সাম্প্রতিক এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী তুলিকা বসু (Tulika Basu )তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, অভিনয় যাত্রা, থিয়েটার ও টেলিভিশনের অভিজ্ঞতা, সংসার ভাঙার সিদ্ধান্ত, নৈতিকতা এবং বর্তমান সময়ের রাজনীতি নিয়ে একেবারে খোলামেলা কথা বলেছেন। তাঁর কথায় উঠে এসেছে সংগ্রাম, আত্মসম্মান, দায়িত্ববোধ এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সমাজ ও সংস্কৃতির ছবি।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই সঞ্চালকের প্রশ্ন ছিল, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাড়ির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক আছে কি না! উত্তরে তুলিকা বসু স্পষ্ট করে বলেন, “হ্যাঁ, মানে আমার যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল, তাঁর বাবার কাকা ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু (Subhas Chandra Bose)।”
তিনি জানান, এটি মূলত সুরেশ বসু (Suresh Chandra Bose)পরিবারের যোগসূত্র। বিয়ের পর বসু পরিবারের বউ হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই আলাদা। সেই সময় ঘোমটা দেওয়ার মতো পারিবারিক নিয়ম মানতে হত। কোদালিয়ায় নেতাজির পৈত্রিক বাড়িতে দুর্গাপুজোর অষ্টমীতে অঞ্জলি দেওয়ার স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি। মজারছলে বলেন, পরিবারের অনেকেই একে অপরকে ঠিকমতো চিনতেন না, অথচ তাঁকে সবাই খুব স্নেহ করতেন।
তুলিকা বসু জানান, তাঁর বিয়ে হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৭ আগস্ট, যেটিকে তিনি নিজেই “সাত আট নয় শূন্য” বলে উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, এই তারিখের সহজক্রম তাঁকে আজও ভালো লাগায়।
১৯৯৩ সালে জন্ম হয় তাঁর ছেলের। প্রথম কয়েক বছর সংসার ভালোই চলেছিল। তবে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, “খারাপ থাকাটা শুরু হয় ২০০১ থেকে।” প্রতিটি সম্পর্কেই একসময় স্থিরতা আসে। এই বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, কেউ তা কাটিয়ে উঠতে পারে, কেউ পারে না। শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালে তিনি একা থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
তাঁর কথায়, “একসময় একটা খুব হার্ড টাইম তো, আমি তো জানতাম না আমাকে একা পথ চলতে হবে… আমি চলে আসি ছেলেকে নিয়ে।”
অভিনেত্রী জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁর অভিনয়ের প্রতি গভীর ঝোঁক ছিল। বিশেষ করে পুজোর সময় পাড়ায় ও বিভিন্ন জায়গায় শো করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। “আমার আগ্রহ, আমি আনন্দ পেতাম থিয়েটার করে।”
‘তাসের দেশ’(Tasher Desh)-এর মতো নাটকে অভিনয়ের কথাও স্মরণ করেন তিনি। পুজোর অনেক আগে থেকেই থিয়েটারের মহড়া শুরু হত এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে কল-শো আসত।
থিয়েটার গ্রুপে যোগ দেওয়ার অনেক আগেই টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন তুলিকা বসু। ১৯৯৬ সালে আলফা বাংলার ‘এবারে জম্মে মজা’-তেই ছিল তাঁর প্রথম কাজ। “একদিনের শুটিং ছিল, কিন্তু আমার ছেলে ছোট ছিল বলে দুদিন লেগেছিল।” এই কাজের পেছনে তাঁর মেসো, প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার প্রীতম মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি বলেন, “তিনি একজন খুব নামী এবং শিক্ষিত স্ক্রিপ্ট রাইটার ছিলেন… মেসো বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলেন যে আমার ওদিকে আগ্রহ আছে।”
