Iman Chakraborty: আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিন রাজ্যের গুণীজনদের হাতে ‘বঙ্গবিভূষণ’ ও ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মান তুলে দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংগীত জগতে অসামান্য অবদানের জন্য চলতি বছরে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হন গায়িকা ইমন চক্রবর্তী(Iman Chakraborty)। পুরস্কার গ্রহণের পর মঞ্চের এক বিশেষ মুহূর্তের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়(Mamata Banerjee)-র প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগ প্রকাশ করেন। আর সেই পোস্ট ঘিরেই তৈরি হয়েছে চর্চা, প্রশংসা যেমন এসেছে, তেমনই ধেয়ে এসেছে সমালোচনার ঝড়।
রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান হাতে পাওয়ার পর ইমন একটি ছবি শেয়ার করেন, যেখানে দেখা যায় তিনি ট্রফি ও মানপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশাপাশি প্রয়াত মায়ের ছবির সামনে পুরস্কারটি রেখে একটি আবেগঘন বার্তাও লেখেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘মায়ের কাছে রাখা মাতৃসমার হাত থেকে নেওয়া পুরস্কার।’ ‘মাতৃসমা’ শব্দের ব্যবহারে স্পষ্ট যে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে শুধুই প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে নয়, এক স্নেহময়ী অভিভাবকের আসনে বসিয়েছেন। তাঁর এই ভাষ্য অনেকের কাছেই আবেগঘন ও আন্তরিক মনে হলেও রাজনৈতিক আবহে তা অন্য মাত্রাও পেয়েছে।তিনি আরও লেখন,”ধন্যবাদ দিদি রাজ্যের সর্বচ্চো সন্মান দেওয়ার জন্য। আমি আজীবন কৃতজ্ঞা থাকব। সঙ্গীত এর পথে থকব। বঙ্গবিভূষণ।.. ”
ইমন পোস্টে মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে লেখেন, রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়ায় তিনি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন। একই সঙ্গে সংগীতের পথেই থাকার অঙ্গীকারও করেন। নিজের সাফল্যের জন্য জগন্নাথ দেবের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে পোস্টের শেষে লেখেন, ‘জয় জগন্নাথ’। ব্যক্তিগত অনুভূতি, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা এই তিনের মিশেলে তৈরি ওই পোস্ট মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়।
তবে প্রশংসার ঢলের পাশাপাশি শুরু হয় তীব্র কটাক্ষও। কারণ, রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত। এমন সময়ে এক সময়ের বাম ছাত্রনেত্রী হিসেবে পরিচিত ইমনের এই প্রকাশ্য কৃতজ্ঞতা অনেকের নজরে অন্যভাবে ধরা পড়ে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, অতীতের অবস্থানের সঙ্গে বর্তমান অবস্থানের এই ফারাক প্রশ্ন তুলছে তাঁর অবস্থান নিয়ে। বিশেষত প্রতীক উর রহমানের দলবদলের আবহে ইমনের পোস্টকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে নানা জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে।
কেউ কেউ সরাসরি তাঁকে ‘সুবিধাবাদী’ আখ্যা দিয়েছেন, কেউ বা কটাক্ষ করে লিখেছেন ‘চটিচাটা’। আবার একাংশের মন্তব্য, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে সম্ভাব্য টিকিটের পথ মসৃণ করতেই এই বার্তা। যদিও এসব সমালোচনার কোনও প্রত্যুত্তর দেননি গায়িকা। বরং তিনি তাঁর সম্মান প্রাপ্তির আনন্দ এবং সংগীতচর্চার প্রতিশ্রুতিতেই স্থির থেকেছেন।
উল্লেখ্য, সংগীতের জগতে ইমনের যাত্রা দীর্ঘ এবং সাফল্যে ভরা। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পী ইতিমধ্যেই নিজের স্বতন্ত্র গায়কি দিয়ে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। লোকসংগীত থেকে রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক গান সব ধারাতেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। মঞ্চে হোক বা স্টুডিওতে, ইমনের কণ্ঠের স্বকীয়তা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতারই স্বীকৃতি হিসেবে এ বছরের ‘বঙ্গবিভূষণ’ তাঁর মুকুটে নতুন পালক যোগ করল।
এদিন ইমনের পাশাপাশি ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন সংগীত ও সংস্কৃতির আরও একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তালিকায় রয়েছেন শিবাজী চট্টোপাধ্যায়(Shibaji Chatterjee), শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়(Sreeradha Bandyopadhyay), নচিকেতা চক্রবর্তী(Nachiketa Chakraborty), লোপামুদ্রা মিত্র(Lopamudra Mitra) এবং গায়ক তথা রাজনীতিক বাবুল সুপ্রিয়(Babul Supriyo)। এছাড়াও এই স্বীকৃতি পেয়েছেন চিত্রকর গণেশচন্দ্র হালুই(Ganesh Haloi) ও কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়(Srijato Bandyopadhyay)।
অন্যদিকে ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মাননা পেয়েছেন অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। সংগীত জগত থেকে এই সম্মান পেয়েছেন মনোময় ভট্টাচার্য(Manomay Bhattacharya), রাঘব চট্টোপাধ্যায়(Raghab Chatterjee), রূপঙ্কর বাগচি(Rupankar Bagchi)। একই স্বীকৃতি এসেছে কার্তিক দাস বাউল (Kartik Das Baul)ও অদিতি মুন্সী(Aditi Munshi)-র ঝুলিতেও। সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে দিনটি ছিল সম্মান ও আবেগের। তবে ইমনের একটি শব্দ – ‘মাতৃসমা’ রাজনৈতিক আবহে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে নির্বাচন-পূর্ব রাজনীতির তপ্ত প্রেক্ষাপট এই দুইয়ের সংঘাতে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
সংগীতশিল্পী হিসেবে তাঁর সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন নেই, কিন্তু জনপরিসরে তাঁর ভাষ্য যে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মুখে পড়বে, তা স্পষ্ট। এখন দেখার, সময়ের সঙ্গে এই বিতর্ক থিতিয়ে যায়, নাকি তা আরও বড় আলোচনার জন্ম দেয়। আপাতত ইমন চক্রবর্তী তাঁর প্রাপ্ত সম্মান ও সংগীতযাত্রার অঙ্গীকার নিয়েই সামনে এগোতে চাইছেন আর সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে চলছে সমর্থন ও সমালোচনার সমান্তরাল স্রোত।