Gaurav Chakrabarty:”বাড়ি সামলানো কি শুধু মেয়ের দায়িত্ব?”…. সমাজের এই গোঁড়ামি মানতে নারাজ গৌরব চক্রবর্তী, সমাজকে আয়না দেখালেন অভিনেতা

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
Instagram Group Join Now

জনপ্রিয় অভিনেতা গৌরব চক্রবর্তী (Gaurav Chakrabarty) সম্প্রতি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তাঁর অভিনয় দর্শন, ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সমাজে বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্য এবং দীর্ঘ ক্যারিয়ার জুড়ে পাওয়া অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। তাঁর কথায় উঠে এসেছে একদিকে অভিনয়ের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে একজন স্বামী ও পিতা হিসেবে সমাজের প্রচলিত মানসিকতার বি’রু’দ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহসী স্বর।

অভিনয়ের পদ্ধতি প্রসঙ্গে গৌরব স্পষ্ট করে জানান, তিনি পূর্বপরিকল্পিত প্রস্তুতির চেয়ে নিজের সহজাত প্রবৃত্তি বা ‘ইনস্টিংটিভ’ অভিনয়ের ওপরই বেশি ভরসা করেন। তাঁর কথায়, “আমি খুব ইনস্টিংটিভ অভিনেতা। আমি তো চরিত্রটা হয়ে থাকি না, তাই চরিত্রের ছাপ পড়ার কথা নয়। কিন্তু পরে আমি বুঝতে পারি যে চরিত্রের একটা রেশ থেকে গেছে।” এই বক্তব্যে বোঝা যায়, অভিনয়ের সময় তিনি চরিত্রের মধ্যে সম্পূর্ণ ডুবে গেলেও কাজ শেষ হলে ধীরে ধীরে সেই চরিত্রের প্রভাব উপলব্ধি করেন।

তবে অভিনয়ের বাইরেও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ পরিবার। স্ত্রী ঋদ্ধিমা ও সন্তান ধীরকে ঘিরেই তাঁর পৃথিবী একথা অকপটে স্বীকার করেন গৌরব। তিনি বলেন, “দিস ইজ দ্য ওয়ার্ল্ড ফর মি… আমার বউ, আমার বাচ্চা। আমার কাছে পরিবারের গুরুত্ব ভীষণ, ভীষণই আমার জীবনের সিংহ ভাগ নিয়ে রেখেছে।” তাঁর কথায় পরিবার কেবল আবেগ নয়, বরং জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।

আরও পড়ুন:Devaamoy Mukherjee:সন্তানের জ’ন্মে’র পর জীবন পরিবর্তন থেকে আত্মবিশ্বাসে ভাঁটা, কাজ না পাওয়া আর ইন্ডাস্ট্রির নীরবতা নিয়ে অকপট দেবময় মুখার্জী

প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার কথাও উঠে আসে এই সাক্ষাৎকারে। বিশেষ করে জঙ্গলের প্রতি এক অদ্ভুত টান অনুভব করেন তিনি। গৌরবের ভাষায়, “জঙ্গলটা যে ম্যাজিক… এই ভালোবাসার জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী আমার বাবা-মা।” শৈশব থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর যে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তার পেছনে বাবা-মায়ের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

এই সাক্ষাৎকারের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য নিয়ে তাঁর ক্ষো’ভ ও প্রশ্ন। গৌরব জানান, বাবা হওয়ার পর তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে কেউ কোনো সংশয় প্রকাশ করেনি। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ঋদ্ধিমার ক্ষেত্রে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, “আমাকে কেউ কিন্তু ধীর জন্মানোর পর এসে জিজ্ঞেস করেনি যে তুমি কি আবার কাজ করা শুরু করেছ? নাকি তুমি বাড়িতেই সময় দিচ্ছ?”

অন্যদিকে ঋদ্ধিমা (Ridhima Ghosh)-র ক্ষেত্রে সমাজের প্রশ্নের শেষ নেই। ধীরের বয়স প্রায় দু’বছর হয়ে গেলেও এখনও তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি কবে কাজে ফিরবেন বা আদৌ ফিরতে চান কি না। গৌরবের কথায়, “এখন ধীরের প্রায় দু’বছর বয়স হয়ে গেল, এখনও লোকে জিজ্ঞেস করে—তুমি কি কাজে ফিরছ? তুমি কি কাজে ফিরেছ? তুমি কি আবার কাজ করতে চাও?” এই প্রশ্নগুলো সমাজের গভীরে প্রোথিত লিঙ্গবৈষম্যের দিকটিই স্পষ্ট করে।

