দীর্ঘ ১২–১৩ বছরের বিরতির পর আবার টেলিভিশনের পর্দায় ফিরেছেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী পাপিয়া সেন (Papiya Sen)। একসময় বাংলা টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ হলেও ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক দায়িত্ব এবং ভ’য়ং’ক’র অ’সু’স্থ’তা’র কারণে অভিনয় থেকে অনেকটাই দূরে সরে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সময়, পরিস্থিতি এবং জীবনের ক’ঠি’ন ল’ড়া’ই তাঁকে ভে’ঙে না দিয়ে আরও শ’ক্ত করে তুলেছে। আজ সেই শ’ক্তি, ইতিবাচক মনোভাব এবং জীবনের প্রতি গভীর ভা’লো’বা’সা নিয়েই আবার দর্শকের সামনে হাজির হচ্ছেন তিনি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পাপিয়া সেন ( Papiya Sen) তাঁর জীবনের সবচেয়ে ক’ঠি’ন অধ্যায়ের কথা অকপটে তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, একসময় এমন একটি রো’গে আ’ক্রা’ন্ত হয়েছিলেন, যাকে তিনি নিজেই “মা’র’ণ রো’গ” বলে উল্লেখ করেন। সেই মুহূর্তের ভ’য়া’ব’হ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, যখন প্রথম অ’সু’খ ধরা পড়ে, তখন তাঁর স্বামী অত্যন্ত আ’তঙ্কি’ত হয়ে পড়েছিলেন। একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর এমন রো’গ মানেই যেন আর কোনো কামব্যাক নেই, এই ধারণাই তখন তাঁদের গ্রাস করেছিল।
তবে শা’রী’রি’ক’ভা’বে সু’স্থ হয়ে ফেরার পর মা’ন’সি’ক’ভা’বে তিনি আরও দৃঢ় হয়েছেন। পাপিয়া সেনের কথায়, সেই সময় তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি আবার নতুন করে জীবন পেয়েছেন এবং এই জীবন শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও কিছু দেওয়ার দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। “I have to give something more to this world… আনন্দ দেওয়ার আমার অনেক বাকি আছে” – এই উপলব্ধিই তাঁকে আবার কাজে ফেরার অনুপ্রেরণা দেয়।
দীর্ঘ বিরতির পর অভিনয়ে ফেরা নিয়ে পাপিয়া সেন অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি মনে করেন, তাঁর এই ফিরে আসা যেন নিজের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার মতো। যেই প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে একসময় কাজ করতেন, তাদেরই আহ্বানে আবার সেই পরিবেশে ফিরে আসা তাঁর কাছে আবেগঘন অভিজ্ঞতা। প্রায় ১২–১৩ বছরের ব্যবধানে আবার সেই ‘হাউস’-এ কাজ করার সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করেন।
অভিনয়ের জগতে নিজের উদ্যোগের কথাও লুকাননি তিনি। অকপটে স্বীকার করেছেন, কাজের ব্যাপারে তিনি নিজেই যোগাযোগ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন দেবলীনা দত্তে(Debolina Dutta)-র প্রতি। পাপিয়া সেন বলেন, দেবলীনার মতো মানুষ খুব কমই পাওয়া যায়, যাঁরা কথা রাখেন। ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ হলেও তা পালন করার মানুষ সত্যিই হাতে গোনা এই বাস্তবতাও তিনি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন – “আমি দেবলীনাকে বলে কাজটায় ঢুকে গেছি। দেবলীনার মতন আরও কিছু মানুষ আছে যাঁরা তাঁদের কথা রাখে… কথা রাখার লোক খুব অল্প।”
নতুন প্রজেক্টে তাঁর চরিত্র নিয়েও তিনি ভীষণ উচ্ছ্বসিত। একটি পরিবারের অভিভাবক চরিত্রে তাঁকে দেখা যাবে, যা তাঁর কাছে অত্যন্ত সুন্দর এবং গভীর একটি ভূমিকা। বয়স, অভিজ্ঞতা এবং জীবনের বাস্তবতা সব মিলিয়ে এই চরিত্রে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মেলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন বলেই মনে করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, প্রায় ১২–১৩ বছর পর ছোটপর্দায় পাপিয়া সেনের এই প্রত্যাবর্তন ঘটছে জি বাংলার সদ্য শুরু হওয়া ধারাবাহিক ‘কোনে দেখা আলো’-এর মাধ্যমে। এই ধারাবাহিকে তিনি একটি ঠাম্মি বা দিদা চরিত্রে অভিনয় করছেন। তাঁর মতে, পুরানো জায়গায় ফেরা মানে শুধুই কাজ নয়, বরং ভালোবাসার টানে ফিরে আসা। তিনি বলেন, যে জায়গার সঙ্গে আবেগ জড়িয়ে থাকে, ভালোবাসা থাকে, সেই জায়গায় মানুষ অনেক বছর পরও ফিরে যেতে চায়।
পাপিয়া সেনের শেষ টেলিভিশন কাজ ছিল লীনা গঙ্গোপাধ্যায় (Leena Gangopadhyay )-এর চিত্রনাট্যে তৈরি ধারাবাহিক ‘চোখের তারা তুই’। লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। লীনা যে একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ এবং অসম্ভব প্রতিভাবান এ কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে ছিল আন্তরিকতা।
এই সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক অংশ নিঃসন্দেহে তাঁর ক্যা’ন্সা’রে’র সঙ্গে ল’ড়া’ই’য়ে’র অভিজ্ঞতা। পাপিয়া সেন জানান, ২০১৮ সালে তাঁর ব্লা’ড ক্যা’ন্সা’র ধরা পড়ে। সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছিল, জীবন যেন এখানেই শেষ হয়ে গেল। তিনি ভাবছিলেন, ঈশ্বর তাঁকে এত কিছু দিয়েছেন পরিবার, সন্তান, আবার কাজ শুরু করার সুযোগ সব কি হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যাবে?
