস্তব হত, তাহলে আদৌ পড়াশোনা চলত কীভাবে এই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, এই আইনি ল’ড়া’ই’য়ে জয়ী হওয়া অনিশ্চিত। তবুও তাঁর মতে, ভবিষ্যতের ইতিহাসে অন্তত এটা লেখা থাকবে যে, যাদবপুরের ছাত্র ও প্রাক্তনীরা তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান রক্ষার জন্য প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি সমস্ত বর্তমান ছাত্রছাত্রী ও প্রাক্তনীদের এই প্রতিবাদে সামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শুধুমাত্র একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলার গর্ব। কোনওভাবেই এই গর্বকে নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ‘হোক কলরব’(Hok Kolorob) কি শুধুই একটি কাল্পনিক গল্প, না কি বাস্তবের কোনও প্রতিষ্ঠানের ছায়া ইচ্ছাকৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে? পরিচালক রাজ চক্রবর্তী(Raj Chakrabarty) বা ছবির নির্মাতারা এই আইনি নোটিশের জবাবে কী পদক্ষেপ নেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে টলিউড ও রাজনৈতিকমহল। বিতর্কের মাঝেই ছবিটি দর্শকমহলে কী প্রভাব ফেলে, সেটাও সময়ই বলবে।