Sudipta Chakraborty: বর্ষীয়ান অভিনেতা তমাল রায়চৌধুরীর (Tamal Roy Chowdhury) মৃ’ত্যু’র পর টলিপাড়ায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। বাংলা সিনেমা, টেলিভিশন সিরিয়াল এবং মঞ্চনাটক এই তিন ক্ষেত্রেই নিজের অভিনয় দক্ষতার ছাপ রেখে গিয়েছেন এই প্রবীণ শিল্পী। বহু বছর ধরে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেও তিনি দর্শকদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁর প্রয়াণে সহকর্মী, অনুরাগী এবং ইন্ডাস্ট্রির মানুষজন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
প্রবীণ এই অভিনেতার মরদেহ শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হয়েছিল টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে। সেখানে ইন্ডাস্ট্রির বহু শিল্পী এবং কলাকুশলীরা এসে তাঁকে শেষবারের মতো প্রণাম জানান। কিন্তু সেই শোকজ্ঞাপনের মাঝেই ঘটে যায় এমন একটি ঘটনা, যা মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় এবং তৈরি হয় বিতর্কের ঝড়। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসেন অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী(Sudipta Chakraborty)।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্প্রতি একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, সুদীপ্তা চক্রবর্তী প্রয়াত অভিনেতা তমাল রায়চৌধুরীর মরদেহে মাল্যদান করছেন। কিন্তু সেই সময় তাঁকে হাসতে দেখা যায়। ভিডিওতে অভিনেত্রীকে হেসে হেসে মালা দিতে দেখা যাওয়ায় অনেকের চোখে বিষয়টি অস্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। আর সেই দৃশ্য প্রকাশ্যে আসতেই নেটদুনিয়ায় শুরু হয়ে যায় প্রবল সমালোচনা ও ট্রোলিং।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই নেটিজেনদের একাংশ অভিনেত্রীর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। অনেকেই মনে করেন, শোকের পরিবেশে এমনভাবে হাসা অনুচিত। কেউ কেউ আবার কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি। ভিডিওর নীচে কমেন্ট বক্সে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য দেখা যায়। একজন লিখেছেন, “হাসতে হাসতে মালা দিচ্ছেন নিশ্চয়ই, দুঃখে পাগল হয়ে গেছেন।” আরেকজনের মন্তব্য, “এভাবে হাসতে হাসতে কেউ শ্রদ্ধা জানায় নাকি?” কেউ আবার তীব্র ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, “দেখে তো মনে হচ্ছে খুব খুশি হয়ে এসেছেন, যেন শ্রদ্ধা জানাতে নয়, অন্য কোনও অনুষ্ঠানে এসেছেন।”
এতেই থেমে থাকেননি অনেকেই। আরেকজন লিখেছেন, “একটা মানুষ মারা গেছে, আর তিনি এভাবে হাসছেন!” আবার কারও মন্তব্য, “মালা দিতে দিতে কেউ হাসছে এটা এই প্রথম দেখলাম।” মোটের উপর, ভিডিওটি সামনে আসার পর থেকেই অভিনেত্রীকে ঘিরে সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
তবে এই পুরো ঘটনাকে ঘিরে সুদীপ্তা চক্রবর্তী এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি। ট্রোলিং বা সমালোচনার বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করেননি। যদিও অনেকের মতে, ভিডিওর ওই মুহূর্তটি দেখে পুরো পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। হয়তো অভিনেত্রীর মনে সেই সময় প্রয়াত অভিনেতার সঙ্গে কাটানো কোনও স্মৃতি ভেসে উঠেছিল, যার কারণেই তিনি হেসে ফেলেছিলেন।
আসলে তমাল রায়চৌধুরীর সঙ্গে সুদীপ্তা চক্রবর্তীর দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল। অভিনেতার মৃ’ত্যু’র পর নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর স্মৃতিচারণও করেছেন তিনি। সেখানে একটি আবেগঘন পোস্টে সুদীপ্তা লিখেছেন, “আমি কি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী এবং একটি দুষ্টু মেয়ে সুদীপ্তা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলছি…? এই ফোন কলটা আর কোনওদিন আসবে না। ভালো থেকো তমাল কাকু।”
সেই পোস্টে তিনি আরও লেখেন, “মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সঙ্গীত ভেসে আসে… কখন যে কার জন্য সেই ডাক আসে, তা তো আগে থেকে কেউ জানে না। যদি জানা থাকত, তাহলে তোমার শেষ করা কলটা ‘মিসড’ থেকে যেত না। ক্ষমা কোরো তমাল কাকু।” তাঁর এই লেখায় স্পষ্ট যে, প্রবীণ অভিনেতার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং স্মৃতি ছিল গভীর।
অনেকেই মনে করছেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে যে হাসি দেখা গিয়েছে, সেটি হয়ত সেই স্মৃতিরই প্রতিফলন। কখনও কখনও কাছের মানুষকে শেষবারের মতো দেখার সময় পুরানো কোনও মজার বা আবেগঘন মুহূর্ত মনে পড়ে গেলে অজান্তেই হাসি চলে আসে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ছোট্ট একটি ক্লিপ দেখে পুরো পরিস্থিতি বিচার করা কঠিন বলেই মত অনেকের।
প্রসঙ্গত, সোমবার ঘুমের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন তমাল রায়চৌধুরী। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি হৃদরোগে ভুগছিলেন। তাঁর শরীরে পেসমেকারও বসানো হয়েছিল। বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যার কারণে গত কয়েক বছর ধরে তিনি অভিনয় থেকেও অনেকটাই দূরে ছিলেন।
মৃ’ত্যু’র পর তাঁর দেহ কেওড়াতলা মহাশ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। ইন্ডাস্ট্রির বহু শিল্পী ও সহকর্মী উপস্থিত ছিলেন সেখানে। প্রত্যেকেই স্মরণ করেছেন তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবন এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠাকে।
বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের জগতে তমাল রায়চৌধুরী ছিলেন এক পরিচিত মুখ। প্রধান চরিত্রের বাইরে থেকেও তিনি নিজের অভিনয়গুণে দর্শকদের মনে দাগ কেটে গিয়েছেন। ইতিবাচক চরিত্র থেকে শুরু করে খলনায়কের ভূমিকাতেও তিনি সমান দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন।
তাঁর অভিনীত বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে “চ্যালেঞ্জ”(Challenge), “লে হালুয়া”(Le Halua Le), “বিন্দাস”(Bindaas), “জাতিস্বর”(Jaatishwar), “অ্যামাজন অভিযান”(Amazon Obhijaan) এবং “চাঁদের পাহাড়”(Chander Pahar)। প্রতিটি কাজেই তিনি নিজের উপস্থিতি দিয়ে চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।
প্রবীণ এই অভিনেতার মৃ’ত্যু’তে বাংলা বিনোদন জগতে এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকেই। আর সেই শোকের মাঝেই একটি ভাইরাল ভিডিও ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক আবারও সামনে এনে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুত বিচার করার প্রবণতাকে।