Swastika Mukherjee:বিয়েবাড়ির সাজ মানেই ঝলমলে গয়না, ভারী মেকআপ আর দামি পোশাক এই চেনা ধারণাকে আবারও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়(Swastika Mukherjee)। বোলপুরে এক বন্ধুর বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে, শুধুমাত্র নিজের সাজেই নয়, নিজের ভাবনাতেও তৈরি করলেন আলোড়ন। নীল তসরের শাড়ি, কপালে বড় লাল টিপ, আর চুলে রাস্তার ধার থেকে পাড়া নাম না-জানা বুনো ফুল এই অনাড়ম্বর সাজের আড়ালেই উঠে এল মৃ’ত্যু চিন্তা, স্মৃতি, নস্টালজিয়া আর মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা। সমাজমাধ্যমে অভিনেত্রীর একটি পোস্ট ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন করে আলোচনা।
স্বস্তিকা বরাবরই সাজগোজের ক্ষেত্রে গতানুগতিকতার বাইরে হাঁটতে ভালোবাসেন। কখনও লাল গালিচার অনুষ্ঠানে সাবেকি শাড়ি, কখনও আবার একেবারে সাধারণ সাজে নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি। তবে এবারের বিয়েবাড়ির লুক যেন শুধু ফ্যাশন স্টেটমেন্ট নয়, একেবারে ব্যক্তিগত অনুভূতির দলিল। বিলাসিতা বা আড়ম্বর নয়, বরং অতীতের স্মৃতি আর জীবনের দর্শনকে সঙ্গী করেই বোলপুরের বিয়েবাড়িতে পা রেখেছিলেন অভিনেত্রী।
এই সাজের সবচেয়ে চোখে পড়া অনুষঙ্গ ছিল তাঁর চুলে গোঁজা বুনো ফুল। বিয়েবাড়িতে যাওয়ার আগে পছন্দমতো ফুল খুঁজে না পেয়ে, বোলপুরের রাস্তাতেই থামিয়েছিলেন টোটো। আমলি থেকে যাওয়ার পথে দেওয়াল বেয়ে ঝুলে থাকা সূর্যের মতো রঙিন থোকা থোকা ফুল তাঁর নজর কাড়ে। বন্ধুদের সঙ্গে সেখান থেকেই ফুল পেড়ে নিয়ে, ব্যাগে থাকা সাধারণ হেয়ার পিন দিয়েই চুলে গুঁজে নেন তিনি। স্বস্তিকার কথায়, সেই ফুল আদিবাসী মেয়েদের ব্যবহৃত ফুলের মতো পলাশের রঙ হলেও আসলে পলাশ নয়। অভিনেত্রীর কথায়, ‘আদিবাসী মেয়েরা একরকম ফুল মাথায় দেয়।” নাম না জানা সেই বুনো ফুলই পূর্ণতা দেয় তাঁর বিয়েবাড়ির সাজে। অভিনব এই ভাবনাই ফের একবার প্রমাণ করে দেয়, সৌন্দর্য মানেই দামি অলংকার নয়, অনেক সময় তা লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির সহজ ছোঁয়ায়।
তবে শুধু ফুল নয়, তাঁর পরনের শাড়িটিও বহন করছে এক গভীর গল্প। নীল রঙের তসর শাড়িটির বয়স প্রায় ২৭ বছর যা স্বস্তিকার নিজের মেয়ের বয়সের থেকেও বেশি। বহু বছর আগে পার্কস্ট্রিটের একটি দোকান থেকে তাঁর মা এই শাড়িটি কিনে দিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও, এই শাড়িটি যত্ন করে আগলে রেখেছেন অভিনেত্রী। তাঁর মতে, যত্ন নিলে সবকিছুই টিকে থাকে সে শাড়িই হোক বা জীবন। এই কথার মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁর জীবন-দর্শন।অভিনেত্রীর কথায়, “যত্ন করে রাখতে পারলে আর যত্ন করে রাখতে দিলে সব থাকে, শাড়ি হোক বা জীবন”।
এই শাড়ি পরেই যেন তিনি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর মাকে। মায়ের মতো করেই ঘাড়ের কাছে আলতো করে খোঁপা বাঁধা, আঁচল টেনে কাঁধে রাখা সবটাই যেন এক নিঃশব্দ শ্রদ্ধা। স্বস্তিকা নিজেই অকপটে স্বীকার করেছেন, মায়ের মতো হতে পারাই তাঁর কাছে এক বড় প্রাপ্তি। সাবেকি গয়না আর পুরানো শাড়ির মধ্যেই তিনি অনুভব করেছেন মায়ের উপস্থিতি। এই সাজ তাই শুধুই বাহ্যিক নয়, একেবারে আত্মিক।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে স্বস্তিকার সেই মন্তব্য, যেখানে তিনি নিজের মৃ’ত্যু’র পরের ইচ্ছের কথা প্রকাশ করেছেন। সমাজমাধ্যমে লেখা এক পোস্টে অভিনেত্রী জানিয়েছেন, তাঁর মৃ’ত্যু’র পর যেন কোনও আড়ম্বর না হয়। ফুল দিয়েই যেন তাঁকে বিদায় জানানো হয়।তাঁর কথায়, ফুল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী, তাঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তিনি লেখেন, “বাড়ির সবাই কে বলে রেখেছি, আমি মরে গেলে আর কিছু হোক না হোক, ফুল দিয়ে যেন চাপা দিয়ে আমায় বিদায় করে। ওরা আমার নিত্য দিনের সঙ্গী। আমার সঙ্গে ওদের নিবিড় সম্পর্ক।”এই বক্তব্য অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর, আবার কারও কাছে তা গভীর দার্শনিক। বিয়েবাড়ির আনন্দঘন মুহূর্তে মৃ’ত্যু’র প্রসঙ্গ টেনে আনা কেন এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নেটদুনিয়ায়।
তবে স্বস্তিকার অনুরাগীরা বলছেন, এটাই তাঁর স্বভাব। জীবন আর মৃ’ত্যু’কে একই সরলতায় দেখতেই তিনি অভ্যস্ত। ফুলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা নতুন নয়। প্রকৃতি, গাছ, ফুল সবকিছুর সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক নিবিড়। তাই মৃ’ত্যু’র পরেও সেই ফুলকেই সঙ্গী করে বিদায় নিতে চাওয়ার ইচ্ছের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু দেখছেন না অনেকেই। বরং এটাকে জীবনের প্রতি তাঁর গভীর উপলব্ধিরই প্রতিফলন বলেই মনে করছেন তাঁরা।
বোলপুরের লাল মাটির পথ, রাস্তার ধারের বুনো ফুল আর মায়ের স্মৃতিবাহী পুরানো শাড়িতে মোড়া স্বস্তিকার এই উপস্থিতি যেন মনে করিয়ে দেয়, আভিজাত্য আসলে কোথায়। দামি ব্র্যান্ড, ঝলমলে সাজ নয় বরং স্মৃতি, যত্ন আর মায়ার বন্ধনেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত সৌন্দর্য। একদিকে বিয়েবাড়ির আনন্দ, অন্যদিকে জীবনের শেষ অধ্যায়ের কথা এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় আবারও প্রমাণ করলেন, তিনি শুধু অভিনেত্রী নন, নিজের ভাবনাতেও আলাদা, স্পষ্ট এবং সাহসী।