Sudipa Basu:“গালাগালিই এখন ট্রেন্ড! অভিনয়ের চেয়ে রিলস গুরুত্বপূর্ণ..ফলোয়ার্স থাকলেই অডিশন! পাঁচটা খি’স্তি-ভা’য়ো’লে’ন্স দিলেই হিট!”- ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের চাঞ্চল্যকর দাবি সুদীপা বসুর

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
Instagram Group Join Now

Sudipa Basu: “অভিনেতার একটা অহংকার থাকা দরকার” কথাটা শুনতে প্রথমে অনেকেরই কানে লাগতে পারে। কিন্তু এই ‘অহংকার’ শব্দটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্পষ্ট করে দিলেন অভিনেত্রী সুদীপা বসু(Sudipa Basu) তিনি দম্ভ বা উদ্ধত আচরণের কথা বলছেন না, বরং একজন শিল্পীর আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিত্ব এবং সীমারেখার কথা তুলে ধরছেন। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে সঞ্চালিকার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় বর্তমান টলিউডের কাস্টিং, সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভরতা, অভিনয়ের মান, এমনকি বাংলা ছবির বিষয়বস্তুর পরিবর্তন নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন তিনি।

সুদীপা বসুর কথায়, শিল্পীর মধ্যে একটা ব্যক্তিত্ব থাকা জরুরি। তবে সেটি যেন ভুল পথে না যায়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “খুব ভুল অহংকার নয়। একজন মানুষ তোমার কাছে ছবি তুলতে বা অটোগ্রাফ নিতে এলো, আর তুমি তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে সেটা অহংকার নয়।” অর্থাৎ দর্শকের প্রতি অসম্মান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়া মানেই দায়িত্বও বাড়ে এমনটাই তাঁর মত।
দর্শক সম্মানের প্রসঙ্গে তিনি উদাহরণ টানেন বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খান(Shah Rukh Khan)-এর। তাঁর ভাষায়, “এই অহংকারটা কোনোদিন তুমি শাহরুখ খানকে করতে দেখবে না। জনতা জনার্দন, ওরা আছেন বলেই তো তুমি আছ।”
এই বক্তব্যে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছালেও দর্শকের প্রতি বিনয় হারানো উচিত নয়।

তবে একইসঙ্গে তিনি আরেকটি দিকও তুলে ধরেন। ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে যারা কাজ বা শিল্পকে গুরুত্ব দেয় না, তাদের ক্ষেত্রে নরম হওয়ার পক্ষপাতী নন তিনি। খানিক মজা, খানিক গুরুত্বের সুরে বলেন, “অসম্মানের লোক কিছু কম নেই ইন্ডাস্ট্রিতে। তাদের অসম্মানটা করো দরকার পড়লে। সেখানে হেসিটেট করো না।” এই বক্তব্যে স্পষ্ট ব্যক্তিত্ব বজায় রাখা এবং নিজেকে ছোট হতে না দেওয়া, সেটাই তাঁর কাছে প্রকৃত ‘অহংকার’।

আরও পড়ুন:Tanuka Chatterjee: “আমি ইন্ডাস্ট্রির থেকে কিছুই কি ‘ডিজার্ভ’ করি না? আমার নিজের কোনও গল্প নেই, আমি যেন অন্যের গল্পের অংশ” – ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে প্রশ্ন তুলে আক্ষেপ তনুকার

আলোচনার এক পর্যায়ে উঠে আসে বর্তমান সময়ের বড় প্রশ্ন অভিনয় জানলেই কি এখন টিকে থাকা যায়? নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার ফলোয়ার্স সংখ্যাই হয়ে উঠেছে মূল মাপকাঠি?
সুদীপা বসু সরাসরি স্বীকার করেন, সোশ্যাল মিডিয়া এখন কাস্টিং প্রক্রিয়ার বড় ফ্যাক্টর। “সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলোয়ার্স বেশি থাকলে অডিশনের ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়” এই মন্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় ডিজিটাল উপস্থিতির গুরুত্ব কতটা বেড়েছে। অর্থাৎ প্রতিভা থাকলেও যদি অনলাইনে দৃশ্যমানতা কম থাকে, তাহলে সুযোগ পাওয়ার পথ কঠিন হয়ে উঠছে এমন আশঙ্কাও উসকে দেন তিনি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত অংশ ছিল অভিনয়ের মান নিয়ে তাঁর মন্তব্য। সুদীপা বসুর মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত সক্রিয়তা শিল্পীদের মনোযোগ বিচ্যুত করছে।

তিনি বলেন, “মানুষ এখন অভিনয় নিয়ে যতটা না ভাবছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত রিলস বানানো নিয়ে। ফলে একটা ডাইভারশন তৈরি হচ্ছে।”
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কন্টেন্ট তৈরির ব্যস্ততায় মূল শিল্পচর্চার সময় ও মনোযোগ দুটোই কমে যাচ্ছে। অভিনয় শেখা, স্ক্রিপ্ট পড়া বা চরিত্র নিয়ে গভীর ভাবনার জায়গায় জায়গা করে নিচ্ছে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা।
তবে তিনি এটাও বিশ্বাস করেন যে সত্যিকারের অসাধারণ প্রতিভা থাকলে সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলেও কাজ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বর্তমান ট্রেন্ডে প্রচারের আলো অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এমন ধারণাও ব্যক্ত করেন তিনি।

আরও পড়ুন:Hiraan-Chiranjeet:”…মানুষের অনুভূতি নিয়ে খেলা…”, “না খেলাম, না আঁচালাম..হিরণ বিয়ে করেছে তো আমার কী?…”- হিরণের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে টলিপাড়ার হইচইয়ে ‘ডোন্ট কেয়ার’ চিরঞ্জিত

