Aritra-Koel:বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ কোয়েল মল্লিক(Koel Mallick)-এর রাজনীতিতে আসা এবং তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে রাজ্যসভার প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম উঠে আসার সম্ভাবনা ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। অভিনেত্রী হিসেবে দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জন্য তিনি দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত। কিন্তু যখন একজন তারকা সরাসরি রাজনীতির ময়দানে নামেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন, বিতর্ক এবং প্রত্যাশা সামনে চলে আসে। এই প্রেক্ষাপটেই এক সাক্ষাৎকারে নিজের মতামত জানিয়েছেন অভিনেতা ও বিশ্লেষক অরিত্র দত্ত বণিক(Aritra Dutta Banik)। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে রাজনীতি ও বিনোদন জগতের সম্পর্ক, তারকাদের রাজনৈতিক ভূমিকা, দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, সময় ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ এবং বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির নানা দিক।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই অরিত্র দত্ত বণিক স্পষ্ট করে দেন যে তিনি কোয়েল মল্লিকের অভিনয়জীবন এবং তাঁর সম্ভাব্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে একসঙ্গে দেখতে চান না। তাঁর মতে, একজন শিল্পীর পেশাগত দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে একই কাঠামোর মধ্যে বিচার করা ঠিক নয়। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ইন্ডাস্ট্রির সাথে আমি তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে এক করে দেখতে চাই না… রাজনীতি একটা আলাদা ফিল্ড অফ অপারেশন।” অর্থাৎ, চলচ্চিত্র এবং রাজনীতি দুটি ক্ষেত্রের কাজের ধরন, দায়বদ্ধতা এবং উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা।
অরিত্রের মতে, কোয়েল মল্লিক একজন অভিনেত্রী হিসেবে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাংলা সিনেমায় নিজের অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে একটি বিশেষ জায়গা তৈরি করেছেন। তাই তাঁর অভিনয়জীবনের মূল্যায়ন কখনোই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের উপর নির্ভর করা উচিত নয়। তবে রাজনীতিতে প্রবেশ করলে সেই নতুন ভূমিকায় তাঁকে ভিন্ন ধরনের প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হবে এ কথাও তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন।
রাজনীতির কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অরিত্র দত্ত বণিক রাজ্যসভা এবং অন্যান্য নির্বাচিত রাজনৈতিক মঞ্চের মধ্যে পার্থক্যের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, রাজ্যসভায় কাজ করার ধরন বিধানসভা বা লোকসভার তুলনায় অনেকটাই আলাদা। তিনি বলেন, “রাজ্যসভার রাজনীতি এবং বিধানসভা বা লোকসভার রাজনীতি সম্পূর্ণ আলাদা… এখানে যে পাওয়ার জোনটায় তিনি কাজ করবেন সেটা গ্রাসরুট লেভেল নয়।” অর্থাৎ, রাজ্যসভার সদস্যরা মূলত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেন, যেখানে সরাসরি মাঠপর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে সবসময় যুক্ত থাকতে হয় না।
তবে রাজনীতিতে যোগ দেওয়া যে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, সে বিষয়েও তিনি স্পষ্ট অবস্থান নেন। কোয়েল মল্লিক কোন রাজনৈতিক দলে যোগ দেবেন বা রাজনীতিতে আসবেন কি না, সেটি সম্পূর্ণ তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তিও জড়িয়ে থাকে। এই প্রসঙ্গে অরিত্র বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে যে দলে তিনি যোগ দিয়েছেন, সেই দলকে যে কাঁটাগুলো বিদ্ধ করেছে মূলত মানুষের দুর্নীতির বোঝা… সেই জায়গাগুলোর বড় দায়ভার কিন্তু তাদের ওপরও বর্তে আসে।”
