Ranojoy Bishnu: “ফলোয়ার্স বেশি বলেই অনেকে কাজ পাচ্ছেন…অভিনয় নয়, এখন চলছে ব্যবসার স্ক্যা’ম!”— টিআরপি, ফলোয়ার্স আর প্রযোজক মা’ন’সি’ক’তা নিয়ে টলিউডে বি’স্ফো’র’ক রণজয় বিষ্ণু

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
Instagram Group Join Now

Ranojoy Bishnu: বর্তমান বাংলা টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের বাস্তবতা নিয়ে আর রাখঢাক না রেখেই মুখ খুললেন জনপ্রিয় অভিনেতা রণজয় বিষ্ণু(Ranojoy Bishnu)। একটি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি যে মন্তব্যগুলি করেছেন, তা ইতিমধ্যেই টলিপাড়ার অন্দরে তীব্র আলোড়ন ফেলেছে। অভিনয়ের মানদণ্ড থেকে শুরু করে টিআরপি(TRP), সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার্স, প্রযোজকদের মানসিকতা এবং বাংলা ছবির ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া সব মিলিয়ে বর্তমান ইন্ডাস্ট্রিকে তিনি কার্যত কাঠগড়ায় তুলেছেন। রণজয়ের স্পষ্ট বক্তব্য, আজ অভিনয় নয়, বরং অভিনয়ের নামে এক ধরনের ‘ভয়ঙ্কর স্ক্যাম’ চলছে।

সাক্ষাৎকারে রণজয় প্রথমেই আঙুল তুলেছেন অভিনয় মূল্যায়নের বর্তমান ধারার দিকে। তাঁর মতে, বিশেষ করে সিরিয়ালকেন্দ্রিক একটি অদ্ভুত ও বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এখন ভালো অভিনেতা বলতে বোঝানো হচ্ছে সেই ব্যক্তিকে, যিনি একনাগাড়ে বহু সংলাপ মুখস্থ করে একইভাবে বলে দিতে পারেন। রণজয়ের কথায়, “কে কত বেশি সংলাপ একবারে মনে রেখে বলতে পারে, সেটাই এখন অভিনয়ের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা ভয়ঙ্কর একটা স্ক্যাম।” তাঁর মতে, সংলাপ বলা অভিনয়ের একটি মাত্র অংশ আবেগ, শরীরী ভাষা, পরিস্থিতির গভীরতা বোঝা, চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়া এই সবকিছু উপেক্ষা করে কেবল মুখস্থবিদ্যাকে প্রাধান্য দিলে অভিনয় শিল্পটাই ধ্বংসের মুখে পড়ে।

এই প্রসঙ্গ থেকেই রণজয় টেনে আনেন টিআরপি বনাম অভিনয় শিল্পের বিতর্ক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, টিআরপি আর ভালো অভিনয়ের মধ্যে কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই। “সুপারহিট টিআরপি মানেই সেখানে দারুণ অভিনয় হচ্ছে এই ধারণাটাই ভুল,” বলেন তিনি। তাঁর মতে, টিআরপি একটি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবসায়িক সূচক, যা মূলত চ্যানেলের লাভ-ক্ষ’তি’র সঙ্গে যুক্ত। অভিনয় একটি শিল্প, আর শিল্পকে ব্যবসার একই পাল্লায় মাপলে তার স্বাভাবিক মৃ’ত্যু অনিবার্য। রণজয় মানেন যে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ ব্যবসা ভালো বোঝেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে টিআরপি বেশি হলেই সেই কনটেন্ট বা অভিনয় মানসম্মত হয়ে উঠছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়েও রণজয় বিষ্ণুর মন্তব্য কম বিতর্কিত নয়। বর্তমান সময়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবের জনপ্রিয়তা যে অভিনয় জগতে প্রবেশের এক বড় দরজা হয়ে উঠেছে, তা অস্বীকার করেননি তিনি। তবে এই প্রবণতার নেতিবাচক দিক নিয়েই তাঁর মূল আপত্তি। রণজয়ের বক্তব্য, এখন অনেক ক্ষেত্রেই অভিনয় দক্ষতার চেয়ে ফলোয়ার্স সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। “ফলোয়ার্স বেশি বলেই অনেকে কাজ পাচ্ছেন, আর অনেক ভালো অভিনেতা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ঘরে বসে আছেন,” এই মন্তব্যে বর্তমান কাস্টিং পদ্ধতির দিকেই সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়া নতুন প্রতিভাকে তুলে ধরতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেটাই যদি একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে প্রকৃত অভিনয়শিল্পীদের জায়গা কোথায়?

আরও পড়ুন:Kunal Ghosh:”লাইক আর ভিউয়ের নে’শা’য়, এরা মা’ন’সি’ক রো’গী…ছেলেটি অত্যন্ত পাকা, হি’ন্দু’ত্ব দেখানোর নাটক কেন?”…”এখন আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কথা বলছি”… সায়ক চক্রবর্তীকে নিশানা কুণাল ঘোষের সঙ্গে দেবকে কী বললেন তিনি?

