Prabhat Roy: ১১ বছর পর আবার শ্যুটিং ফ্লোরে ফিরছেন টলিউডের বর্ষীয়ান পরিচালক প্রভাত রায়(Prabhat Roy)। বয়স এখন ৮২। কিন্তু সৃজনশীলতার প্রতি তাঁর টান এখনও অটুট। তাই দীর্ঘ বিরতির পর আবারও পরিচালকের আসনে বসতে চলেছেন তিনি। তাঁর নতুন ছবির বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর(Rabindranath Tagore)-এর কালজয়ী ছোটগল্প ‘বলাই'(Bolai)। রবীন্দ্রনাথের এই সংবেদনশীল গল্পকে নিজের ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা করেছেন প্রভাত রায়।
একসময় টলিউডে ‘হিট মেশিন’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। তাঁর পরিচালিত বহু ছবি দর্শকদের মন জয় করেছে এবং বক্স অফিসেও সফল হয়েছে। তবে গত এক দশকেরও বেশি সময় তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে দূরে ছিলেন। সেই দীর্ঘ বিরতির পর আবার ক্যামেরার পেছনে দাঁড়ানো তাঁর কাছে যেমন আবেগের, তেমনই বিশেষ এক অভিজ্ঞতা।
এই ছবির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এক ছোট্ট ছেলে বলাই। শান্ত, লাজুক এবং অন্তর্মুখী স্বভাবের এই শিশুটি খুব অল্প বয়সেই মাকে হারায়। সেই শূন্যতা এবং একাকিত্ব তার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই নিঃসঙ্গতার মধ্যেই সে খুঁজে পায় এক অদ্ভুত সঙ্গী একটি শিমুল গাছ। ধীরে ধীরে সেই গাছই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
এই সম্পর্ক শুধুমাত্র একটি শিশুর প্রকৃতিপ্রেমের গল্প নয়। বরং এটি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির এক গভীর আত্মিক বন্ধনের প্রতীক। সেই আবেগঘন সম্পর্ককেই বড় পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে চান প্রভাত রায়। তবে গল্পের মোড়ে আসে এক কঠিন পরিবর্তন। একসময় বলাইকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তার প্রিয় শিমুল গাছের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই বিচ্ছেদ এবং স্মৃতির টানই গল্পটিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করতে চলেছেন অভিনেতা কৌশিক সেন(Koushik Sen), অভিনেত্রী বাসবদত্তা চ্যাটার্জী(Basabdatta Chatterjee ), অভিনেতা অনুজয় চট্টোপাধ্যায়(Anujoy Chattopadhyay) এবং প্রবীণ শিল্পী ফাল্গুনী চ্যাটার্জী (Phalguni Chatterjee)। অভিজ্ঞ এই শিল্পীদের উপস্থিতি ছবির গল্পকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে বলেই মনে করছেন নির্মাতারা।
ছবির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন কবীর সুমন (Kabir Suman)। তাঁর সুর এই সংবেদনশীল গল্পের আবহকে আরও গভীর করে তুলবে বলে আশা করছেন পরিচালক।
ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো ছোট্ট বলাই। সেই চরিত্রের জন্য অডিশনের মাধ্যমে একজন শিশুশিল্পী ইতিমধ্যেই নির্বাচন করা হয়েছে। তবে পরিচালক এখনও সেই খুদে অভিনেতার নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁর ইচ্ছা, দর্শক যেন প্রথমবার সেই শিশুশিল্পীকে সরাসরি পর্দাতেই আবিষ্কার করেন। তাই আপাতত তার পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় পর শ্যুটিং ফ্লোরে ফেরা নিয়ে আবেগাপ্লুত প্রভাত রায়। পরিচালকের কথায়,
“৮২ বছর বয়সে এমন একটি বিষয় নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম যার সঙ্গে মানুষ একাত্ম হতে পারে। রবি ঠাকুরের ‘বলাই’ বাঙালির মনের খুব কাছের গল্প।”
কয়েক বছর আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। সেই সময় তিনি নিজেও ভাবেননি যে আবার কখনও কাজ করতে পারবেন। সেই প্রসঙ্গ তুলে পরিচালক বলেন,“তিন বছর আগে যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম, ভাবিনি আর বাঁচব। কিন্তু একতা আমার জীবনে এসে সবকিছু বদলে দিল। ঠিক যেমন ছোট্ট বলাইয়ের জীবনে শিমুল গাছটা এক পশলা টাটকা বাতাস হয়ে এসেছিল।”
এই ছবির চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন একতা। তাঁকে নিজের মানসকন্যা বলেই মনে করেন প্রভাত রায়। পরিচালকের মতে, একতার উৎসাহ এবং সমর্থনই তাঁকে আবার শ্যুটিং ফ্লোরে ফেরার সাহস দিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“একতাই আমাকে আবার শ্যুটিংয়ে ফেরার স্বপ্ন দেখিয়েছে। গত ১১ বছর আমি ফ্লোর থেকে দূরে ছিলাম। ও-ই চিত্রনাট্য লিখে সবকিছু গুছিয়ে দিয়েছে।”
পরিচালক চেয়েছিলেন একতা এই ছবিতে সহ-পরিচালক হিসেবে কাজ করুক। কিন্তু একতা সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। তবুও ছবির পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রভাত রায়ের কথায়, “আমার খুব ইচ্ছে ছিল একতা সহ-পরিচালক হিসেবে থাকুক। কিন্তু ও রাজি হয়নি। বয়স এবং স্বাস্থ্যের কথা ভেবে এটিকে পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি না করে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি হিসেবেই বানাচ্ছি।”
দীর্ঘ সময় পর কাজে ফেরা নিয়ে তিনি যেমন আবেগাপ্লুত, তেমনই বাস্তববাদীও। বয়সের কথা মাথায় রেখে এই ছবিটিকেই হয়তো নিজের শেষ কাজ বলেও মনে করছেন তিনি।
এই প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন,
“সম্ভবত এটাই আমার শেষ কাজ। তাই নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে চাই। এটাই আমার কাছে জীবনের সেরা জন্মদিনের উপহার।”
এই ছবির কাজের মধ্যে পুরানো অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও পাচ্ছেন প্রভাত রায়। ইন্ডাস্ট্রিতে এই সময়ে অনেক নতুন অভিনেতা এবং টেকনিশিয়ান এসেছেন, যাঁদের অনেকের সঙ্গেই আগে তাঁর পরিচয় ছিল না।
এই প্রসঙ্গে তিনি জানান,
“নতুনদের অনেকের সঙ্গেই আমার আগে আলাপ ছিল না। একতাই আমাকে তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। তাঁদের সঙ্গে কাজ করার জন্য আমি মুখিয়ে আছি।”
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক এবং এক প্রবীণ পরিচালকের আবেগ এই তিনের মেলবন্ধনে তৈরি হচ্ছে ‘বলাই’। এখন দেখার বিষয়, এই ছবিটি দর্শকের হৃদয়ে কতটা জায়গা করে নিতে পারে। সেই উত্তর অবশ্যই মিলবে ছবির কাজ শেষ হওয়ার পর।