Sonalee Chaudhuri:প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত অভিনেত্রী সোনালী চোধুরী(Sonalee Chaudhuri)। ছোটপর্দা থেকে বড়পর্দা দুই মাধ্যমেই কাজ করেছেন তিনি। তবু আজও তাঁকে মূলত ছোটপর্দার অভিনেত্রী হিসেবেই চেনেন দর্শক। এই পরিচয়, এই যাত্রাপথ, আর না-পাওয়ার হিসেব সব মিলিয়ে কি কোথাও জমে রয়েছে আক্ষেপ? নাকি অভিজ্ঞতার ভারে সেই প্রশ্নগুলোই মুছে গেছে? নিজের অভিনয় জীবন নিয়ে অকপট সোনালী চোধুরীর কথাতেই মিলল সেই উত্তর।
এই মুহূর্তে দর্শক তাঁকে দেখছেন জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘ও মোর দরদিয়া’(O Mor Dorodiya)-তে। একটানা দীর্ঘ সময় ধরে টেলিভিশনে কাজ করলেও, সোনালির যাত্রা শুধুই ছোটপর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সিনেমাতেও তাঁকে দেখা গিয়েছে একাধিক চরিত্রে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে ‘ছোটপর্দার অভিনেত্রী’ তকমাটাই যেন বারবার ফিরে আসে। এই বিভাজন আদৌ মানেন না সোনালি। তাঁর মতে, মাধ্যম নয় আসল পরিচয় তৈরি হয় অভিনয়ের মধ্য দিয়েই।
অভিনেত্রী স্পষ্ট করে জানালেন, ছোটপর্দা নিয়ে তাঁর কোনও অসন্তোষ নেই। বরং এই মাধ্যমই তাঁকে শিল্পী হিসেবে সমৃদ্ধ করেছে। বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন, যা একজন অভিনেতার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সোনালির কথায়, একজন শিল্পী সবসময়ই নিজেকে ভেঙে নতুন ভাবে গড়ে তুলতে চান, আর সেই সুযোগ ছোটপর্দা তাঁকে দিয়েছে বারবার। তাই নিজের দীর্ঘ টেলিভিশন-জার্নি নিয়ে তাঁর মধ্যে কোনও দুঃখ বা আফসোস নেই।সোনালি বললেন, “আমি আমার ছোটপর্দা নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট। এক জন অভিনেতা সব সময়ে চান বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে। আমার কোনও আক্ষেপ নেই। ছোটপর্দা আমাকে ভরিয়ে দিয়েছে..।”
তবে এখানেই থেমে থাকেননি সোনালি। বাস্তবতা মেনে নিয়েই তিনি স্বীকার করেছেন, বড়পর্দায় আরও অনেক কাজ করা যেত। এমন কিছু চরিত্র বা ছবি ছিল, যেগুলো হয়তো তাঁর সঙ্গে হতে পারত, কিন্তু নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। সেই না-পাওয়ার জায়গাটা তিনি অস্বীকার করেন না।তাঁর কথায়, “হ্যাঁ, এটা ঠিক বড়পর্দাতেও হয়তো এমন অনেক কাজ করতে পারতাম। যেগুলো আমার সঙ্গে হয়নি, অনেক কিছু হতে পারত।” কিন্তু সেটাকেই আক্ষেপের নাম দিতে নারাজ অভিনেত্রী। তাঁর কাছে বিষয়টা সম্ভাবনার গল্প যা হতে পারত, কিন্তু হয়নি।
সময় যত এগিয়েছে, নিজের কেরিয়ারকে ততটাই আলাদা চোখে দেখতে শিখেছেন সোনালি। আজ আর তিনি নিজের অভিনয়জীবনকে টুকরো টুকরো করে বিচার করতে চান না। বরং পুরো যাত্রাটাকেই একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন। তিনি জানালেন, অভিনয়ে আসার শুরুতে তাঁর ভাবনাটা ছিল অনেকটাই আলাদা। তখন তাঁর মনে হয়েছিল, অসংখ্য কাজ করবেন, নিজেকে ছড়িয়ে দেবেন নানা জায়গায়। বাস্তবে সেই হিসেবটা পুরোপুরি মেলেনি এ কথা তিনি অকপটে মানেন।
সোনালি বললেন, “প্রথম দিকে ভেবেছিলাম অনেক অনেক কাজ করব। কিন্তু যতটা ভেবেছিলাম, ততটা হয়নি।” এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক শিল্পীর স্বপ্নভঙ্গের ইঙ্গিত। কিন্তু পরের কথাতেই সেই আক্ষেপ যেন গলে যায় বাস্তবতার আলোয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর উপলব্ধি বদলেছে। আজ পিছনে ফিরে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, এত বছর অভিনয়জগতে টিকে থাকাটাই ছিল একসময় অকল্পনীয়।
কারণটা একেবারেই স্পষ্ট। সোনালির পরিবারের কেউই বিনোদন জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কোনও গডফাদার, কোনও ব্যাকআপ কিছুই ছিল না তাঁর। সেই অবস্থায় ধারাবাহিক ভাবে কাজ পাওয়া, নিজের জায়গা ধরে রাখা এবং এত বছর ধরে দর্শকের সামনে থাকা এটাকেই তিনি সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করেন। তাঁর মতে, এই ধারাবাহিকতা নিজেই এক ধরনের প্রাপ্তি, যা অনেকেই পান না।
এই জায়গা থেকেই সোনালি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। তিনি জানালেন, টানা কাজ করতে পারছেন, সেটাই তাঁর কাছে আনন্দের। তাই কোনও না-পাওয়া, কোনও সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর মনে দুঃখ, অভিমান বা হতাশা নেই। বরং কৃতজ্ঞতা আছে কাজের প্রতি, দর্শকের প্রতি, আর সময়ের প্রতি।তাঁর কথায়, “আমার পরিবারের কেউই এই ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাই টানা কাজ করতে পারছি, এটাই তো আনন্দের কথা। তাই কোনও কিছু নিয়ে দুঃখ, অভিমান, আক্ষেপ নেই আমার।”
সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে সোনালি চোধুরীর নতুন ছবি ‘খাঁচা’(Khacha)। এই ছবির মাধ্যমে আবারও বড়পর্দায় দেখা গেল তাঁকে। যদিও তিনি নিজে বলছেন, আক্ষেপ না থাকলেও বড়পর্দায় যদি আরও কিছু ভালো কাজ করার সুযোগ পান, তা হলে তাঁর অভিনয়জীবন সম্পূর্ণ বলে মনে হবে। এই বক্তব্যেই ধরা পড়ে একজন অভিনেত্রীর চিরন্তন খিদে আরও ভালো কাজ করার, আরও গভীর চরিত্রে নিজেকে ছুঁয়ে দেখার।
সব মিলিয়ে সোনালি চোধুরী(Sonalee Chaudhuri)-র গল্পটা সাফল্য আর সীমাবদ্ধতার মাঝখানের এক বাস্তব চিত্র। এখানে নেই আকাশছোঁয়া দাবি, নেই হতাশার হাহাকার। আছে দীর্ঘ পথচলার শান্ত আত্মবিশ্বাস। ছোটপর্দা হোক বা বড়পর্দা নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে, নিজের কাজকে সম্মান জানিয়ে এগিয়ে চলাই তাঁর দর্শন। আর সেই জায়গা থেকেই সোনালি আজ বলতে পারেন না-পাওয়া থাকলেও, আক্ষেপ নেই।