Tota Roy Chowdhury:বাংলা সিনেমায় তিনি নি’ছ’ক একজন অভিনেতা নন বরং এক নিঃ’শ’ব্দ যো’দ্ধা। গ্ল্যামারের প্রজেক্টর লাইটে নিজেকে প্রোজেক্ট করার চেয়ে কাজের ভেতর দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করাই যার নেশা। তিন দশকের লম্বা প’থ’চ’লা’য় টোটা রায়চৌধুরী (Tota Roy Chowdhury) কখনও স্টারডমের হু’ল্লো’ড় তা’ড়া করেননি; বরং নিজের সী’মা’ব’দ্ধ’তা, সং’গ্রা’ম, ব্য’র্থ’তা সব কিছু অ’ক’প’টে মেনে নিয়ে শিল্পীসত্ত্বাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
ফেলুদার মতো আইকনিক চরিত্রে অভিনয়ের সা’হ’স দেখানো মানুষটি জানেন স’মা’লো’চ’না তার নিত্যসঙ্গী। তবু থা’মে’ন না। কারণ তাঁর কাছে অভিনয় শুধুই পে’শা নয়, এক ধরনের আ’ত্ম’প্র’কা’শ, নিজের প্রতি দা’য়’ব’দ্ধ’তা। বড় ব্যানার, গডফাদার বা সুবিধার রাস্তা ছা’ড়া দাঁড়িয়ে থাকা এই অভিনেতা বি’শ্বা’স করেন শিল্পীকে বাঁ’চি’য়ে রাখে শুধু কা’জ আর দর্শকের প্র’তি’ক্রি’য়া।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বাংলা সিনেমা, ফেলুদা চরিত্রে অভিনয়, ইন্ডাস্ট্রির সী’মা’ব’দ্ধ’তা, নতুন অভিনেতাদের সুযোগ, সুপারস্টারদের অবস্থান এবং দর্শকদের রু’চি’র পরিবর্তন সবকিছু নিয়েই স্প’ষ্ট, অ’ক’প’ট ও সোজাসাপ্টা মতামত দিয়েছেন অভিনেতা টোটা রায় চৌধুরী। দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিনয়-যাত্রায় পাওয়া অভিজ্ঞতা, সা’ফ’ল্য, ব্য’র্থ’তা, সু’যো’গ হা’রা’নো এবং স’মা’লো’চ’না’কে কীভাবে সা’ম’লে’ছে’ন সে কথাও খো’লা’মে’লা স্বী’কা’র করেছেন তিনি।
এই সাক্ষাৎকারে উ’ঠে এসেছে একদিকে একজন শিল্পীর বি’ন’য় ও আ’ত্ম’স’মা’লো’চ’না, অন্যদিকে বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তাঁর হ’তা’শা, উ’দ্বে’গ ও বা’স্ত’ব’তা’র ক’ষা’ঘা’ত।
শুরুতেই যখন ফেলুদাকে বাঙালির একটি “আ’লা’দা ই’মো’শ’ন” হিসেবে উল্লেখ করা হয় , টোটা রায় চৌধুরী জানান, ভূমিকা হাতে পাওয়ার পর থেকেই তাঁর মনে অ’দ্ভু’ত উ’ত্তে’জ’না ও চা’প কাজ করতে থাকে। তিনি বলেন – “যখনই স্ক্রিপ্টটা পাই তখনই উ’ত্তে’জ’না’র পারদ চ’ড়’তে থাকে।” তবে সেই উ’চ্ছ্বা’সে’র পাশাপাশি থেকে যায় ভ’য় ও না’র্ভা’স’নে’স’ও। কারণ হিসাবে তিনি বলেন – “এত গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র… পা’ন থেকে চু’ন খ’স’লে পরে লোকে স’মা’লো’চ’না এমনিই করবে।” তিনি মনে করেন, ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করা মানেই নিজেকে স’মা’লো’চ’না’র জন্য উ’ন্মু’ক্ত করে দেওয়া। তাঁর কথায়, “ফেলুদা এমন একটি চরিত্র, যারা এটি অভিনয় করবেন তাদের স’মা’লো’চি’ত হতে হবেই। কেউ ছা’ড় পাননি।” উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়(Soumitra Chatterjee), সব্যসাচী চক্রবর্তী(Sabyasachi Chakraborty), এমনকি সত্যজিৎ রায়(Satyajit Ray)ও ফেলুদা (Feluda) নিয়ে স’মা’লো’চ’না’র স’ম্মু’খী’ন হয়েছিলেন বলেই মন্তব্য করেন টোটা। নিজেকে ‘ছো’ট একজন অভিনেতা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি তো সেখানে সামান্য একজন, তাই আমার স’মা’লো’চ’না হওয়াটা স্বাভাবিক।”