আরও পড়ুন:Tanmay Majumdar:‘সন্তু’ হয়ে দর্শকের হৃদয়ে তন্ময় মজুমদার, জীবনের কঠিন বাস্তবতার কথা জানালেন অভিনেতা

নিজের পিতৃত্বকালীন ছুটি বা প্যাটার্নিটি লিভ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও তাঁকে সমাজের অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়েছিল। তিনি স্মরণ করেন, “যখন শুনেছে আমি প্যাটার্নিটি লিভ নিয়েছিলাম ধীর জন্মানোর আগে, তাতে চমকে গেল কিছু লোক।” একজন বাবার সন্তানের জন্মের সময় পাশে থাকা যেন আজও অনেকের কাছে অস্বাভাবিক বলেই ধরা পড়ে এই বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই গৌরব প্রশ্ন তোলেন, কেন ঘরের দায়িত্ব কেবল নারীদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “এই অসমতাটা কেন? বাড়ি সামলানো, ছেলে সামলানো কি শুধুমাত্র মেয়ের দায়িত্ব? আমার তো সেটা মনে হয় না।”
তিনি বলিউডের অভিনেত্রীদের উদাহরণ টেনে বলেন, কাজ থেকে বিরতি নিলেই সেটিকে ‘হারিয়ে যাওয়া’ বলা যায় না। তাঁর কথায়, “বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির হিরোইনরা অনেক কথা বলেছেন কেন, ‘কামব্যাক’ কেন হতে হবে? I was never gone!”

এই বৈষম্যমূলক মানসিকতা গৌরবকে ব্যক্তিগতভাবে খুব আঘাত করেছে। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, “আমার এই অসমতাটা খুব গায়ে লেগেছে এবং I find it very demeaning, very weird. এটা কাম্য নয়।” তাঁর মতে, সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো অত্যন্ত জরুরি।

ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি তাঁর পছন্দ-অপছন্দও উঠে এসেছে সাক্ষাৎকারে। বলিউডের মেগাস্টার অমিতাভ বচ্চনের একনিষ্ঠ ভক্ত গৌরব নিজেই বলেন, “আমি বোধ হয় মিস্টার বচ্চনের বিগেস্ট ফ্যান। মানে আমি একদম পাগল।”

নিজের বাবা, বর্ষীয়ান অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী (Sabyasachi Chakrabarty ) এবং ফেলুদা (Feluda) চরিত্রটি নিয়ে তাঁর আবেগও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গৌরবের কথায়, “ফেলুদার পাশে দাঁড়িয়ে আছি, এটা যে কত বড় পাওয়া! বাবা আমাদের জেনারেশনের ফেলুদা। আমি ঠিক ততটাই আপ্লুত হই, যতটা দর্শক হন।”
দর্শক হিসেবে ফেলুদাকে দেখার অভিজ্ঞতা এবং একজন অভিনেতার সন্তান হিসেবে সেই চরিত্রের পাশে দাঁড়ানোর অনুভূতি দু’টিই তাঁর কাছে সমান আবেগঘন।

আরও পড়ুন:Maitreyee Mitra:”এই অবস্থাটা সকলের সামনে আনাটা কি খুব দরকার ছিল? আদৌও কি স্যান্ডির ভালো হবে? যিনি করেছেন বিষয়টা সম্পূর্ণ তাঁর উপর…” ফেসবুকে স্যান্ডিকে নিয়ে পোস্ট করায় লাগাতার কটাক্ষের মুখে মৈত্রেয়ী মিত্র,পরোক্ষভাবে কার দিকে আঙ্গুল তুললেন অভিনেত্রী?

তবে তারকা-সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ক্যারিয়ারের পথে কোনো শর্টকাট যে পাননি, সেটাও পরিষ্কার করে দেন গৌরব। তাঁর বাবা প্রথম থেকেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি কোনোভাবেই তাঁকে ‘লঞ্চ’ করবেন না। গৌরব বলেন, “বাবা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছিলেন আমি কিন্তু তোমাকে লঞ্চ করব না, তোমার জায়গা করে দেব না। যা করবে নিজে করবে। ভুল করলে তোমার দোষ, ঠিক করলে তোমার কৃতিত্ব।”

নিজের স্টারডম থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি এতটা বিনয়ী তাঁর ব্যাখ্যায় গৌরব তুলে ধরেন সাধারণ মানুষের সংগ্রামের কথা। তিনি বলেন, “অনেক ছেলে অনেক কষ্ট করে এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে। প্রায় খাওয়ার মতো টাকা নেই এই জায়গা থেকে এসে they have made big names for themselves। সেই তুলনায় আমার বিশেষ সুবিধা আছে। সেই জায়গা থেকে আমার মধ্যে যদি ঔদ্ধত্য আসে, তবে সেটা হবে অসভ্যতার পরিচয়।”

