ভারতীয় চলচ্চিত্রের শতবর্ষ পেরোনো যাত্রাপথে আমরা সাধারণত যাঁদের নাম মনে রাখি, তাঁরা বেশিরভাগই পর্দার সামনে থাকা মানুষ অভিনেতা, নায়ক-নায়িকা, সুপারস্টার। কাপুর পরিবার, মধুবালা (Madhubala), মীনা কুমারী(Meena Kumari), দিলীপ কুমার(Dilip Kumar), রাজেশ খান্না (Rajesh Khanna) কিংবা অমিতাভ বচ্চন (Amitabh Bachchan) এর মতো নামগুলো আমাদের স্মৃতিতে গাঁথা। অথচ এই রূপালি জগতের ভিত গড়ে তুলেছেন যাঁরা, গল্প ও সংলাপে প্রাণ সঞ্চার করেছেন যাঁরা, তাঁদের কথা প্রায়শই আড়ালেই থেকে যায়। সেই আড়ালের মানুষদের অন্যতম এবং সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম হল জাভেদ আখতার (Javed Akhtar)।
১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া জাভেদ আখতার খুব অল্প বয়সেই বড় স্বপ্ন নিয়ে মুম্বইয়ে পা রেখেছিলেন। মাত্র উনিশ বছর বয়সে তাঁর লক্ষ্য ছিল কিংবদন্তি পরিচালক গুরু দত্তের সহকারী হিসেবে কাজ করা। কিন্তু ভাগ্য যেন প্রথম ধাক্কাতেই তাঁকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। মুম্বইয়ে আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই গুরু দত্তের মৃ’ত্যু হয়। এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে সেই স্বপ্ন, যার ভরসায় তিনি শহরে এসেছিলেন। তবুও এই ব্যর্থতা তাঁকে থামাতে পারেনি।
কবি জান নিসার আখতারের পুত্র হিসেবে জাভেদের বেড়ে ওঠা ছিল সাহিত্য আর কবিতার আবহে। শব্দের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল জন্মগত। কিন্তু প্রতিভা থাকলেই তো জীবন চলে না বেঁচে থাকার প্রয়োজনে তাঁকে কাজ খুঁজতেই হতো। সেই তাগিদেই তিনি কাজ নেন পরিচালক কামাল আমরোহির কাছে। মাসিক বেতন মাত্র ৫০ টাকা। প্রায় এক বছর তিনি সেখানে কাজ করেন। এই সময়েই একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের জন্য ঘোস্টরাইটার হওয়ার সুযোগ আসে তাঁর সামনে। অর্থের দিক থেকে প্রস্তাবটি আকর্ষণীয় হলেও জাভেদ তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তাঁর কাছে নিজের নাম, নিজের পরিচয় ছিল টাকার চেয়েও বড়।
সংগ্রামের সেই অধ্যায় ছিল চরম কষ্টের। থাকার জায়গা না থাকায় কখনও রেলস্টেশনের মেঝে, কখনও পার্কের বেঞ্চ, কখনও স্টুডিওর করিডোর। এই ছিল তাঁর রাত কাটানোর ঠিকানা। পকেটে টাকা না থাকায় বহুবার দাদর থেকে বান্দ্রা পর্যন্ত হেঁটে যেতে হয়েছে। ক্ষুধা, অপমান আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে কেটেছে দিন। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে ভাঙেনি বরং ভেতরে ভেতরে আরও শক্ত করে তুলেছিল।
জীবনের মোড় ঘোরে যখন পরিচালক এস এম সাগর তাঁকে সহকারী হিসেবে নিয়োগ করেন। একটি ছবিতে সংলাপ লেখকের প্রয়োজন পড়লে, মাঝপথে সেই দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়। তখনই সুযোগ আসে জাভেদের হাতে। এই ছবির কাজের মধ্যেই তাঁর আলাপ হয় অভিনেতা সেলিম খানের সঙ্গে। ছবিটি বক্স অফিসে ব্যর্থ হলেও, এই পরিচয়ই ভবিষ্যতে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস বদলে দেয়।
এরপর জন্ম নেয় বিখ্যাত লেখক জুটি সেলিম-জাভেদ। শুরুতে সাফল্য এলেও তাঁদের অবদান প্রাপ্য স্বীকৃতি পায়নি। তবুও তাঁরা হাল ছাড়েননি। অবশেষে ‘জঞ্জির’(Zanjeer) ছবির মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের শর্তে কাজ করার সুযোগ পান। সেই ছবির জন্য তাঁরা জোর দিয়ে অমিতাভ বচ্চনকে নায়ক হিসেবে বেছে নেন একটি সিদ্ধান্ত, যা শুধু একটি অভিনেতার কেরিয়ার নয়, গোটা হিন্দি সিনেমার ধারা বদলে দেয়। জন্ম নেয় ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ (Angry Young Men) চরিত্র, আর লেখকরাও পেতে শুরু করেন তাঁদের প্রাপ্য সম্মান।
আরও পড়ুন:Alka Yagnik:এক ছাদের নীচে না থেকেও ৩৫ বছর! তবু কীভাবে টিকে আছে অলকা ইয়াগনিকের সংসার?
জাভেদ আখতার তাই শুধু একজন সফল চিত্রনাট্যকার বা সংলাপ লেখক নন। তিনি একটি দৃষ্টান্ত, একটি আন্দোলনের প্রতীক। তিনি প্রমাণ করেছিলেন সিনেমা শুধু মুখের সৌন্দর্য বা তারকাখ্যাতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে না; গল্পকারের কলমও সমান শক্তিশালী। রেলস্টেশনের মেঝে থেকে রূপালি পর্দার ইতিহাস গড়া এই যাত্রাই জাভেদ আখতারকে অনন্য করে তোলে।