Swarna Kamal Dutta:নব্বইয়ের দশকে বাংলা টেলিভিশনের পর্দায় যাঁর উপস্থিতি মানেই আলাদা এক আভিজাত্য, সেই স্বর্ণকমল দত্ত(Swarna Kamal Dutta) আজও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত। তবু আলোর রোশনাইয়ের আড়ালে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে জমে উঠেছে একাকিত্ব, হতাশা আর না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী অভিনেত্রী হলেও, দিনের শেষে একা ঘরে ফিরলেই মনখারাপ তাঁকে গ্রাস করে, এমনটাই অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি।
ছোটপর্দার দর্শকদের কাছে স্বর্ণকমল দত্ত(Swarna Kamal Dutta) ছিলেন এক সময়ের একচেটিয়া নায়িকা। সৌন্দর্য, অভিনয় দক্ষতা আর পরিমিত অভিব্যক্তিতে খুব অল্প সময়েই জায়গা করে নিয়েছিলেন বাংলা বিনোদন দুনিয়ার প্রথম সারিতে। টেলিভিশনের পাশাপাশি মঞ্চেও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল। সেই সময় দাঁড়িয়ে জীবনের কাছ থেকে তাঁর প্রত্যাশা ছিল খুব সাধারণ, একটি সুখী সংসার, শান্ত গৃহকোণ আর কাজের বাইরে নিশ্চিন্ত জীবনের স্বপ্ন।
কিন্তু বাস্তব জীবন যে চিত্রনাট্যের মতো নয়, তা তিনি বুঝেছেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। সম্প্রতি এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বর্ণকমল স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অভিনয়ের ডাক পেয়েও তিনি নিজের কেরিয়ারের অনেক সুযোগ ছেড়ে দিয়েছিলেন শুধুমাত্র সংসারের জন্য। তাঁর কথায়, তখন বড় ও ছোট, সব ধরনের পর্দা থেকেই নিয়মিত কাজের প্রস্তাব আসত। তবু তিনি ভেবেছিলেন, সংসারকে সময় দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাঁর কথায়, “তখন ছোট-বড় সব পর্দা থেকেই একের পর এক ডাক পাচ্ছি। সে সব ছেড়েছিলাম মন দিয়ে সংসার করব বলে। আমার তরফ থেকে চেষ্টা কম ছিল না। কিন্তু সংসার করা আমার আর হল না। বিচ্ছেদ নাহলেও স্বামীর সঙ্গে থাকি না।” সম্পর্কের ভাঙন তাঁকে ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে। এক সময় যিনি নায়িকা হিসেবে পর্দা শাসন করতেন, আজ তিনি নিজেই বলেন, না পাওয়ার কষ্ট বুকে নিয়েই তাঁকে পার্শ্বচরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়েছে। তাঁর কথায়, “পুরানো দিনগুলো মনে পড়লে খুব কষ্ট হয়। ভিতরে ভিতরে একা হয়ে যাই।”
অতীতের সাফল্য আর বর্তমান বাস্তবতার ফারাক তাঁকে ভিতরে ভিতরে আরও একা করে তোলে। তবু এই কঠিন সময়েও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা একমাত্র মেয়ে। স্বর্ণকমলের ভাষায়, মেয়ের হাত ধরেই তিনি আজও বেঁচে থাকার শক্তি পান। মেয়েই তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বলেন, “…যদিও সারাক্ষণ মেয়ে আমায় আগলে রাখে। ওর জন্যই আমি বেঁচে আছি।”
বর্তমানে স্বর্ণকমল দত্তকে দেখা যাচ্ছে স্টার জলসার নতুন ধারাবাহিক ‘শুধু তোমারই জন্য’-এ। কাজের ব্যস্ততা থাকলেও মানসিক শূন্যতা তাঁকে তাড়া করে ফেরে। বিষণ্ণতা, একাকিত্ব আর মানুষের উপর বিশ্বাস হারানোর যন্ত্রণা, সব মিলিয়ে জীবন যেন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে আটকে আছে। তাঁর কথায়, চারপাশে মানুষ থাকলেও দিনের শেষে তিনি একাই।
