Indrani Halder:বাংলা টেলিভিশন ও সিনেমা জগতের এক অত্যন্ত পরিচিত নাম ইন্দ্রাণী হালদার। পর্দায় কখনও আদর্শ বউ, কখনও স্নেহময়ী মা, আবার কখনও দৃঢ়চেতা নারী বিভিন্ন চরিত্রে দর্শকের মনে পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ‘গোয়েন্দা গিন্নি’ থেকে শুরু করে ‘শ্রীময়ী’ একের পর এক শক্তিশালী চরিত্রে দর্শকের মন জয় করেছেন তিনি। শুধু বাংলা নয়, হিন্দি টেলিভিশনেও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত। জনপ্রিয়তা, সাফল্য, সম্মান সবই পেয়েছেন ইন্দ্রাণী। তবুও এই উজ্জ্বল জীবনের আড়ালেই রয়ে গিয়েছে এক গভীর অপূর্ণতা, এক ব্যক্তিগত আক্ষেপ, যা আজও তাঁকে স্পর্শ করে।
দু’বার বিবাহ হলেও জীবনে সন্তানের মুখ দেখা হয়নি ইন্দ্রাণী হালদারের। কর্ম ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর কেরিয়ারের চাপে মাতৃত্বের স্বাদ অধরাই থেকে গিয়েছে তাঁর জীবনে। এই বিষয়টি নিয়ে খুব কমই প্রকাশ্যে কথা বলেছেন অভিনেত্রী। তবে বছরখানেক আগে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় সঞ্চালিত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘অপুর সংসার’-এ এসে প্রথমবার নিজের মনের কথা অকপটে ভাগ করে নিয়েছিলেন তিনি।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে সঞ্চালক শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় মজার ছলে প্রশ্ন করেন, স্ত্রী হিসেবে নিজেকে কত নম্বর দেবেন ইন্দ্রাণী? প্রশ্ন শুনে এক মুহূর্ত না ভেবে অভিনেত্রীর সোজাসাপটা উত্তর ছিল, “১০-এ আমি নিজেকে জিরো দেব।” এই মন্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর আত্মসমালোচনামূলক মনোভাব। এরপর হাসতে হাসতেই ইন্দ্রাণী বলেন, তিনি মোটেই আদর্শ, সংসারী বউ নন। স্বামী কলকাতায় এলে সকালে উঠে রান্না করে ভাত বেড়ে দেওয়ার সুযোগ তাঁর খুব কমই হয়েছে। বরং শ্যুটিংয়ের তাড়ায় অনেক সময়ই বলতে হয়েছে ভাত নিজেই খেয়ে নিও, আমার কাজ আছে। এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক ব্যস্ত জীবনের বাস্তব ছবি।
তবে কথোপকথনের গভীরে ঢুকতেই উঠে আসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায়। শাশ্বত জানতে চান, আর কী করলে নিজেকে স্ত্রী হিসেবে একটু বেশি নম্বর দিতে পারতেন? তখনই গম্ভীর হয়ে ইন্দ্রাণী বলেন, এমন একটি কথা আছে যা তিনি কোনও দ্বিধা ছাড়াই সবার সামনে স্বীকার করতে পারেন। শুধুমাত্র কেরিয়ার, কাজ আর দায়িত্বের পিছনে ছুটতে ছুটতে তিনি সন্তানের জন্ম দেননি। এই সিদ্ধান্ত অথবা বলা ভালো পরিস্থিতি আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আ’ফ’সো’স’গুলোর একটি।
অভিনেত্রীর কথায়, এই আ’ক্ষে’প শুধু তাঁর একার নয়, তাঁর স্বামী ভাস্করেরও। একটা সময় দু’জনেই সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে সেই চেষ্টায় সাফল্য আসেনি। এরপর বয়স বাড়তে থাকে, দু’জনেরই চল্লিশ পেরিয়ে যায়। তখন তাঁরা বিষয়টি মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইন্দ্রাণী জানিয়েছিলেন, তিনি একসময় সন্তান দত্তক নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিষয়ে ভাস্কর রাজি হননি। এই জায়গাটাতেই আজও তাঁর মনে হয়, স্বামীকে সন্তানের আনন্দ দিতে না পারার একটা দায় তাঁর রয়ে গিয়েছে।
তবে মাতৃত্ব না এলেও তাঁদের দাম্পত্য জীবনে তাঁর কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি…একথাও স্পষ্ট করে বলেছেন ইন্দ্রাণী। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দু’জনেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। একে অপরের পাশে থেকেছেন, সমর্থন জুগিয়েছেন। এই মা’ন’সি’ক পরিপক্বতাই তাঁদের স’ম্প’র্ক’কে দৃঢ় রেখেছে বলে মনে করেন অভিনেত্রী।
অনুষ্ঠানের আবেগঘন মুহূর্তে পরিস্থিতি হালকা করতে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় মজা করে বলেন, “সন্তান না থাকলেও তুমি তো গোটা ইন্ডাস্ট্রির মামণি।” এই মন্তব্যে হেসে ফেলেন ইন্দ্রাণী। তাঁর চোখেমুখে তখন অন্যরকম প্রশান্তি। তিনি জানান, সন্তান জ’ন্ম না দিলেও তাঁর জীবনে সন্তানস্বরূপ অনেক মানুষ রয়েছেন। তাঁদের ভালোবাসা, স্নেহ আর স’ম্প’র্ক নিয়েই তিনি সুখী।
বর্তমানে দীর্ঘদিন ধরে অভিনয় জগৎ থেকে খানিকটা দূরে রয়েছেন ইন্দ্রাণী হালদার। নিয়মিত পর্দায় দেখা না গেলেও তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়েনি। আজও দর্শক তাঁকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়। সফল কেরিয়ারের ঝলকানির পাশাপাশি তাঁর জীবনের এই না-বলা অধ্যায়ও মনে করিয়ে দেয় তারকাদের জীবনও সবসময় নিখুঁত নয়, সাফল্যের আড়ালেও লুকিয়ে থাকে কিছু না-পাওয়া, কিছু অপূর্ণতা, যা আজীবন সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়।