তাঁর ব্যক্তিগত বু’দ্ধি’বৃ’ত্তি’ক দৃ’ষ্টি’ভ’ঙ্গি বা ‘ম’গ’জা’স্ত্র’ নিয়ে জানতে চাইলে টোটা বলেন “আমি ব্যক্তিগত জীবনে ফেলুদার মতো হবার চেষ্টা করি, অনুপ্রাণিত হই।” অভিনয় স’ম্প’র্কে তাঁর দর্শনও স্পষ্ট – “অভিনয় হল আ’ত্ম’প্র’কা’শে’র এক বিশেষ রূপ, যা পরিচালকের দিক নির্দেশনায় গঠিত হয় (Acting is a form of self-expression, guided by the director)।”
নিজের কাজের তিনটি প্রধান লক্ষ্য তিনি প’রি’ষ্কা’র’ভা’বে ব্যাখ্যা করেন । পরিচালক স’ন্তু’ষ্ট থাকবেন, নিজের কাজ নিজের কাছে সৎ থাকবে, কোর দর্শকদের যেন হ’তা’শ না করেন । স’মা’লো’চ’না ও প্র’শং’সা দুটোকেই তিনি একই দূ’র’ত্বে রাখেন।
সহঅভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর ক’র্ম স’ম্প’র্ক প্রসঙ্গে টোটা বলেন, “আমরা একে অপরের পরিপূরক।” তিনি অনির্বাণকে “প্র’তি’ভা’বা’ন অভিনেতা ও ভা’লো মানুষ” হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁদের কাজের স’ম্প’র্ক পে’শা’দা’রি’ত্বে’র বাইরে গিয়ে “কাজের জায়গায় আমাদের মধ্যে একটা অ’দ্ভু’ত আ’ন্ডা’র’স্ট্যা’ন্ডিং আছে…পা’র’স্প’রি’ক স’ম্মা’ন, ভা’লো’বা’সা এবং শ্র’দ্ধা’ই আমাদের কাজের মূল শ’ক্তি।” তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন “আমাদের মধ্যে কোনো প্র’তি’যো’গি’তা নেই, আমরা চাই সিনটা ভা’লো হোক।”
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নায়ক হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা বা’স্ত’বা’য়ি’ত হয়নি একথা অ’ক’প’টে স্বীকার করেন তিনি। তাঁর কথায়, “তখন ছিল (সুযোগ), হলে ভা’লো হত। কিন্তু সবকিছু তো কপালে থাকে না।” নিজের ব্য’র্থ’তা’র দায়ও তিনি নিজেই নেন, “আমারই হয়ত দো’ষ, আমি আমার পরিচালক বা প্রযোজকদের বি’শ্বা’স অ’র্জ’ন করতে পারিনি।” ৩০ বছরের ল’ড়া’ই’য়ে’র কথা বলতে গিয়ে পে’ছ’নে কোনো ব’ড় ব্যানার বা গডফাদার নেই তাঁর সেটাও বলেন। তাঁর ভাষায়, “আমি ৩০ বছর ধরে কাজ করছি এবং আজও আমি নিজের ক্ষ’ম’তা’তে’ই আছি। আমার তো সেইরকম সাপোর্ট নেই বা খুঁ’টি’র জোড় নেই বা কোনো ব্যানার আমাকে ভেবে ছবি করেন না..”।
বাংলা ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় দু’র্ব’ল’তা বা’জে’ট সং’ক’ট একথা পরিষ্কার ভাষায় বলেন তিনি, “আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়…টেকনোলজিকাল অ্যাডভান্স করার মতো বা’জে’ট আমাদের নেই।” অনেক প্র’তি’ভা সু’যো’গে’র অ’ভা’বে হা’রি’য়ে গেছে একথাও উল্লেখ করেন টোটা।তিনি অভিযোগ করে, “আমাদের এখানে একই মুখ, একই লোক, এই মাসে ছবি, পরের মাসে ছবি…একই কম্বিনেশনে হয়ে যাচ্ছিল। এ’ক্স’পে’রি’মে’ন্ট করতে আমাদের ভী’ষ’ণ অ’নী’হা।”
