Mithun Chakraborty: বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্র জগতে বায়োপিক একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ধারায় পরিণত হয়েছে। দেশের নানা ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের জীবনকাহিনি নিয়ে বড়পর্দায় ছবি তৈরি হচ্ছে নিয়মিত। ক্রীড়া জগত থেকে রাজনীতি কিংবা বিনোদন বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প দর্শকের সামনে তুলে ধরতে নির্মাতারা বেছে নিচ্ছেন এই ফরম্যাট। খুব সম্প্রতি ঘোষণা হয়েছে প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেট অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী (Sourav Ganguly)-এর জীবন নিয়ে একটি বায়োপিক তৈরির। এর আগে ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক মাহেন্দ্রা সিংহ ধোনি (MS Dhoni)-র জীবন নিয়েও সফল চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে, যা দর্শকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
এই ধারার জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়লেও, এমনও কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যাঁরা নিজেদের জীবনকে পর্দায় দেখতে মোটেই আগ্রহী নন। তাঁদের মধ্যেই অন্যতম নাম টলিউড ও বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী (Mithun Chakraborty)। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয় জীবনে অসংখ্য সাফল্য অর্জন করা এই তারকা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন তিনি কোনওভাবেই নিজের বায়োপিক তৈরি করতে দিতে চান না।
বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে মিঠুন চক্রবর্তীর অবদান অনস্বীকার্য। এক সময়ের সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবক কীভাবে নিজের প্রতিভা ও অদম্য পরিশ্রমের মাধ্যমে গোটা বলিউডে রাজত্ব করেছেন, সেই গল্প অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার। অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতির মঞ্চেও তিনি সক্রিয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকের ধারণা ছিল, তাঁর জীবনের ঘটনাবহুল পথচলা একদিন না একদিন বড়পর্দায় উঠে আসবে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মিঠুন চক্রবর্তী তাঁর এই অবস্থানের কারণ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন। অভিনেতার কথায়, অনেকেই তাঁকে বারবার অনুরোধ করেন তাঁর জীবনের ওপর ভিত্তি করে বায়োপিক তৈরি করতে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন।
মিঠুন বলেন, “অনেকে আমাকে বলেন বায়োপিক বানান। কিন্তু আমি তাদের বলি না, বানাবেন না। আমি নিজে বায়োপিক বানাতে দেব না।”
কেন এমন সিদ্ধান্ত? এই প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর কথায়, জীবনের পথে যে কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়েছে, সেই গল্প পর্দায় দেখলে অনেকেই হয়তো ভেঙে পড়তে পারেন।
মিঠুনের বক্তব্য, তিনি জীবনে যে ধরনের কষ্ট ও প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন, তা সহ্য করা এবং সেখান থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ানো সবার পক্ষে সম্ভব নয়।তাঁর কথায়, “কারণ আমি যা কষ্ট পেয়েছি, মানুষ হিসাবে তা সহ্য করে আবার লড়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা অনেকের থাকবে না।” তাঁর আশঙ্কা, যদি সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলি বায়োপিকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়, তাহলে অনেক দর্শক হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন বা হতাশ হয়ে যেতে পারেন। তাঁর কথায়, “আমার লড়াই দেখে কেউ যেন ভেঙে না যায়, তাই বলি আমার বায়োপিক করবেন না।”
অভিনেতা আরও বলেন, তাঁর লড়াইয়ের গল্প দেখে কেউ যেন মনোবল হারিয়ে না ফেলেন, সেই কারণেই তিনি বায়োপিক তৈরির বিষয়ে আপত্তি জানান।তাঁর কথায়, “আমার বায়োপিক দেখে যেন কেউ হতাশ না হয়ে যায়, কারও যেন মন খারাপ না হয়। এইজন্যই আমি বারণ করি।” তাঁর মতে, কোনও মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতা কখনও কখনও এমনভাবে সামনে আসে, যা অন্যদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই তিনি এই বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত জীবনদর্শন নিয়েও কথা বলেন মিঠুন চক্রবর্তী। তিনি জানান, জীবনে একসময় অনেকেই তাঁকে বলতেন বুক চিতিয়ে মাথা উঁচু করে চলতে। কিন্তু তাঁর মা তাঁকে সম্পূর্ণ ভিন্ন শিক্ষা দিয়েছিলেন।
মিঠুনের কথায়, তাঁর মা সবসময় তাঁকে নম্র ও বিনয়ী থাকতে শিখিয়েছেন। তিনি বলতেন, মাথা নিচু করে হাঁটলে পথের পাথর চোখে পড়ে এবং হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। এই শিক্ষাই তাঁর জীবনের বড় শক্তি হয়ে উঠেছিল বলে জানান অভিনেতা।
প্রসঙ্গত, মিঠুন চক্রবর্তীর অভিনয় জীবনের সূচনা হয়েছিল ১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মৃগয়া’ (Mrigayaa) ছবির মাধ্যমে। এই ছবিতেই অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এরপর ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় তারকা হিসেবে।
১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ ডান্সার’ (Disco Dancer) ছবির মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। এই ছবির সাফল্য শুধু ভারতে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ একাধিক দেশে ছবিটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে, যা মিঠুনকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য হিট ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং বিভিন্ন ধরণের চরিত্রে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখনও তিনি অভিনয়ে সক্রিয় রয়েছেন।
খুব সম্প্রতি তাঁকে দেখা গেছে ‘প্রজাপতি ২’ (Projapati 2) ছবিতে। বয়স বাড়লেও অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ এবং উদ্যমে কোনও ভাটা পড়েনি। আগামী দিনেও একাধিক বড় প্রজেক্টে তাঁকে দেখা যাবে।
জানা গিয়েছে, ভবিষ্যতে তিনি অভিনয় করতে চলেছেন ভূত বাংলা (Bhoot Bangla) এবং লাহোর ১৯৪৭ (Lahore 1947) ছবিতে। ফলে ভক্তদের কাছে এখনও তিনি সমান জনপ্রিয় এবং প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন।
সব মিলিয়ে, জীবনের অসংখ্য সাফল্য ও সংগ্রামের সাক্ষী এই অভিনেতা নিজের গল্পকে বড়পর্দায় তুলে ধরার বিষয়ে একেবারেই অনিচ্ছুক। তাঁর মতে, জীবনের বাস্তব লড়াই সবসময় সিনেমার মতো রঙিন নয়। সেই কঠিন সত্যিই হয়তো তাঁকে বায়োপিক থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করছে।