অর্থাৎ, কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হলে সেই দলের অতীত বিতর্ক বা অভিযোগ থেকেও পুরোপুরি দূরে থাকা সম্ভব হয় না। ফলে একজন নতুন মুখ যখন সেই দলে যোগ দেন, তখন মানুষের একাংশ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলতে পারেন।
তবে সমালোচনার পাশাপাশি তিনি ইতিবাচক সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন। অরিত্র দত্ত বণিকের মতে, কোয়েল মল্লিক যদি রাজ্যসভায় গিয়ে বাংলার নারীদের অধিকার, সামাজিক সমস্যার সমাধান বা প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারেন, তাহলে তা সমাজের জন্য ভালো হবে। তাঁর কথায়, “তিনি যদি একটা গুরুত্বপূর্ণ রিফর্মেশনের (পুনর্গঠন) পার্ট প্লে করেন, সেটা অবশ্যই একটা ভালো পদক্ষেপ… তিনি রাজ্যসভায় গিয়ে বাংলার মহিলাদের কথা যদি তুলে ধরেন।”
এই প্রসঙ্গে তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলেছেন রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব কি সত্যিই সমাজের সব স্তর থেকে আসছে? তাঁর মতে, অনেক সময় দেখা যায় রাজনৈতিক দলগুলি সেই নারীদের সামনে নিয়ে আসে যারা ইতিমধ্যেই সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত বা শিক্ষিত স্তরের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, “তৃণমূল কংগ্রেস সেই সমস্ত মেয়েদেরই এগিয়ে দিয়েছেন যারা সমাজের ক্রিমি লেয়ারে আছেন… প্রশ্নটা থেকে যাবে যে কন্যাশ্রী বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাওয়া গ্রাসরুট লেভেলের মেয়েরা কতটা নিজেদের সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে প্রতিভাত করতে পারছে।”
অরিত্রের মতে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া জরুরি। কারণ প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন সমাজের সব স্তরের নারীরা সমানভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারবেন।
সাক্ষাৎকারে তিনি বিনোদন জগতের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, দক্ষিণ ভারত বা মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগতে রাজনীতি এবং সিনেমার সংযোগ অনেকদিন ধরেই দেখা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতেও এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
এই পরিবর্তনের ফলে দর্শকদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যাচ্ছে বলে মনে করেন অরিত্র। তিনি বলেন, “মানুষের চোখের সামনে একটা লেন্স পড়ে যাবে যে, আরে এতো সেই মানুষ যে কিনা দুর্নীতির স্বপক্ষে সওয়াল করছেন।” আগে দর্শকরা শিল্পীদের মূলত তাদের অভিনয়ের জন্যই দেখতেন, কিন্তু এখন তাদের রাজনৈতিক অবস্থানও দর্শকদের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রসঙ্গে তিনি অভিনেতা দেব(Dev)-এর উদাহরণ টেনে বলেন যে, একজন তারকার দুই পরিচয় একদিকে অভিনেতা এবং অন্যদিকে রাজনীতিবিদ অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। তাঁর কথায়, “দীপক অধিকারী অ্যাজ অ্যান এমপি(MP) আর দেব অ্যাজ এ হিরো এই দুটো পরিচয় একটা আরেকটার সাথে জুড়ে যাচ্ছে।”
চলচ্চিত্র জগত যে মূলত একটি বাজারভিত্তিক ক্ষেত্র, সেটিও তিনি মনে করিয়ে দেন। এখানে দর্শকই ক্রেতা, আর সিনেমা হলো সেই পণ্যের মতো যা দর্শক কিনে দেখেন। তাই দর্শক এবং শিল্পীর মধ্যে যদি কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়, তবে তার প্রভাব চলচ্চিত্র ব্যবসার উপরও পড়তে পারে। তিনি বলেন, “ক্রেতার সাথে যদি আমার একটা সামাজিক দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়, তবে অবশ্যই সেটা বাজারে খানিকটা তো ইমপ্যাক্ট ফেলবেই।”
তবে রাজনীতির ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছেন অরিত্র দত্ত বণিক। তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়া বা টেলিভিশনে বসে সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত। তিনি বলেন, “ভুলটা শুধরে দেওয়ার ক্ষমতাটা কিন্তু রাজনীতিবিদদের কাছে সাংবিধানিকভাবে আছে।”
