Arun Banerjee:“বিয়ে মানে দাসী আনা? “আজ থেকে তুমি আমার গোত্রের নও..কন্যাদান মানে মেয়েকে দান” সাথে “…শিক্ষা ডিপার্টমেন্টেও ঘুষ !” – সমাজের রীতি ও দুর্নীতিতে একসাথে বিস্ফোরক অরুণ ব্যানার্জী

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
Instagram Group Join Now

Arun Banerjee: বাংলা থিয়েটার ও চলচ্চিত্র জগতের বর্ষীয়ান অভিনেতা অরুণ ব্যানার্জী(Arun Banerjee )এক সাক্ষাৎকারে সমাজের বহু প্রচলিত প্রথা ও নৈতিকতার প্রশ্নে অত্যন্ত সরাসরি এবং তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে বাঙালি বিয়ের বেশ কিছু বহুল প্রচলিত রীতিনীতি নিয়ে তাঁর ব্যঙ্গ, শ্লেষ এবং সমালোচনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বর্তমান সমাজে বাড়তে থাকা দুর্নীতি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট অভিনেতা অরুণ ব্যানার্জীর বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সমাজে গেঁথে থাকা কিছু পুরনো ধারণা, যা এখনও অবচেতনভাবে মানুষের আচরণে ও রীতিনীতিতে প্রতিফলিত হয়।

বাঙালি সমাজে বিয়ের সময় ছেলের একটি বহুল প্রচলিত কথাকে সামনে এনে প্রথমেই কড়া ব্যঙ্গ করেছেন অভিনেতা। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে মজার ছলে বলা একটি কথা, “মাকে বলে যা, মা দাসী আনতে যাচ্ছি” এই বাক্যটিকেই তিনি প্রশ্নের মুখে তুলেছেন।
অরুণ ব্যানার্জীর মতে, একটি পবিত্র সম্পর্কের সূচনাকে যদি এমন একটি শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে সেটি নিছক হাস্যরসের বিষয় নয়, বরং গভীর সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “মাকে বলে যা ‘মা, দাসী আনতে যাচ্ছি’। এটা একটা রিচুয়ালের মধ্যে চলে গেছে।” অভিনেতার মতে, এই কথাটি সমাজে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে কেউ আর এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা অর্থ বা মানসিকতা নিয়ে ভাবেই না। অথচ কথাটির মধ্যে যে নারীর প্রতি এক ধরনের অধীনতার ধারণা লুকিয়ে রয়েছে, সেটিই তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন।

বিয়ের সময় যে সমস্ত সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করা হয়, সেই বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, বর বা কনে দু’জনের কেউই আসলে সেই মন্ত্রের অর্থ বোঝেন না।
বিয়ের আসরে পুরোহিতের মুখে দীর্ঘ মন্ত্রপাঠ চলতে থাকে, কিন্তু যাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুহূর্ত সেটি, তারা নিজেরাই জানেন না কী বলা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, “অনেক মন্ত্র বলে যে মন্ত্রের একটা বর্ণও ছেলেও বোঝে না, মেয়েও বোঝে না।”
অভিনেতার মতে, যেকোনো রীতি বা আচার তখনই অর্থবহ হয় যখন মানুষ তার তাৎপর্য বোঝে। অন্ধভাবে শুধু পালন করার মধ্যে কোনো গভীরতা নেই। বরং এতে করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানের আসল অর্থ অনেক সময় হারিয়ে যায়।

বাঙালি হিন্দু বিয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রীতি ‘কন্যাদান’। কিন্তু এই প্রথা নিয়েই সবচেয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন অরুণ ব্যানার্জী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন মানুষ কখনই অন্য মানুষের দান করার বস্তু হতে পারে না। একজন বাবা তাঁর মেয়েকে ভালোবেসে বড় করে তোলেন, কিন্তু বিয়ের মুহূর্তে তাকে “দান” করার ধারণা তাঁর কাছে অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ।
তিনি বলেন, “বাবা বসে মেয়েটিকে সম্প্রদান করল, মানে দান করল ছেলেটিকে। নিজের মেয়েকে দান করা যায়? অত সোজা?”
অভিনেতার মতে, এই ধারণার মধ্যেই নারীকে এক ধরনের সম্পত্তি বা বস্তু হিসেবে দেখার মানসিকতা লুকিয়ে আছে। সমাজে যুগের পর যুগ ধরে এই প্রথা চলে এলেও এর নৈতিক ভিত্তি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে বলেই তিনি মনে করেন।

আরও পড়ুন:Ankush Hazra:”ও বলেছিল—‘অঙ্কুশ আঙ্কেল তুমি কখন আসবে?’…” – লাংসে জল আর পুঁজ, ICU- তে লড়াই ছোট্ট রোদ্দুরের – ‘ডান্স বাংলা ডান্স’-খ্যাত শিশুশিল্পীর অসুস্থতায় উদ্বেগ, পাশে দাঁড়ানোর আর্জি অঙ্কুশের

