Raja Goswami: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দাপটে আজ মানুষের পরিচয়, জনপ্রিয়তা এবং প্রভাব সবকিছুই যেন নির্ধারিত হচ্ছে ‘ফলোয়ার’ ও ‘লাইক’-এর অঙ্কে। এই প্রবণতাকেই সরাসরি আ’ক্র’ম’ণ করে বি’স্ফো’র’ক মন্তব্য করলেন জনপ্রিয় অভিনেতা রাজা গোস্বামী(Raja Goswami)। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় তিনি নাম না করেই কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন একাংশ সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের। নেটিজেনদের একাংশের মতে, তাঁর বক্তব্যের নিশানায় ছিলেন ইনফ্লুয়েন্সার অনন্যা গুহ(Ananya Guha)।
ঘটনার সূত্রপাত একটি ভিডিওকে ঘিরে। গাড়ির যান্ত্রিক সমস্যায় ক্ষু’ব্ধ হয়ে একটি সংস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ভিডিও করেন রাহুল(Rahul Arunoday Banerjee)। অভিযোগ, মাত্র ছ’মাসের মধ্যে চারবার নতুন গাড়ি বিকল হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরব হয়ে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষো’ভ উগরে দেন। এরপরই শুরু হয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া। অনন্যা নাম না নিয়ে একটি পোস্টে প্রশ্ন তোলেন যদি ভিডিও বানানো নিয়েই আপত্তি থাকে, তবে এখন কি ফেসবুকই সার্ভিস সেন্টারের বিকল্প? তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি।
পাল্টা রাহুল সরাসরি নাম উল্লেখ করে পোস্ট করেন এবং অনন্যাকে ‘ভীতু’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার চ্যালেঞ্জ ছোঁড়েন। পুরানো পার্ক স্ট্রিটের একটি রেস্তোরাঁ-সংক্রান্ত ঘটনার রেশ টেনে ব্যক্তিগত ক’টা’ক্ষেও পৌঁছে যায় এই ঠান্ডা লড়াই। অল্প সময়ের মধ্যেই বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
এই আবহেই মুখ খোলেন রাজা গোস্বামী(Raja Goswami)। ভিডিও বার্তায় তিনি সমাজের বর্তমান মানসিকতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর কথায়, এখন মানুষকে বিচার করার প্রধান মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ফলোয়ার সংখ্যা। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা বা ব্যক্তিত্বের চেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তা। রাজা বলেন, “সময় এমন দিকে এগোচ্ছে যখন মানুষ হয়ত নিজের মা-বাবাকেও ফলোয়ার দিয়ে বিচার করবে। তাঁদের ফলোয়ার কম থাকলে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলতেও পিছপা হবে না কেউ কেউ।”
দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ইন্ডাস্ট্রির পরিবর্তিত সংস্কৃতির কথাও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, আগে নতুনরা সিনিয়র শিল্পী, পরিচালক ও লেখকদের প্রতি সম্মান দেখাতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। তাঁর আক্ষেপ, “এখন সিনিয়রিটির মূল্য কমে যাচ্ছে। কারও কয়েক মিলিয়ন ফলোয়ার থাকলেই সে মনে করছে, ইন্ডাস্ট্রির প্রবীণদের নিয়ে যা খুশি তাই বলা যায়।”
ভিডিওতে আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন অভিনেতা। তাঁর অভিযোগ, জনপ্রিয়তার মোহে অনেকে সম্পর্কের পবিত্রতাও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করছেন না। তিনি বলেন, “ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য মানুষ সম্পর্ক বেচবে, বন্ধুত্ব বেচবে, এমনকি দেশের স্বার্থও বিসর্জন দেবে এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামান্য অর্থের বিনিময়ে ঘৃণা ছড়াতেও অনেকে পিছপা হচ্ছে না।” তাঁর এই মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
তবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে রাজা জানান, তিনি নিজেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন, কিন্তু কাউকে কখনও লাইক বা ফলোয়ারের ভিত্তিতে বিচার করেন না। তাঁর আহ্বান, যাঁরা বড়দের অসম্মান করেন বা টাকার বিনিময়ে বিভাজনমূলক কন্টেন্ট ছড়ান, তাঁদের সমর্থন করা উচিত নয়। তিনি সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করেন, “এই ধরনের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বয়কট করুন। সাপোর্ট বন্ধ করলে তবেই পরিবর্তন আসবে।”
রাজার এই বক্তব্য ভাইরাল হতে বেশি সময় নেয়নি। ঠিক সেই সময়েই অনন্যা গুহ তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে একটি পোস্ট করেন, যা নিয়ে শুরু হয় নতুন জল্পনা। তিনি একটি পারিবারিক ছবি শেয়ার করেন, যেখানে তাঁকে বাবা-মায়ের সঙ্গে হাসিমুখে সেলফি তুলতে দেখা যায়। ছবির উপর লেখা বার্তায় তিনি বলেন, “জানবেন যখন কেউ আপনার মা-বাবা তুলে কথা বলছে সে আপনার থেকে যতই বড় হোক না কেন সে বড়ই ছোট হয়ে যায়”। নেটিজেনদের একাংশ এই পোস্টকে রাজার মন্তব্যের পরোক্ষ জবাব হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
কারণ, রাজা তাঁর ভিডিওতে মা-বাবাকে ফলোয়ার দিয়ে বিচার করার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। অনন্যার বক্তব্যে যেন সেই ইঙ্গিতেরই পাল্টা বার্তা সম্মান, বয়স বা জনপ্রিয়তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় আচরণ দিয়ে। যদিও সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করেননি তিনি, তবু সময়কাল ও প্রেক্ষাপট মিলিয়ে এই পোস্ট ঘিরে চর্চা আরও তীব্র হয়।
এই ঘটনার জেরে প্রশ্ন উঠছে, বিষয়টি কি নিছক ব্যক্তিগত মতানৈক্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর মূল্যবোধের সংঘাত? একদিকে রাজা গোস্বামী সিনিয়রিটির মর্যাদা ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথা বলছেন। অন্যদিকে অনন্যা গুহর পোস্টে উঠে আসছে ব্যক্তিগত সম্মান ও পারিবারিক মর্যাদার প্রশ্ন।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই ধরনের বাকযুদ্ধ নতুন নয়। তবে এ ক্ষেত্রে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জনপ্রিয়তা বনাম মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব। ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব কতটা বাস্তব সম্পর্ককে নাড়িয়ে দিচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে। রাজার বক্তব্যে ফুটে উঠেছে এক ধরনের হতাশা যেখানে সংখ্যাই সবকিছু নির্ধারণ করছে। আর অনন্যার ইঙ্গিতে স্পষ্ট, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা পরিবারকে টেনে আনা কোনও অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দু’পক্ষের কেউই সরাসরি একে অপরের নাম উচ্চারণ না করলেও, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের বক্তব্যকে মুখোমুখি অবস্থান হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ফলে বিতর্ক আরও উসকে উঠেছে। নেটিজেনদের একাংশ রাজার বক্তব্যে সমর্থন জানিয়ে বলছেন, সত্যিই ফলোয়ার সংস্কৃতি সমাজে এক নতুন অসুস্থ প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন, ব্যক্তিগত আক্রমণের ইঙ্গিত দেওয়া ঠিক হয়নি।
এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে, তা সময়ই বলবে। তবে স্পষ্ট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব এখন কেবল বিনোদনের সীমায় আবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে পড়েছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পেশাগত সম্মান এবং সামাজিক মূল্যবোধের প্রশ্নেও। আর সেই কারণেই রাজা গোস্বামী ও অনন্যা গুহর এই পরোক্ষ বাকযুদ্ধ নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে ফলোয়ার কি সত্যিই মানুষের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে?