Srabanti Chatterjee: টলিউডে নতুন বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিকর আক্রমণ ও বডি শেমিংয়ের জেরে এবার সরাসরি আইনি পথে হাঁটলেন টলিউড অভিনেত্রী শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়(Srabanti Chatterjee)। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ট্রো’লিং ও ব্যক্তিগত আ’ক্র’ম’ণে বিরক্ত হয়ে তিনি কলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইম শাখার দ্বারস্থ হয়েছেন। ইমেলের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই নিজের অভিযোগ দায়ের করেছেন অভিনেত্রী। আর এই অভিযোগের পরই মুখ খুলেছেন ইউটিউবার মানচু ওরফে নিহার বাগচী (Nihar Bagchi),যার একটি ভিডিও ঘিরেই বিতর্কের সূত্রপাত।
ঘটনার শুরু একটি ওয়েব সিরিজকে কেন্দ্র করে। পরিচালক অয়ন চক্রবর্তী(Ayan Chakrabarty )-র আসন্ন ওয়েব সিরিজ ‘ঠাকুমার ঝুলি’(Thakumar Jhuli)-তে একটি বিশেষ চরিত্রের জন্য শ্রাবন্তীকে প্রায় ১০ কেজি ওজন বাড়াতে হয়েছে বলে জানা যায়। অভিনয়ের প্রয়োজনে শরীরের এমন পরিবর্তন নতুন কিছু নয় বলিউড থেকে টলিউড, বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীই চরিত্রের স্বার্থে নিজেদের শারীরিক গঠন বদলেছেন। কিন্তু শ্রাবন্তীর ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনই হয়ে দাঁড়ায় কটাক্ষের কারণ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর সাম্প্রতিক ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই নেটিজেনদের একাংশ শুরু করেন কুরুচিকর মন্তব্য। কেবল তাঁর ওজন বৃদ্ধি নয়, ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক প্রসঙ্গ এমনকি চরিত্র নিয়েও আক্রমণ করা হয় বলে অভিযোগ। বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলে অভিনেত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “অনেকদিন ধরে এগুলো চলছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে উল্টোপাল্টা কথাবার্তা, অ’শ্লী’ল মন্তব্য করা হচ্ছে। বাকস্বাধীনতা আছে ঠিকই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে কেউ কুৎসা বা অশ্লীলতা ছড়াবে।”
শ্রাবন্তীর বক্তব্যে স্পষ্ট ক্ষো’ভ। তাঁর মতে, মানুষ নিজের হতাশা বা ফ্রাস্ট্রেশন মেটানোর জন্য বিনোদন জগতের মানুষদের ‘সফট টার্গেট’ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। তিনি বলেন, “আমি শুধু আমার জন্য নয়, সবার জন্যই লড়ছি। যারা নিয়মিত ট্রোলিংয়ের শিকার হন, তাদের প্রত্যেকের হয়ে এই প্রতিবাদ।” অভিনেত্রীর দাবি, যারা ওজন বৃদ্ধির আসল কারণ না জেনেই বডি শেমিং করছেন, তাঁদের এবার থামা প্রয়োজন।
এই ঘটনার মধ্যেই সামনে আসে ইউটিউবার মানচুর একটি ভিডিও। অভিযোগ, তাঁর ভিডিওতেই নাকি কিছু বিতর্কিত মন্তব্য তুলে ধরা হয়, যা শ্রাবন্তীকে অপমান করার শামিল। যদিও মানচু সরাসরি বডি শেমিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মানচুর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি টলিউডের একটি পেজ থেকে ভিডিওটি পান, যেখানে তাঁদের ট্যাগ করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, তাঁদের চ্যানেল মূলত রোস্টিং বা কমেডি ভিডিও করে, সেই সূত্রেই তিনি একটি ‘রিঅ্যাকশন ভিডিও’ বানান। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “শ্রাবন্তী দি আমার ক্রাশ, তাঁর বিরুদ্ধে বডি শেমিং করার কোনো প্রশ্নই আসে না।” তাঁর দাবি, অভিনেত্রী সম্পর্কে তাঁর মনে যথেষ্ট সম্মান রয়েছে।
তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভিডিওতে পড়া কিছু কমেন্ট। মানচু স্বীকার করেন, ভিডিওতে তিনি দুটি মন্তব্য পড়েছিলেন একটি ছিল ‘তামান্না কোণায় বসে কান্না করছে’, অন্যটি ‘স্টেজ ভেঙে যাবে’। এই মন্তব্যগুলোর পর তিনি হেসেছিলেন বলেও স্বীকার করেন। তবে তাঁর দাবি, সেগুলো তাঁর নিজের মন্তব্য নয়, তিনি কেবল অন্যের লেখা কমেন্ট পড়েছিলেন। ভিডিওর শেষে নাকি তিনি দর্শকদের অনুরোধও করেন, যেন কেউ শ্রাবন্তীকে নিয়ে উল্টোপাল্টা কথা না বলেন।
আইনি জটিলতা এড়াতে বা অভিনেত্রীর অস্বস্তির কথা ভেবে মানচু ভিডিওটি প্রাইভেট করে দিয়েছেন বলে জানান। তাঁর বক্তব্য, “আমি জানি না তিনি এখন কোন ভিডিও দেখে বা কী কারণে অভিযোগ করছেন।” একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, একজন মিডিয়া পারসন হিসেবে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ভিডিও করা তাঁর পেশাগত অধিকার। তাঁর কথায়, “আমি তো তাঁকে কোনো কুৎসিত মন্তব্য বা খিস্তি-গালাগাল দিইনি। ভিডিওতে ৩ মিলিয়ন ভিউ হয়েছে কারণ মানুষ আমাদের ভিডিও দেখেন।”
এদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে লালবাজার থানায় মানচুর নামে এফআইআর হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। মানচু সংবাদমাধ্যমের মারফত বিষয়টি জানতে পেরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “নিউজ মিডিয়া মারফত শুনলাম লালবাজার থানায় আমার নামে এফআইআর করা হয়েছে। এটা শুনে আমি খুব অবাক। কাল আমার একটা প্রোগ্রাম আছে, এখন জানি না কী হবে।”
পুরো ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে— সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ফান’, ‘রোস্টিং’ বা ‘কমেডি’-র সীমারেখা কোথায়? একজন পাবলিক ফিগারকে নিয়ে মন্তব্য করা কি সম্পূর্ণ স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে, নাকি তা কখনও কখনও মানহানি বা মানসিক হয়রানির পর্যায়ে পৌঁছে যায়?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কারও সম্মানহানি বা মানসিক ক্ষ’তি’র কারণ হলে এবং তা প্রমাণিত হলে সাইবার আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশ্লীল মন্তব্য বা মানহানিকর কনটেন্টের ক্ষেত্রে পুলিশ তদন্ত করতে পারে। শ্রাবন্তীর আইনজীবীর পরামর্শেই তিনি সাইবার ক্রাইম শাখায় অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে।
টলিপাড়ার অনেকেই অভিনেত্রীর এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, তারকারাও মানুষ তাঁদেরও ব্যক্তিগত সম্মান, পরিবার ও মানসিক সুস্থতার অধিকার রয়েছে। অভিনয়ের প্রয়োজনে শরীরের পরিবর্তন করলে তা নিয়ে বিদ্রূপ করা অত্যন্ত অনুচিত। একইসঙ্গে অনেকে মনে করছেন, রোস্টিং কালচারের নামে কখনও কখনও সীমা লঙ্ঘিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে মানচুর সমর্থকদের দাবি, তিনি সরাসরি কোনো অপমানজনক মন্তব্য করেননি; বরং সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডিং কনটেন্ট নিয়েই ভিডিও করেছিলেন। তাঁদের মতে, রিঅ্যাকশন ভিডিওতে কমেন্ট পড়া মানেই সেই মতকে সমর্থন করা নয়। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, আপত্তিকর মন্তব্য পড়ে হেসে ফেলা বা তা প্রচার করা কি পরোক্ষে সেই বিদ্রূপকে আরও ছড়িয়ে দেওয়া নয়?
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসলে দুটি বড় বিষয় বডি শেমিং এবং কনটেন্ট ক্রিয়েশনের দায়বদ্ধতা। শরীর নিয়ে ক’টা’ক্ষ যে মানসিকভাবে আঘাত করতে পারে, তা নতুন করে বলার নয়। বিশেষত নারী তারকাদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও বেশি লক্ষ্য করা যায়। ওজন, রঙ, পোশাক সবকিছু নিয়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচার চলে। শ্রাবন্তীর অভিযোগ সেই দীর্ঘদিনের সমস্যাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠছে ভিউ ও এনগেজমেন্টের দৌড়ে কোথাও কি সংবেদনশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে? ‘ফান পারপাস’-এর আড়ালে কখন যে তা ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত হয়, তা অনেক সময় বোঝা যায় না বা বোঝার চেষ্টাও করা হয় না।
এখন সাইবার ক্রাইম বিভাগের তদন্তেই পরিষ্কার হবে অভিযোগের ভিত্তি কতটা মজবুত এবং আইনি দিক থেকে কার অবস্থান কতটা শক্ত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা বা বলা প্রতিটি শব্দের দায় রয়েছে। পাবলিক প্ল্যাটফর্মে উচ্চারিত মন্তব্যের প্রভাব বহু দূর পর্যন্ত যেতে পারে।
শ্রাবন্তীর পদক্ষেপ হয়ত অন্যদেরও সাহস জোগাবে, যারা দীর্ঘদিন ধরে নীরবে ট্রোলিং বা বডি শেমিং সহ্য করছেন। একইসঙ্গে কনটেন্ট নির্মাতাদেরও ভাবতে বাধ্য করবে, ‘ভিউ’-এর চেয়ে বড় কি মানুষের সম্মান?
টলিউডের এই বিতর্ক আপাতত থামার লক্ষণ নেই। আইনি প্রক্রিয়া কী মোড় নেয়, মানচু ও শ্রাবন্তীর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয় সেদিকেই এখন নজর বিনোদন মহলের। তবে এই ঘটনাই নতুন করে আলোচনায় এনে দিল, ডিজিটাল যুগে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের ভারসাম্য রক্ষা করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।