বিয়ের পর একটি মেয়ের নিজের বংশপরিচয় বদলে যাওয়ার বিষয়টিও তাঁর সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। হিন্দু বিয়েতে প্রচলিত ‘গোত্রান্তর’ প্রথা অনুযায়ী, বিয়ের পরে কনে স্বামীর গোত্রে অন্তর্ভুক্ত হন।
এই প্রসঙ্গে অরুণ ব্যানার্জী অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এটি অনেকটা একজন মানুষকে তার নিজস্ব শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার মতো।
তিনি বলেন, “আজ থেকে তুমি আমার গোত্রের নও, মানে তুমি আমার বংশের কেউ নও। ব্যক্তিগতভাবে মেয়েকে তো দান করলই, বংশ থেকেও শিকড় ছিঁড়ে উপরে ফেলল।”
অভিনেতার বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি মনে করেন এই ধরনের প্রথা নারীর নিজস্ব পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যকে আঘাত করে। সমাজে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণাগুলোকেও নতুন করে বিচার করা উচিত।

বিয়ের রীতি নিয়ে বক্তব্যের পাশাপাশি তিনি সমাজের সামগ্রিক নৈতিক অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বাড়তে থাকা দুর্নীতি তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছে।
অরুণ ব্যানার্জী বলেন, এক সময় এমন অনেক ক্ষেত্র ছিল যেখানে ঘুষ বা দুর্নীতির কথা মানুষ কল্পনাও করতে পারত না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সীমারেখাগুলো ভেঙে গেছে। তিনি বলেন, “এখন তো শুনছি শিক্ষা ডিপার্টমেন্টেও ঘুষ আছে, এটা তো আগে ছিল না, আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল।”
অভিনেতার মতে, যখন শিক্ষা বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও দুর্নীতি ঢুকে পড়ে, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আরও পড়ুন:Shankar Ghosal:“নাতি মাথায় ঘুষি মে’রে’ছে, ছেলে লাঠি.. ” – ৭৫ বছরের বৃদ্ধ বাবাকে ঘু’ষি, লাঠি—ছেলে-নাতির হাতে নিত্য নি’র্যা’ত’নে’র অভিযোগ বর্ষীয়ান অভিনেতা শঙ্কর ঘোষালের

মানুষ কেন অসৎ পথে যায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি মানুষের মানসিকতার দিকেও আঙুল তুলেছেন। তাঁর মতে, অনেক সময় মানুষের শারীরিক চাহিদা বা জাগতিক সুখের লোভই তাকে নৈতিকতার পথ থেকে সরিয়ে দেয়। অর্থ, ভোগ-বিলাস এবং আরামপ্রিয়তার জন্য মানুষ নিজের বিবেককেও অনেক সময় উপেক্ষা করে। এই প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য,“এই যে টাকাটা ঢুকছে, অসৎ জীবন যাপন করছি, এটা কেন? আমার শরীরকে তুষ্ট করার জন্য। কিন্তু আমার মনটা কোথায় গেল? এটা যে অন্যায়!”
অভিনেতার মতে, মানুষের মধ্যে যদি আত্মসমালোচনার ক্ষমতা থাকে, তাহলে সে নিজেই বুঝতে পারবে কোন কাজটি সঠিক আর কোনটি ভুল।

সমাজের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি মানবিকতার প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, মানুষ যদি মানবিকতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে তার আর মানুষের মতো আচরণ করার কোনো ভিত্তিই থাকে না। তিনি বলেন, “শরীরের চাহিদা মনের বোধকে চাপা দিচ্ছে… আমি যদি মানবিকতাটা যদি না থাকে আমার মধ্যে, তাহলে আমার এই বোধগুলো কোনো বোধই তৈরি হবে না।”
অভিনেতার বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তিনি মানবিক মূল্যবোধকেই মানুষের আসল শক্তি বলে মনে করেন।
সবশেষে তিনি এক ধরনের বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মানুষের আচরণ নিয়ে। তাঁর মতে, দুর্নীতি বা অনৈতিক কাজের মাধ্যমে মানুষ নিজের এবং সমাজের যে ক্ষতি করছে, তা অনেক সময় সে নিজেই বুঝতে পারে না।
তিনি বলেন, “আমি পশুর কাছাকাছি চলে যাচ্ছি (I am going next to animal)। এইটা মানুষ কেন বুঝতে পারছে না? নিজের ক্ষতি নিজে কেন করছে?”

আরও পড়ুন:Nikita Das: “ফাইন দিতে রাজি ছিলাম, অপমান মেনে নয়, আমি করেছি চুরি আর আমাকে দেওয়া হচ্ছে ফাঁ’সি”, “ক্যামেরা অন করতে বাধ্য হয়েছি”— পূর্বপরিকল্পিত নয়, ভাইরাল ভিডিও নিয়ে মুখ খুললেন অভিনেত্রী নিকিতা দাস

অরুণ ব্যানার্জীর এই মন্তব্যগুলো নিছক ব্যক্তিগত মতামত নয় বরং সমাজের বহুদিনের চর্চিত ধারণাকে নতুন করে ভাবার আহ্বান। বিয়ের রীতি থেকে শুরু করে নৈতিকতা, দুর্নীতি এবং মানবিকতা সবকিছু নিয়েই তাঁর প্রশ্ন সমাজের সামনে এক অস্বস্তিকর কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আয়না তুলে ধরে।
তাঁর বক্তব্যে অনেকেই একমত হবেন, আবার অনেকের কাছে তা বিতর্কেরও জন্ম দিতে পারে। তবে এটুকু স্পষ্ট, সমাজের প্রচলিত নিয়ম এবং মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস এখনও কিছু মানুষের মধ্যে রয়েছে আর সেই সাহসই হয়তো পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।

Leave a Comment