এখানেই প্রশ্ন প্রতিভা কি সত্যিই পিছিয়ে পড়ছে, নাকি সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতেই বদল আনতে হচ্ছে?
সাক্ষাৎকারে নতুন প্রজন্মের দ্রুত সাফল্য নিয়ে খানিক আক্ষেপও শোনা যায় তাঁর গলায়। তিনি বলেন, “তুমি কিচ্ছু না জেনে যদি আড়াই-তিন বছর কাজ করে একটা ফ্ল্যাট আর গাড়ি করতে পারো, তুমি শিখবে কোন দুঃখে?” এই মন্তব্যে স্পষ্ট সহজ সাফল্য মানুষকে শেখার আগ্রহ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে বলেই তাঁর মনে হয়।

সঞ্চালক যখন বলেন, এতে শেখার তাগিদ কমে যাচ্ছে, সুদীপা সম্মতি জানিয়ে বলেন, “তুমি শিখবে কেন? তোমার কি শেখার প্রয়োজন পড়ছে? যে জিনিসগুলোর প্রয়োজন আছে বরং সেটা করো সেটাই করছে লোকজন।”

নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনাও টানেন তিনি। সুদীপা জানান, ইন্ডাস্ট্রিতে ২২ বছর কাটানোর পর তিনি একটি সেকেন্ড হ্যান্ড স্যান্ট্রো(Hyundai Santro) কিনতে পেরেছিলেন।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে তাঁর কোনো লজ্জা নেই। বরং ধীরে ধীরে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগোনোতেই তিনি বিশ্বাসী।

আরও পড়ুন:Debolinaa-Sukanta: দেবলীনার কামব্যাকেই ট্রোল,নে’গে’টি’ভি’টি আর ক’টা’ক্ষে’র বড় জবাব সুকান্ত-অনন্যার

তিনি আরও যোগ করেন, “আজ খুব ভালো একটা বিএমডাবলু (BMW) নিয়ে ঢুকলাম, দু’দিন পর দেখলাম রিকশা করে ঢুকছি, আমার দরকার নেই।” এখানে তিনি বোঝাতে চান, লোকদেখানো সাফল্যের চেয়ে স্থিতিশীলতা এবং আত্মসম্মান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আলোচনার আরেকটি বি’স্ফো’র’ক অংশ ছিল বাংলা সিনেমার বর্তমান ট্রেন্ড নিয়ে তাঁর মন্তব্য। সুদীপা বসুর মতে, এখন গালিগালাজ আর হিংসা যেন বক্স অফিসের ‘ফর্মুলা’।
তাঁর কথায়, “গালাগালিটা এখন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঁচটা খি’স্তি আর আট-নটা ভায়োলেন্স(violence) সিন দিলে ছবি হিট করবেই।” এই বক্তব্যে টলিউডের বর্তমান ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

সিনেমায় অশ্লীল ভাষার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের প্রস্তাবও দেন তিনি। তবে সঙ্গে সঙ্গে সংশয় প্রকাশ করেন, “আমরা যদি সবাই মিলে ঠিক করি অশ্লীল ভাষা থাকলে ছবি বয়কট করব, তাহলে বদল সম্ভব। কিন্তু তেমন কজনকে পাশে পাব?” অর্থাৎ, বাণিজ্যিক চাপে রুচিশীলতার পক্ষে দাঁড়ানো সহজ নয় বলেই মনে করছেন তিনি।
সিনেমায় ভাষার পরিবর্তনের পেছনে সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতাকেও দায়ী করেছেন সুদীপা বসু। তাঁর মতে, সিনেমা সমাজেরই প্রতিফলন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “রাস্তাঘাটে লোকে কী ভাষায় কথা বলে সেটা কি শোনোনি? এখনকার ছেলেমেয়েরা কি রবীন্দ্রিক ভাষায় কথা বলবে?”

অর্থাৎ বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাষা ব্যবহার করলে সেটিও কৃত্রিম হয়ে যাবে এই ইঙ্গিতও রয়েছে তাঁর কথায়।
সুদীপা বসুর বক্তব্যে একদিকে যেমন সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভরতার সমালোচনা আছে, অন্যদিকে বাস্তবতার স্বীকৃতিও রয়েছে। তিনি যেমন শেখার গুরুত্ব, আত্মসম্মান এবং ধৈর্যের কথা বলেছেন, তেমনই স্বীকার করেছেন সময়ের পরিবর্তন অস্বীকার করা যায় না।
অভিনয়ের চেয়ে কি সত্যিই এখন রিলস গুরুত্বপূর্ণ? নাকি এটি সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার নতুন মাধ্যম? পাঁচটা খি’স্তি আর কয়েকটি ভায়োলেন্স সিন কি সত্যিই ছবির সাফল্যের গ্যারান্টি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সময়ই দেবে। তবে একথা নিশ্চিত সুদীপা বসুর মন্তব্য টলিউডের অন্দরে চলা অস্বস্তিকর বাস্তবকে সামনে এনে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্যে যেমন বি’ত’র্ক আছে, তেমনই রয়েছে আত্মসমালোচনার আহ্বান।
বাংলা বিনোদন জগত এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে প্রতিভা, প্রচার, বাজার আর বাস্তবতার মধ্যে চলেছে টানাপোড়েন। সেই দ্বৈরথের কথাই যেন স্পষ্ট করে দিলেন সুদীপা বসু।

Leave a Comment