Sabitri Chatterjee:বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় (Sabitri Chatterjee)। দীর্ঘ কর্মজীবনের পথে তিনি যেমন পেয়েছেন ভা’লো’বা’সা ও সম্মান, তেমনই পেয়েছেন ভু’ল বোঝাবুঝি, অ’ব’হে’লা ও তি’ক্ত অভিজ্ঞতার স্বাদ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জীবনের নানা অনুচ্চারিত স্মৃতি উন্মোচন করেছেন সাংবাদিকতার ভু’য়ো খবর, না-পাওয়া সম্পর্ক, মহানায়ক উত্তম কুমারের ( Uttam Kumar) একটি ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক, এবং মৃণাল সেনকে ঘিরে তাঁর আ’ত্ম’ত্যা’গী ভূমিকার কথা।
এই সবকটি ঘটনার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে তাঁর ব্যক্তিগত সততা, নীতিবোধ এবং হৃদয়ের গ’ভী’র ক’ষ্ট।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় ক্ষো’ভ প্রকাশ করেন এক সাংবাদিককে ঘিরে ঘটে যাওয়া পুরানো একটি ঘটনার প্রসঙ্গে। তাঁর কথায়, এক ব্যক্তি তাঁর সম্পর্কে মি’থ্যে খবর ছেপে ছিলেন একটি সংবাদপত্রে। সেই ঘটনার পর কিছুদিনের মধ্যে ওই ব্যক্তি মা’রা’ত্ম’ক দুর্ঘটনার শি’কা’র হন। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় তখন তাঁকে দেখতে গেলে, ওই ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করে কা’ন্না’য় ভে’ঙে পড়েন। সাবিত্রী দেবী বলেন, “আমার হাত ধরে কি কান্না! ‘আমি ভুল করেছি সাবিত্রী, আমায় ক্ষ’মা করে দে।’ এই তো আমার জীবনে ঘটেছে।” সেখান থেকেই তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য “এখন তো জ্ব’ল’জ্যা’ন্ত লোকগুলো বেঁচে আছে, এত মি’থ্যে কথা বলো না।” এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান কোনো শিল্পীর সম্মান ভু’য়ো সংবাদের চটকদার শিরোনামের জন্য খেলনা হয়ে ওঠা উচিত নয়।
সাক্ষাৎকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত। কেন বিয়ে করেননি এই প্রশ্নের জবাবে তিনি অকপটে জানান – যাঁদের পছন্দ হত, দেখা যেত তাঁরা সকলেই বিবাহিত। তাঁর ভাষায় – “যখনই কাউকে ভালো লাগে, আচ্ছা ভা’লো’বা’স’ব বিয়ে করব, তখনই দেখি তাঁর ঘরে বউ আছে।” এবং এখানেই আসে তাঁর ক’ঠো’র নৈতিক অবস্থান – “তাঁর বউ আছে, কেন আমি তাঁকে বিয়ে করতে যাব? এটা তো এক ধরনের জেনেশুনে অ’ন্যা’য় করা।” তিনি অভিযোগের সুরে বলেন – “আর আগে বলে না এরা, পরে বলে।”এক পর্যায়ে প্রশ্ন করা হয়, তাহলে অবিবাহিত কাউকে কেন পছন্দ হয়নি? হাসতে হাসতেই উত্তর দেন – “না না সেরকম পেয়েছি, আমার পছন্দ হয়নি।”
এছাড়া তিনি জানান, ছোটবেলায় ঠাকুরদা–ঠাকুমা একটি পরিবারের সঙ্গে তাঁর বিয়ের কথা ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই প্রস্তাব তাঁর পছন্দ হয়নি, তিনি বলেন – “ছোটবেলায় ঠাকুরমা–ঠাকুরদা… সেই পরিবারের সঙ্গে আমার বিয়ে ছোটবেলায় ঠিক করে রেখেছিল… কিন্তু তাঁর মতো আমার পছন্দ হয়নি।” নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা এটাই তাঁর জীবনের মূল দর্শন বলে স্পষ্ট হয়।
সাক্ষাৎকারে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় শেয়ার করেন তাঁর জীবনের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় যেখানে জড়িয়ে ছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার (Uttam Kumar)।
