Sayak-Maitreyee:সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় অভিনেতা ও ইনফ্লুয়েন্সার সায়ক(Sayak Chakraborty)-এর একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে উত্তাল নেটদুনিয়া। একটি আপাত ব্যক্তিগত ঘটনার ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে, যার জেরে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক, সমালোচনা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঢেউ। ঘটনার জল যত গড়াতে থাকে, ততই সেই বিতর্ক ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক, ধর্মীয় এমনকি রাজনৈতিক রঙ নিতে শুরু করে। ঠিক এই আবহেই রবিবার ফেসবুক লাইভে এসে মুখ খুললেন সায়কের দীর্ঘদিনের সহ-শিল্পী ও টলিউডের পরিচিত মুখ অভিনেত্রী মৈত্রেয়ী মিত্র(Maitreyee Mitra)। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল সায়কের ভুলের অকপট সমালোচনা, তেমনই ছিল এই ঘটনাকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে কড়া বার্তা।
লাইভে মৈত্রেয়ী মিত্র(Maitreyee Mitra) স্পষ্ট করে জানান, সায়ককে তিনি আজ বা কাল নয়, প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চেনেন। ২০১৪-১৫ সাল থেকে একসঙ্গে কাজ করার সূত্রে সহকর্মী হিসেবে সায়ককে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ব্যক্তিগতভাবে সায়ক একজন ‘ভালো ছেলে’ এবং সহ-শিল্পী হিসেবেও বরাবরই দায়িত্বশীল। কিন্তু সেই সঙ্গেই অভিনেত্রী এটাও পরিষ্কার করে দেন যে সাম্প্রতিক ভাইরাল ভিডিওতে সায়ক যে ভুল করেছেন, তা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। মৈত্রেয়ীর সোজাসাপটা বক্তব্য, “ভুল করলে বড়রা সেটা শেখাবে, বলবে। সায়ক ভুল করেছে, এটা নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। আমিও তার প্রতিবাদ জানিয়েছি।”
এই প্রসঙ্গে তিনি জানান, ঘটনার পরপরই নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে তিনি একাধিক পোস্ট করেছেন। মোট চারটি পোস্টে তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বলেও জানান অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, অন্ধ সমর্থনের পথে না হেঁটে তিনি বরং দায়িত্বশীলভাবে ভুলকে ভুল বলার পক্ষপাতী। তবে সেই ভুলের বিচার যেন সীমা না ছাড়ায়, সেটাই তাঁর মূল উদ্বেগ।
মৈত্রেয়ী মিত্রের মতে, খুব অল্প বয়সে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার ফলেই হয়তো সায়ক আবেগের বশে এই কাজ করে ফেলেছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এর পিছনে কোনও সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বা গভীর উদ্দেশ্য ছিল না।
অভিনেত্রীর মতে, বয়সের অপরিপক্কতা এবং জনপ্রিয়তার চাপ থেকেই এই ‘বাড়াবাড়ি’ হয়েছে।
তবে লাইভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল অংশ ছিল সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে তাঁর কড়া অবস্থান। মৈত্রেয়ী মিত্র ক্ষো’ভে’র সঙ্গে বলেন, সায়ক চক্রবর্তীর একটি ব্যক্তিগত ভুলকে কেন্দ্র করে একদল মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে হিন্দু-মুসলিম বা ধর্মীয় বিভাজনের রং চড়ানোর চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আসন্ন নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক স্বার্থে এই ঘটনাকে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে, যা সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষ’তি’ক’র।
লাইভে সরাসরি বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “যারা জোর করে এটাকে হিন্দু-মুসলিমের রং চড়ানোর চেষ্টা করছেন, দোহাই আপনাদের, এই কাজ করবেন না।” তাঁর কণ্ঠে ছিল স্পষ্ট হতাশা ও ক্ষো’ভ। অভিনেত্রীর মতে, ভুলের সমালোচনা করা এক বিষয়, কিন্তু সেই ভুলকে হাতিয়ার করে সমাজে বিভেদ তৈরি করা সম্পূর্ণ অন্যায়।
আরও পড়ুন:Olypub:সায়কের ভিডিও ঘিরে বি’স্ফো’র’ক অ’ভি’যো’গ শতরূপ ঘোষের
মৈত্রেয়ী মিত্র(Maitreyee Mitra) এই প্রথম কোনো সামাজিক ইস্যুতে সরব হলেন, এমন নয়। এর আগেও কেকেআর-এর বিতর্ক, অভয়া কাণ্ড বা কসবার ঘটনার সময় তাঁকে প্রকাশ্যে মতামত রাখতে দেখা গেছে। তাই সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই তিনি আবারও মনে করিয়ে দেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ যেমন জরুরি, তেমনই সেই প্রতিবাদ যেন কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বা দাঙ্গার দিকে না গড়ায়, সেটাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই লাইভের পাশাপাশি সাম্প্রতিক অস্থির পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি আরও একটি ভিডিও বার্তায় শান্তির কড়া বার্তা দেন। সেখানে তিনি দেশের এবং শহরের শান্তি বিঘ্নিত করার যে কোনো প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, এই ধরনের উসকানি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্যই সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।
ভিডিও বার্তায় শান্তির আহ্বান জানান মৈত্রেয়ী মিত্র। সেখানে তিনি দেশের শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করা মানুষদের সরাসরি সমালোচনা করেন। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “যদি দেশের মধ্যে বা শহরের মধ্যে দাঙ্গা বাঁধে, ল’ড়া’ই চলে, তাহলে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ দৈনিক উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। কাজ বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের জীবন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “আমরা দিন আনি দিন খাই। কাজ বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের চলবে না।”
আরও পড়ুন:Hiraan Chatterjee:“ডিভোর্স হোক, তারপর নাচতে নাচতে বিয়ে করুক”— নীরবতা ভেঙে কী বললেন হিরণ?