মুম্বইয়ের কাজের ধরন নিয়ে তিনি বলেন, “ওরা ট্যা’লে’ন্ট খুব তাড়াতাড়ি হিসাব করতে পারে।” তাঁর মতে নতুনদের সুযোগ দেয় বলেই বলিউড টি’কে আছে। তিনি নিজের বলিউড কাজের কথাও উল্লেখ করেন। ‘তেরে ইস্ক মে’(Tere Ishk Mein), ‘রকি অউর রানি কি প্রে’ম কাহানি’(Rocky Aur Rani Kii Prem Kahaani), ‘স্পেশাল অপস ২’(Special OPS-2) এবং জানান সৃজিত মুখার্জি (Srijit Mukherji)-র এক ছবিতে তিনি অভিনয় করছেন, যেখানে তাঁর “ছ’ক’ভা’ঙা চরিত্র” দর্শকদের সামনে নতুন টোটা রায় চৌধুরীকে উ’প’স্থা’প’ন করবে।
টোটার মতে, “নতুন অভিনেতারা সুযোগ পাচ্ছে না।” টেলিভিশনেই দেখা যাচ্ছে কত প্র’তি’ভা রয়েছে বলেই দাবি করেন তিনি। তাঁর আহ্বান, “যদি দ’ম থাকে, নতুনদের সুযোগ দিন না…আগামী দিনে বাংলা ছবিকে তারাই এলিভেট করবে।”
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “একটি ইন্ডাস্ট্রির সুপারস্টার কিন্তু একটি ইন্ডাস্ট্রির স’ম্প’দ।” এবং যোগ করেন, “এই মুহূর্তে আমাদের দুইজন অ্যাসেট আছেন জিৎ(Jeet) এবং দেব(Dev) । যারা ল’ক্ষ ল’ক্ষ মানুষকে হলে টানতে পারেন।”
তাঁর মতে, তাদের প্রতি আরও স’ম্মা’ন দেখানো উচিত। তাদের স্ট্যাচার স্বীকার করা প্রয়োজন। তামিল ইন্ডাস্ট্রির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “কমল হাসান(Kamal Haasan)-এর ছবি খুব ভা’লো রিভিউ পেত কিন্তু হলে ততটা চলত না যতটা রজনীকান্তের ছবি চলত।“ তিনি আরও বলেন – “তামিল ইন্ডাস্ট্রি খা’রা’প সময়ে একা রজনীকান্ত(Rajinikanth) টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন।”
“কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত”(Keu Bole Biplobi Keu Bole Dakat)) ছবিতে জিতের অভিনয় নিয়ে তিনি উ’চ্ছ্বাস’ প্রকাশ করেন, “জিতেকে যে রূপে দেখবেন, চমকে যাবেন। আমি তো চ’ম’কে গেছি!” তিনি জিতের প’রি’শ্র’ম, অ’ধ্য’ব’সা’য়, প্র’তি’ভা’র প্র’শং’সা করেন।
ওটিটি যুগেও তিনি মনে করেন, “হল ছাড়া সিনেমা হয় না। সিনেমা ইজ মিন্ট ফর দ্য বিগ স্ক্রিন।” তার মতে, ওটিটি কেবল ডেরিভেটিভ মাধ্যম সিনেমার আসল জায়গা হল। ইন্ডাস্ট্রির ঐ’ক্যে’র আ’হ্বা’ন জানিয়ে তিনি বলেন, “একজনের নৌকা ভা’সি’য়ে অন্যজনের নৌকা ডু’বি’য়ে দেওয়া যাবে না। সবাইকে একসঙ্গে চলতে হবে।”
তিনি ব্য’ঙ্গা’ত্ম’ক ভঙ্গিতে বলেন, “আজকাল স’মা’লো’চ’না’টা মানুষের ডি’ফ’ল্ট সেটিং(default settings) হয়ে গেছে। আমি কিছু জানি না জানি স’মা’লো’চ’না করবই। আর বাঙালি তো এতে সি’দ্ধ’হ’স্ত।”
তিনি ‘ঋতুভিত্তিক বি’শে’ষ’জ্ঞ বাঙালি’র তালিকাও দেন। জানুয়ারিতে সাহিত্য বি’শে’ষ’জ্ঞ, জুলাইতে ফুটবল বি’শে’ষ’জ্ঞ, অক্টোবরে পূজা বি’শে’ষ’জ্ঞ, শীতে ফেলুদা বি’শে’ষ’জ্ঞ। তাঁর অ’ভি’যো’গ অনেকে না প’ড়ে, না জেনে স’হ’জ’ল’ভ্য ইন্টারনেট দেখে স’মা’লো’চ’না করে। অভিনেতা জানান, “পরিচালক যখন শট শে’ষে ‘ওকে’ (okay) বলেন সেটাই আমার কাছে প্রাপ্তি।”
দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে ভা’লো’বা’সা’র জন্য তিনি দর্শকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আপনারা যে আমাকে ৩০ বছর ধরে স’হ্য করছেন…এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পা’ও’না।” এবং যোগ করেন, “ফিডব্যাক ভা’লো হোক বা ম’ন্দ এটাই আমার শ্রেষ্ঠ পু’র’স্কা’র ও অ’নু’প্রে’র’ণা।”