ছেলের ছোটো বয়সের কারণে একটি দীর্ঘ বিরতি নিতে হয় তাঁকে। ১৯৯৮ সালে দেবাংশু সেনগুপ্ত (Debangshu Senguta)-এর ফোনে ‘মহাপ্রভু’ সিরিয়ালের মাধ্যমে তাঁর প্রত্যাবর্তন। “মহাপ্রভু থেকে আমার যাত্রা শুরু।” এই সিরিয়ালেই রজতাভ দত্ত (Rajatava Dutta)-কে দাদার চরিত্রে পেয়েছিলেন তিনি। সেই সময়ের কাজের পরিবেশ প্রসঙ্গে বলেন, “তখন আমাদের অভিনয় শেষ হয়ে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে টাকা দেওয়া হত।”
১৯৯৮ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত থিয়েটারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন তুলিকা বসু। তবে ২০০৭ সালে থিয়েটার ছাড়তে বাধ্য হন। কারণ হিসেবে তিনি জানান, একা থাকার সিদ্ধান্তের পর অভিনয়ই হয়ে ওঠে তাঁর আয়ের একমাত্র ভরসা।
তিনি মনে করেন, থিয়েটার ২৪ ঘণ্টার কাজ। সিরিয়ালের প্রযোজকের কাছ থেকে ১৪ ঘণ্টার পারিশ্রমিক নেওয়ার পর সেই সময় চুরি করে থিয়েটারের রিহার্সালে যাওয়া তাঁর কাছে অনৈতিক ছিল। “ফাঁকিবাজি করলে হবে না” – এই নীতিতেই তিনি থিয়েটার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তাঁর প্রিয় কাজের তালিকায় রয়েছে রাজ চক্রবর্তীর ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’(chirodini tumi je amar), ‘প্রেম আমার’(prem amar), ‘চ্যালেঞ্জ’(Challenge), ‘পাগলু’(Paglu), রঙ্গন চক্রবর্তীর (Rangan Chakraborty) ‘বাড়ি তার বাংলা’(Bari tar Bangla), সুমন মুখোপাধ্যায়ের (Suman Mukherjee) ‘শেষের কবিতা’( Seser kabita), রাজা চন্দের (Raja Chanda)‘লাভেরিয়া’(Laveria), ‘আওয়ারা’(Awara), ‘দিওয়ানা’(Deewana)এবং সাম্প্রতিক ‘চন্দ্রবিন্দু’(Chandrabindu)।
টেলিভিশনে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’(Ogo Badhu Sundori), ‘খেলা’(khela), ‘নীড় ভাঙা ঝড়’(Nir Bhanga Jhor), ‘এক আকাশের নিচে’(Ek Akasher Niche)-এর মতো সিরিয়ালেও তাঁর কাজ দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
পুরানো দিনের কাজের পরিবেশের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করে তুলিকা বসু বলেন, “রবির মতো ডিরেক্টররা তখন টিচার ছিলেন।”
চন্দন সেন (Chandan Sen), জগন্নাথ বসু(Jagannath Basu), অনিন্দ্য সরকার(Aninda Sarkar), অভিজিৎ দাশগুপ্তদের (Abhijit Dasgupta) সান্নিধ্যে কাজ করার অভিজ্ঞতা আজও তাঁর কাছে শিক্ষার সমান। “এখন মানুষের কাছে সব আছে, কিন্তু সময়টা নেই”- এই আক্ষেপও উঠে আসে তাঁর কথায়। বর্তমান সময় নিয়ে কিছুটা ক্ষোভের সুরেই বলেন,“আমার এখন মনে হয় অভিনয়ের জগতে রাজনীতি হচ্ছে, আর রাজনীতিবিদরা অভিনয় করছেন।”
সুশান্ত সিং রাজপুতের (Sushant Singh Rajput) ঘটনা তাঁর বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছিল বলেও স্বীকার করেন তিনি। কলকাতার বর্তমান পরিস্থিতি, আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন।সাক্ষাৎকারের শেষে তুলিকা বসু বলেন, “আমি আসলে বেঁচে থাকি অ্যাকশনে, মারা যাই কাটে।” এই একটি লাইনেই ধরা পড়ে তাঁর অভিনয় জীবনের দর্শন ক্যামেরার সামনে থাকাই তাঁর বেঁচে থাকা, আর কাট হলেই শেষ হয় সেই মুহূর্তের জীবন।
এই সাক্ষাৎকারে তুলিকা বসু শুধু একজন অভিনেত্রী নন, একজন মা, একজন সংগ্রামী নারী এবং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবেও নিজেকে মেলে ধরেছেন যাঁর জীবন পথে অভিনয় শুধু পেশা নয়, দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার নাম।