এখানেই শেষ নয়। রণজয়ের আক্ষেপ, আজকের দিনে একজন অভিনেতা হতে গেলে শুধু অভিনয় জানলেই আর চলে না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কতটা সক্রিয়, কীভাবে নিজেকে ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে তৈরি করা যায় এই সবকিছু এখন বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর কথায়, অভিনয়ের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজ করা এখন প্রায় আলাদা একটি কাজ। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন হলেও, বর্তমান ইন্ডাস্ট্রি অভিনেতাদের সেই দিকেই ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

শুধু টেলিভিশন নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থাও রণজয়ের সমালোচনার বাইরে থাকেনি। যখন দক্ষিণ ভারতের ছবি আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসা কুড়োচ্ছে, একের পর এক ভাষায় রিমেক হচ্ছে, তখন বাংলা ছবি কেন সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না এই প্রশ্ন তুলে রণজয় কার্যত টলিউডের আত্মসমালোচনার ডাক দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “আজ সাউথের ছবিগুলো তিন-চারটে ভাষায় রিমেক হচ্ছে। আমাদের কটা হচ্ছে? কেন হচ্ছে না? কোথাও তো আমরা পিছিয়ে আছি।” এই পিছিয়ে পড়ার জন্য তিনি কোনো একজন ব্যক্তিকে দায়ী না করে পুরো সিস্টেমকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন।

আরও পড়ুন:Swastika Mukherjee:“প্রেম না করলে অলি পাব–গো’মাং’স–সায়ক নিয়েই মাততে হবে…৩–৪টে প্রেম করাই ভালো”- সমালোচকদের একহাত নিলেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়

বিশেষ করে প্রযোজকদের একাংশের মানসিকতা নিয়ে রণজয়ের ক্ষো’ভ ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি জানান, যেসব প্রযোজক মিটিংয়ের শুরুতেই অন্য বড় প্রোডাকশন হাউসকে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি বা বড় বড় কথা বলেন, তাদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি আগ্রহী নন। রণজয়ের সাফ কথা, “মুখে বড় কথা বলা সহজ। আগে নিজে ভালো কাজটা করে দেখাও, তারপর অন্যদের নিয়ে কথা বলো।” তাঁর মতে, এই ধরনের ফাঁকা আত্মবিশ্বাসই ইন্ডাস্ট্রির ক্ষ’তি’র অন্যতম কারণ।

বাংলা ছবির আয়ু কমে যাওয়ার বিষয়েও রণজয় স্পষ্টভাবে নিজের মতামত দিয়েছেন। আজ অনেক ছবি বড়জোর এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যেই হল থেকে উঠে যাচ্ছে। এর পেছনে তিনি দায়ী করেছেন দুর্বল কাস্টিং, একই মুখের বারবার পুনরাবৃত্তি এবং সামগ্রিক পরিকাঠামোর অভাবকে। দর্শক একঘেয়েমিতে ভুগছে, নতুন কিছু পাচ্ছে না এই বাস্তবতাই বাংলা ছবির বাজারকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন:Mimi Chakraborty:“এটা একটা পুরুষশাসিত সমাজ…” “ভগবানের নাম আর রুদ্রাক্ষে ধার্মিক হওয়া যায় না— ধর্ম হয় কর্মে”, “আমার ভয়েস কেউ নীচে করতে পারবে না, আজ অব্দি পারেনি, পারবে না, আমি ভয় পাই না..ভয় পাই আমার কর্মকে”- বিতর্কে মুখ খুলে কড়া বার্তা মিমি চক্রবর্তীর

তবে শুধু সমালোচনা নয়, কর্পোরেট সংস্কৃতি নিয়ে রণজয়ের অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট ও ইতিবাচক। যাঁরা দীর্ঘদিনের চেষ্টায় টলিউডে একটি কর্পোরেট কাঠামো গড়ে তুলেছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অভিনেতা। তাঁর মতে, পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও পরিকাঠামো ছাড়া কোনো ইন্ডাস্ট্রি এগোতে পারে না। যারা এই ভিত্তি তৈরি না করেই বড় বড় কথা বলেন, তারাই আসলে ইন্ডাস্ট্রির ক্ষ’তি করছেন।

সব মিলিয়ে রণজয় বিষ্ণুর এই মন্তব্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষো’ভে’র বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং বাংলা টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের এক কঠিন বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। অভিনয় বনাম ব্যবসা, প্রতিভা বনাম জনপ্রিয়তা, শিল্প বনাম মুনাফা এই দ্বন্দ্বের মাঝেই আজ দাঁড়িয়ে টলিউড। রণজয়ের প্রশ্ন, এই লড়াইয়ে আদৌ কি শিল্প বাঁচবে? তাঁর এই বিস্ফোরক বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দেবে কি না, সে উত্তর দেবে সময়ই। তবে এটুকু নিশ্চিত, তাঁর কথাগুলো টলিপাড়াকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

Leave a Comment