শ্যামলীতে একটি শ্যুটিং চলাকালীন এক যুবক রোজ সেটে এসে প্রথম সারিতে বসে থাকতেন। যতক্ষণ সাবিত্রীর দৃশ্য চলত, ততক্ষণ তিনি নীরবে বসে থাকতেন। কিছুদিন পর সেই যুবকের পরিবার থেকে তাঁর বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব আসে। পরিবার ও ছেলেকে দেখে তাঁর বাবাও খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই ঘটনাটিতে অন্য মোড় নেয়।কিছু অজ্ঞাত সূত্রে উত্তম কুমার বিষয়টি জানতে পারেন এবং তিনি না করে দেন প্রস্তাবটিকে। সাবিত্রীর বক্তব্য – “তখন ওঁ (উত্তম কুমার) কী ভাবে জানিনা, ওঁ না বলে দিয়েছিল…” পরে তিনি জানতে পারেন উত্তম কুমার নাকি অন্য কারও মাধ্যমে সেই পরিবারকে খবর পাঠান যে – “উত্তম কুমারের সঙ্গে প্রে’মে’র বিয়ে হওয়ার কথা…”। এই খবরে পরিবার প্রস্তাবটি পিছিয়ে নেয়। সবচেয়ে বি’স্ম’য়’ক’র হলো পরবর্তীতে উত্তম কুমার নিজেই এই ঘটনা স্বীকার করেছিলেন। এই স্মৃতিতে তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় ক্ষো’ভ ও বে’দ’না’র মিশেল।
সাক্ষাৎকারের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ অংশে উঠে আসে কিংবদন্তি পরিচালক মৃণাল সেনকে (Mrinal Sen ) ঘিরে তাঁর শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং তি’ক্ত’তা।সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় জানান, মৃণাল সেনের ছবি স’মা’লো’চকে’র প্রশংসা পেলেও, ব্যবসায়িকভাবে সফল হত না। তিনি জানান যে সেই সময় পরিবেশকরা (Distributors) অনাগ্রহ দেখিয়েছিলেন মৃনাল সেনের ছবিতে।সেই সময় বড় বড় ডিস্ট্রিবিউটররা মৃণাল সেনের সাথে কাজ করতে চাইতেন না। সেই কারণে তখনকার ডিস্ট্রিবিউটররা তাঁর ছবি নিতে চাইতেন না। তাঁর ভাষায় – “মৃণালদার যে অবস্থা, মৃণালদাকে কেউ টাকা দিত না। ছবি দেখে লোকে প্রশংসা করত কিন্তু তাতে তো পেট ভরে না!”…“এমন একটা অবস্থা যে মৃণাল সেনের ছবি কোনো ডিস্ট্রিবিউটর নিতে চাইত না। বড় বড় ডিস্ট্রিবিউটররা বলত, ‘মৃণাল বাবু, আপনি ডিরেক্টর চেঞ্জ করুন, তাহলে নেব”।
এই অপমানজনক পরিস্থিতি দেখে সাবিত্রী দেবী নিজেই ছবি প্রযোজনা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি প্রযোজনা করেছিলেন ‘প্রতিনিধি’(Pratinidhi)(1964) নামের একটি ছবি—নিজের দিদির নামে, যিনি তাঁকে মানুষ করেছিলেন।
সাবিত্রী দেবী জানান – “এত কষ্ট হল যে ওরকম একটা ডিরেক্টর বসে থাকবে না খেয়ে? তখন আমি ‘প্রতিনিধি’ প্রডিউস করলাম”। তিনি আরও জানান সেই সিনেমার কোনো শিল্পীই তাঁর কাছ থেকে পারিশ্রমিক নেননি সবাই ছিলেন মৃণাল সেনের পাশে। “কোনো আর্টিস্ট আমার থেকে টাকা নেয়নি ওঁনাকে (মৃনাল সেন ) হেল্প করার জন্য।”
কিন্তু এরই মধ্যে সবচেয়ে বড় আ’ক্ষে’প সাহায্য করার পরও, কখনও তাঁকে আর নিজের ছবিতে নেননি মৃণাল সেন। সাবিত্রীর আ’ক্ষে’প’ভ’রা মন্তব্য – “তারপরে সে আমাকে তাঁর কোনো ছবিতে আর সুযোগ দেয়নি। এত বেইমান ! আমাকে নেয়নি।” এই কথায় ফুটে ওঠে সহযোগিতার বিনিময়ে অবহেলার তী’ব্র ক্ষ’ত’বো’ধ।
তাঁর কথায় স্পষ্ট তিনি কারও জীবনে অনুপ্রবেশ করতে চাননি, নীতিবোধের সাথে আপস করেননি, অন্যায়ের সঙ্গী হননি, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বহু কিছু হারিয়েছেন।
ভু’য়ো সংবাদ, সম্পর্কের আড়ালে গো’প’ন স্বা’র্থ, শিল্প জগতে অবমূল্যায়ন সবকিছুর মুখোমুখি হয়েও তিনি কখনও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি।
এই সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে সততা তাঁর চরিত্রের ভিত্তি, নৈতিকতা তাঁর জীবনের পথনির্দেশক এবং আত্মসম্মান তাঁর সর্বস্ব। ঠিক এই কারণেই তিনি আজও বাংলার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে এক অনন্য প্রেরণার নাম।