গৌরবের লক্ষ্য শুরু থেকেই ছিল একজন ‘ভার্সেটাইল অভিনেতা’ হওয়া, কেবল একজন ‘স্টার’ নয়। তাঁর কথায়, “আমার প্রথম থেকেই ইচ্ছে ছিল আমি একজন ভার্সেটাইল অভিনেতা হব।” তিনি মনোজ বাজপেয়ীর একটি উক্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত স্টার হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, কিন্তু ভালো অভিনেতা হওয়া সম্ভব পরিশ্রম ও বুদ্ধিকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে।

তাই তিনি চেয়েছিলেন মানুষের মুখে শুনতে “গৌরব চক্রবর্তী ভালো অভিনয় করেন।” নিজের ক্যারিয়ারকে কখনও খুব বেশি ‘কিউরেট’ করে সাজিয়ে নেননি তিনি। সবসময় মেইন লিড বা নায়ক চরিত্রেই অভিনয় করতে হবে এমন কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম মানেননি।

তাঁর প্রথম সিরিয়াল ‘গানের ওপারে’ (Ganner Opare)এবং চরিত্র ‘প্রদীপ্ত লাহিড়ী’ বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেই সময় তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি যেন একজন ‘পরম আবিদ’ বা অত্যন্ত পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। কিন্তু পরে তিনি উপলব্ধি করেন, সেটি ছিল সাময়িক সাফল্য বা এক ধরনের ভ্রম।

এই ইতিবাচক চরিত্রের পরই প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের (Prosenjit chattopadhyay) প্রোডাকশন থেকে তিনি একটি নেতিবাচক বা ভিলেন চরিত্রের প্রস্তাব পান। চ্যানেলের তরফে দ্বিধা থাকলেও গৌরব সেই চ্যালেঞ্জ আনন্দের সঙ্গেই গ্রহণ করেন।

পরবর্তী সময়ে ‘অদ্বিতীয়া’ সিরিয়ালে অভিনয় শুরু করলে দর্শকদের কাছ থেকে শুরুতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পান তিনি। গৌরব জানান, “দর্শকরা মনে করেছিলেন যে প্রদীপ্ত লাহিড়ী এত খারাপ মানুষ হতে পারে না।” এখান থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন, “সিরিয়ালের জনপ্রিয়তা সবসময় তোমার চরিত্রের জনপ্রিয়তা, অভিনেতা মানুষটার জনপ্রিয়তা নয়।”

আরও পড়ুন:Saheb-Susmita:হাতে হাত রেখে পার্টিতে সাহেব- সুস্মিতা! মিলল পোশাকের রংও, অনুরাগীদের দাবি ‘যেন নজর না লাগে!…’ বিয়ের গুঞ্জন হতে চলেছে সত্যি?

সোশ্যাল মিডিয়ার শুরুর দিকেই পাওয়া নেতিবাচক মন্তব্য তাঁকে মা’ন’সি’ক’ভা’বে ভে’ঙে দিয়েছিল। তিনি বলেন, “এটা ছিল হা’র্ট ব্রে’কিং। আমার ম’ন খা’রা’প হয়ে যায়, ডি’প্রে’শ’ন হয়ে যায়, আমি প্রায় কা’ন্না’কা’টি লেভেলে চলে যাই যে আমি কি এত খা’রা’প অভিনেতা যে মানুষ আমাকে নিচ্ছেই না?”

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাজের মান উন্নত হয় এবং দর্শকরা ‘রবিকিরণ চৌধুরী’ চরিত্রটিকে ভালোবাসতে শুরু করেন। গৌরবের কথায়, “করতে করতে দর্শকের মধ্যে একটা দারুণ ভালোবাসা তৈরি হয় রবিকিরণ চৌধুরীর জন্যে।”

আরও পড়ুন:Sayak Chakraborty:স্কুল জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করলেন সায়ক

এই অভিজ্ঞতা থেকেই জীবনের একটি বড় শিক্ষা পেয়েছেন তিনি নিজের কাজ মন দিয়ে করে যেতে হবে, ফলের আশা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। তাঁর স্পষ্ট উপলব্ধি, “লোকে কি বলছে ওটা ভেবো না, তুমি নিজের কাজটা মন দিয়ে করো।”

গৌরব চক্রবর্তীর এই সাক্ষাৎকার কেবল একজন অভিনেতার জীবনের গল্প নয়, বরং সমাজের প্রচলিত মা’ন’সি’ক’তা, লি’ঙ্গ’বৈষম্য এবং দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্নে নতুন করে ভাবার আহ্বান।

Leave a Comment