এই একাকিত্বের ভাবনা থেকেই আসে ভবিষ্যতের ভয়। অভিনেত্রী অকপটে স্বীকার করেছেন, মেয়ে বড় হয়ে গেলে তার নিজের আলাদা জগৎ তৈরি হবে, বন্ধু, কাজ, স্বপ্ন। তখন তিনি নিজে কাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচবেন, সেই প্রশ্নই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়।
ইদানীং মেয়েকে নিয়েও দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে স্বর্ণকমলের। ‘একা মা’ হিসেবে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি সবসময় সতর্ক। তাঁর মতে, পৃথিবী এখন আগের মতো নিরাপদ নয়। মানুষের সঙ্গে সম্পর্কেও তিনি আজ ভীষণ সাবধানী। অভিনেত্রীর বক্তব্য, স্বার্থ ছাড়া কেউ আজ আর কারও কাছে আসে না, এই বিশ্বাসই তাঁর মনে গেঁথে গেছে।
এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে তাঁর সেই বহুল আলোচিত মন্তব্য, মেয়ে তাঁর থেকেও বেশি সুন্দরী। স্বর্ণকমলের কথায়, তিনি নিজে যতটা জানেন পৃথিবীর অন্ধকার দিকগুলো সম্পর্কে, তার থেকেও বেশি কেউ জানে না। তাই মেয়ের সৌন্দর্যই তাঁর কাছে আশীর্বাদ নয়, বরং একরাশ ভয়। প্রতি মুহূর্তে মেয়েকে নিয়ে চিন্তায় থাকেন তিনি। কোন পথে হাঁটছে, কার সঙ্গে মিশছে, সব কিছুতেই অতি সতর্ক এই মা। তাঁর কথায়,”দুনিয়া যে কী খারাপ, আমার থেকে ভালো আর কে জানে! স্বার্থ ছাড়া কেউ কাছে ঘেঁষে না।” আমার মেয়ে আরও সুন্দরী। প্রতি পদে ওকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগি।”
এই কারণেই অভিনয়জগতে মেয়েকে আনতে নারাজ স্বর্ণকমল দত্ত। শুধু তাঁর ইচ্ছা নয়, মেয়েরও অভিনয়ে আসার কোনও আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। পড়াশোনার প্রতি মেয়ের ঝোঁক বেশি, সেটাকেই তিনি উৎসাহ দেন। মায়ের মতে, এই ইন্ডাস্ট্রিতে নিরাপত্তা আর স্থায়িত্ব, দুটোরই অভাব।
একাই হাতে সন্তান বড় করা যে কতটা কঠিন, তা স্বর্ণকমল ভালো করেই জানেন। তবে তিনি একা নন, এই লড়াইয়ে তাঁর পাশে রয়েছেন পরিবার। অভিনেত্রী জানান, বাবা ও ভাই সবসময় তাঁর পাশে থেকেছেন। আর্থিক হোক বা সাংসারিক সমস্যা, যে কোনও সংকটে তাঁদের সাহায্য না পেলে মেয়েকে এইভাবে বড় করে তোলা সম্ভব হত না। তিনি বলেন,“এ ব্যাপারে বাবা আর ভাই আমার সহায়। ওঁরা সারাক্ষণ আগলে রাখেন। আর্থিক, সাংসারিক যেকোনও সমস্যায় ওঁরাই আমার পাশে। নইলে মেয়েকে বড় করে তুলতে পারতাম না…।”
স্বর্ণকমলের আক্ষেপ, বিনোদনজগতে কাজ করলেও শিল্পীদের জন্য কোনও স্থায়ী আর্থিক নিরাপত্তা নেই। তিনি বলেন,”..আমাদের বিনোদন দুনিয়ায় কোনও আর্থিক নিরাপত্তা নেই।” আজ কাজ আছে, কাল নেই, এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই জীবন কাটাতে হয়। সেই বাস্তবতাই তাঁকে আরও বেশি বাস্তববাদী করে তুলেছে।
চমকপ্রদ কেরিয়ার, আলো ঝলমলে অতীত আর বর্তমানের নীরব লড়াই, সব মিলিয়ে স্বর্ণকমল দত্তের জীবন যেন এক অসম্পূর্ণ গল্প। যেখানে সাফল্যের শিখর ছোঁয়ার পরও রয়ে গেছে অপূর্ণতা, একাকিত্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর ভয়। তবু মেয়ের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়াই তাঁর একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র শক্তি।