রেস্টুরেন্টের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, ভুল মানুষ মাত্রই হতে পারে। তাঁর মতে, একটি সাধারণ ভুলকে কেন্দ্র করে থানা-পুলিশ বা আইনি পদক্ষেপ নিয়ে এত মাতামাতি করার প্রয়োজন ছিল না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যখন একজন মানুষ প্রকাশ্যে ক্ষ’মা চেয়েছে, তখন তাকে ক্ষ’মা করার মানসিকতা দেখানো কি খুব কঠিন ছিল?তাঁর কথায়,“একটা মানুষ ক্ষ’মা চেয়েছে, সেখানে তাকে ক্ষ’মা করা উচিত ছিল। ভুল মানুষ মাত্রই হয়।” এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি সরাসরি আক্রমণ করেন সেই সব মানুষদের, যারা সামান্য ঘটনাকে হিন্দু-মুসলিম বিতর্কে পরিণত করে রাজনৈতিক বা সামাজিক ফায়দা লুটতে চায়। তাঁদের তিনি “জীবনের আপদ” বলে চিহ্নিত করেন এবং স্পষ্ট জানান, ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে এই ধরনের মানসিকতার মানুষের কোনো জায়গা নেই।
ভারতকে একটি শান্তিপূর্ণ এবং সনাতন ধর্মের দেশ হিসেবে উল্লেখ করে মৈত্রেয়ী মিত্র ক্ষো’ভ প্রকাশ করেন যে, কিছু মানুষ জেনে শুনে সেই শান্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। রেস্টুরেন্টের ঘটনাটি একটি নিছক দুর্ঘটনাও হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর যুক্তি, “যদি তাদের উদ্দেশ্য খারাপ হতো, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য প্লেট পরিবেশন করত না।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পরিস্থিতিকে একটু বাস্তব ও যুক্তির আলোকে দেখার অনুরোধ জানান।
অন্যদিকে, নিজের ফেসবুক লাইভে অভিনেত্রী সায়কের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও কিছু উপদেশ দেন। ভালোবাসা রেখেই তিনি বলেন, জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত বা পরিস্থিতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরা সবসময় উচিত নয়। তাঁর কথায়, “জীবনের সমস্ত কটা পরিস্থিতিকে পাবলিকলি তুলে ধরিস না।” ডিজিটাল দুনিয়ায় কাজ করতে গেলে কোথায় সীমারেখা টানতে হয়, সেটাও বোঝা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
সায়কের কিছু সাম্প্রতিক পোস্টের ভাষা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এই ধরনের ভাষা অনেক সময় মানুষকে উস্কে দেয় এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আগের দিনের সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা টেনে তিনি বলেন, আগে ভুল করলে বড়রা বকুনি দিত, শেখাত। এখন চেনা-অচেনা সবাই মিলে আক্রমণ করে। সমালোচনার ক্ষেত্রেও শালীনতা এবং একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকা প্রয়োজন বলেই তাঁর মত।
বক্তব্যের শেষে তিনি প্রবাদ বাক্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।” সায়কের বিতর্কিত পোস্টগুলো ডিলিট হওয়াকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখেন। আগামী দিনে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি সায়ককে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন কাটানোর শুভকামনাও জানান।