অর্থাৎ, যদি কোনো শিল্পী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষের অধিকারের জন্য কাজ করেন, তাহলে তা সমাজের জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
তারকাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে সময় ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, রাজনীতি একটি পূর্ণকালীন দায়িত্ব। একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে সাধারণ মানুষ সবসময় প্রত্যাশা করেন যে প্রয়োজনের সময় তাঁকে পাওয়া যাবে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “টাইম ম্যানেজমেন্ট… পলিটিক্স একটা ফুল টাইম ইনভলবমেন্ট।”
তিনি আরও বলেন, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে মানুষ জানতে চান তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধি তাঁদের প্রয়োজনের সময় পাশে আছেন কি না। তাঁর ভাষায়, “আমি আমার বিধায়ককে বা আমার কাউন্সিলরকে বা আমার এম্পিকে আমার প্রয়োজনে পাচ্ছি কি না… সেই অ্যাভেলেবিলিটিটা আছে কি না সেটা দেখাটা খুব জরুরি।”
অরিত্র দত্ত বণিক যেকোনো পেশা থেকে রাজনীতিতে আসাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন যে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কখনোই আপস করা উচিত নয়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “যেটাই করছেন সেটা আপনারা আপনাদের ১০০% দিয়ে সেই চেয়ারের মর্যাদা রেখে যদি করতে পারেন আমার তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু হাফ-ডান যে কাজগুলো হয় তাতে আমার সবসময় আপত্তি থাকে।”
এই প্রসঙ্গে তিনি একটি উদাহরণও দেন। ধরুন কোনো শিক্ষক রাজনীতিতে এলেন, কিন্তু তার ফলে স্কুলে পড়ানো বন্ধ হয়ে গেল তাহলে সেটি সমস্যার সৃষ্টি করবে। তাঁর কথায়, “এমন কোনো মানুষ টিচার যিনি রাজনীতিতে এলেন, ওদিকে স্কুল বন্ধ হয়ে গেল… তিনি আর স্কুলে পড়াতে যেতে পারেন না… এটা হলো গণ্ডগোল।”
সাক্ষাৎকারে তিনি সেলিব্রিটি সাংসদদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, অনেক সময় দেখা যায় জনপ্রিয় তারকা সাংসদরা সংসদে খুব কম উপস্থিত থাকেন বা জনস্বার্থে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন না। অনেক সেলিব্রিটি এমপি পার্লামেন্টে যান না, কোনো প্রশ্ন করেন না বা প্রাইভেট বিল টেবিল করেন না। আম আদমি পার্টি(AAP)-র সাংসদ রাঘব চাড্ডা(Raghav Chadha)-র দৃষ্টান্ত টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন , “আমরা কেন বাংলা থেকে আর একজন চাড্ডাকে প্রডিউস করতে পারছি না?” দীপক অধিকারী (দেব), রচনা ব্যানার্জী(Rachana Banerjee) বা জুন মালিয়া((June Maliah)-র মতো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন তাঁরা যেন রাজনীতিতে ‘ফুল টাইম’ সময় দেন এবং নিজেদের ১০০ শতাংশ উজাড় করে কাজ করেন।
সবশেষে কোয়েল মল্লিকের সম্ভাব্য রাজনৈতিক যাত্রা নিয়ে ব্যক্তিগত মন্তব্য করতে গিয়ে অরিত্র বলেন যে রাজনীতিতে প্রবেশ করার সময় তিনি নিশ্চয়ই জানেন সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তাঁর কথায়, “আমার মনে হয় যে রাজনীতির ময়দানে কোয়েল মল্লিক সেটা জেনেই এসেছেন যে তাঁর পিঠে ছুরি মারার জন্য এক হাজারটা ছুরি অলরেডি তৈরি হয়ে আছে।”
তবুও তিনি কোয়েলের ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চলচ্চিত্র জগতে একটি পরিষ্কার এবং সম্মানজনক ভাবমূর্তি বজায় রেখেছেন বলে অরিত্রের বিশ্বাস। তাঁর কথায়, “আমি বিশ্বাস করি যে তিনি ব্যক্তিগত জীবনে যথেষ্ট ডিগনিটির সাথে কাজ করেছেন, ফিল্মে যথেষ্ট ডিগনিটির সাথে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেছেন এত বছর ধরে।”
এই কারণেই অনেকেই আশা করছেন যে অভিনয়ের মতো রাজনীতির ক্ষেত্রেও তিনি দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। অরিত্র দত্ত বণিকের ভাষায়, “রাজনীতির ময়দানে অন্তত তিনি এই দায়িত্বটা নিতে পারবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।বাকিটা সময় বলবে।”