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করাই জীবনের আসল মানে। তাঁর জীবনদর্শন খুব স্পষ্ট – “লিভ লাইফ কিং সাইজ।” প্রতিটা মুহূর্ত আনন্দ করে, সুন্দর করে বাঁচতে চান তিনি। অ’সু’স্থ’তা বা ক্লা’ন্তি নিয়ে অভিযোগ করাকে তিনি নিজের স্বভাবের অংশ করেননি। বাড়িতে গিয়েও নিজের ক’ষ্ট নিয়ে আ’ক্ষে’প না করে, প’রি’স্থি’তি’কে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াতেই বিশ্বাসী তিনি।
নিজের ক’ষ্টে’র থেকেও অন্যদের ক’ষ্টে’র কথা ভাবা থেকেই তিনি শ’ক্তি পান। হা’স’পা’তা’লে শুয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের কথা, বা যাঁদের জীবনে আরও বড় ক্ষ’তি নেমে এসেছে এই তুলনাই তাঁকে মা’ন’সি’ক’ভা’বে দৃঢ় রাখে। তাঁর কথায়, দুঃ’খ আর ক’ষ্ট জীবনে আসবেই, কিন্তু থেমে থাকা চলবে না। কোথাও না কোথাও জী’ব’নী’শ’ক্তি জমা থাকে, সেখান থেকেই মানুষ আবার উঠে দাঁড়ায়।
পাপিয়া সেন মনে করেন, টেলিভিশন এমন একটি মাধ্যম যা সরাসরি মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়। দর্শক যখন পর্দার চরিত্রগুলোকে নিজের পরিবারের সদস্য বলে ভাবতে শুরু করেন, সেটাই একজন শিল্পীর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি আবার ছোটপর্দায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
একটি বিশেষ ঘটনার কথাও তিনি ভাগ করে নেন। একদিন সিনেমা হলে অভিনেত্রী দেবলীনা ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। তখন দেবলীনা তাঁকে বলেন, তিনি নিজে কাজ করবেন না, বরং পাপিয়া সেন যেন কাজটি করেন। এর আগে অনেক অফার ফিরিয়ে দিলেও, এই প্রস্তাব তাঁকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
পারিবারিক কারণেও দীর্ঘদিন কাজ থেকে দূরে ছিলেন তিনি। তাঁর বড় মেয়ের যমজ সন্তান হওয়ার পর তাদের দেখাশোনার দায়িত্বে নিজেকে পুরোপুরি জড়িয়ে ফেলেছিলেন। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, অনেক মা হয়ত সংসারের চাপে নিজের সন্তানের ছোটোবেলা ঠিকভাবে উপভোগ করতে পারেন না, কিন্তু নাতি-নাতনিদের মধ্য দিয়ে সেই স্মৃতি আবার ফিরে আসে।
অ’সু’স্থ’তা’র পর কাজে ফিরে এসে যে ভা’লো’বা’সা তিনি পেয়েছেন, তাতে তিনি আপ্লুত। কাজের পরিবেশ কেমন হবে, মানুষ তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করবে এই সব আ’শ’ঙ্কা থাকলেও বাস্তবে তিনি যে উ’ষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন, তা কল্পনাও করতে পারেননি। সহকর্মীদের ভা’লো’বা’সা ও আন্তরিকতায় তিনি অভিভূত।
পাপিয়া সেনের এই জীবন সং’গ্রা’ম, ইতিবাচক মা’ন’সি’ক’তা এবং সা’হ’সী প্রত্যাবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্র’তি’কূ’ল’তা যতই বড় হোক না কেন, মনের জো’র আর আশাবাদ থাকলে জীবনকে আবার নতুন করে শুরু করা সম্ভব। তাঁর এই ফিরে আসা শুধু একটি অভিনয় কামব্যাক নয়, বরং জীবনের প্রতি এক অনমনীয় বিশ্বাসের উদযাপন।