Alka Yagnik:ভালোবাসা যে সব নিয়ম ভে’ঙে নিজের পথ তৈরি করতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ বলিউডের জনপ্রিয় প্লেব্যাক গায়িকা অলকা ইয়াগনিক। গানের জগতে যেমন তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য অমলিন, তেমনই অনাড়ম্বর অথচ দৃঢ় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। যেখানে বিনোদন দুনিয়ায় সম্পর্ক ভাঙাগড়ার খবর প্রায় নিত্যদিনের শিরোনাম, সেখানে অলকা ইয়াগনিক টানা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকিয়ে রেখেছেন এক ব্যতিক্রমী দাম্পত্য লং ডিসট্যান্স ম্যারেজ।
অলকা ইয়াগনিক মানেই নব্বইয়ের দশকের অগণিত সুপারহিট গান। ২৫টি ভাষায় ২০ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেছেন তিনি। সাতবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভারতীয় সংগীত জগতের অন্যতম সেরা মহিলা কণ্ঠশিল্পী হিসেবে। তবে ক্যামেরার ঝলকানির বাইরে তাঁর জীবনের প্রেমকাহিনি কোনও সিনেমার গল্পের থেকে কম রোমাঞ্চকর নয়।
অলকার জীবনসঙ্গী নীরজ কাপুর পেশায় একজন ব্যবসায়ী, যিনি শিলংয়ের বাসিন্দা। গায়কী আর গ্ল্যামারের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক জগতের মানুষ নীরজ। তাঁদের পরিচয়ের শুরুটা হয়েছিল একেবারেই সাধারণভাবে একটি ট্রেন যাত্রায়। সহযাত্রী হিসেবে আলাপ, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, আর সেই বন্ধুত্বই একসময় প্রেমে পরিণত হয়। ভিন্ন পেশা, ভিন্ন জীবনধারা সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে একে অপরকে জানার আগ্রহ থেকেই শুরু হয় তাঁদের ডেটিং।
দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পর্কের পর ১৯৮৯ সালে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন অলকা ও নীরজ। তবে এই বিয়ে নিয়ে প্রথম থেকেই গায়িকার পরিবারের মধ্যে সংশয় ছিল। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, দূরত্ব আর আলাদা শহরে থাকা ভবিষ্যতে এই সম্পর্কে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবু সমস্ত বাধা অতিক্রম করে চার হাত এক হয় দু’জনের।
বিয়ের পর নীরজ কাপুর মুম্বইয়ে এসে ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করেন। উদ্দেশ্য ছিল স্ত্রীর কাছাকাছি থাকা। কিন্তু মহানগরের বাস্তবতা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। ব্যবসায় বড় অঙ্কের ক্ষ’তি’র মুখে পড়তে হয় তাঁকে। এক পুরানো সাক্ষাৎকারে অলকা নিজেই জানিয়েছিলেন, মুম্বইয়ে এসে নীরজ আ’র্থি’ক প্র’তা’র’ণা’র শি’কা’র হন। ছোটো শহরের সরল মানুষ হিসেবে বড় শহরের কৌশলী দুনিয়ায় তিনি মানিয়ে নিতে পারেননি।
সেই সময়ই অলকা এক কঠিন কিন্তু বাস্তব সিদ্ধান্ত নেন। স্বামীর ভালোর কথা ভেবে তিনিই নীরজকে শিলং ফিরে গিয়ে সেখানেই নিজের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এই সিদ্ধান্ত তাঁদের দাম্পত্যে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। দূরত্ব বাড়ে, দেখা-সাক্ষাৎ কমতে থাকে। এমন এক সময়ও আসে, যখন চার-পাঁচ বছর পর্যন্ত তাঁরা প্রায় যোগাযোগই বন্ধ করে দেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দু’জনেই উপলব্ধি করেন, দূরত্ব যতই থাকুক, একে অপরকে ছাড়া তাঁদের জীবন অসম্পূর্ণ। সেই উপলব্ধিই আবার কাছাকাছি নিয়ে আসে তাঁদের মনকে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, অলকা থাকবেন মুম্বইয়ে নিজের গানের কেরিয়ার নিয়ে, আর নীরজ শিলংয়ে সামলাবেন ব্য’ব’সা। শা’রী’রি’ক দূরত্ব মেনেও মা’ন’সি’ক বন্ধন অটুট রাখার এই সমঝোতাই তাঁদের স’ম্প’র্কে’র ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
আজ প্রায় ৩৪ – ৩৫ বছর ধরে অলকা ইয়াগনিক ও নীরজ কাপুর এক লং ডিসট্যান্স বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন। তাঁদের সংসারে রয়েছে এক কন্যা সাইশা কাপুর। সাইশার বিয়ে হয়েছে অমিত দেশাইয়ের সঙ্গে। পরিবার, কাজ আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রেখেই এগিয়ে চলেছেন অলকা।
এই দম্পতির গল্প প্রমাণ করে, ভালোবাসা মানে সবসময় এক ছাদের নীচে থাকা নয়। বোঝাপড়া, বিশ্বাস আর সম্মান থাকলে দূরত্বও সম্পর্ককে দুর্বল করতে পারে না। অলকা ইয়াগনিক ও নীরজ কাপুরের জীবন তাই আজকের প্রজন্মের কাছে নিঃসন্দেহে এক অনুপ্রেরণার গল্প।