Mallika Majumdar:বাংলা ধারাবাহিকের জনপ্রিয় মুখ মল্লিকা মজুমদার (Mallika Majumdar) শুধু অভিনেত্রী নন, তাঁর অভিনীত চরিত্র ও জীবন-দর্শনের মধ্য দিয়ে তিনি সমাজ সম্পর্কে একটি গ’ভী’র ও মানবিক বার্তা তুলে ধরেন। সাম্প্রতিক এক আলাপচারিতায় তিনি শাশুড়ি বৌমার সম্পর্ক, নিজের অভিনয়-জীবন, ভা’লো’বা’সা’র দর্শন ও সামাজিক দা’য়ি’ত্ব’বো’ধ নিয়ে অ’ক’প’টে মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে বাংলা ধারাবাহিকে শাশুড়ি চরিত্রের প্রচলিত ধ্যানধারণা ভা’ঙা’র প্রয়োজনীয়তা, নারীর আ’ত্ম’সম্মা’ন ও স্ব’নি’র্ভ’র’তা’র প্র’শ্ন, এবং ভা’লো’বা’সা’র শ’ক্তি’র প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাস।
ধারাবাহিকের ছকে বাঁ’ধা ‘শাশুড়ি’ ইমেজ ভা’ঙ’তে চেয়েছিলেন মল্লিকা। মল্লিকা মজুমদার মনে করেন, টেলিভিশনে দীর্ঘদিন ধরে শাশুড়ি চরিত্রকে একমাত্র নে’তি’বা’চ’ক রূপে দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবতা নয়। তাঁর ভাষায় “শাশুড়ি যে শুধু শাশুড়ি নয়, সে একজন নারী এবং মানুষ হিসেবে তোমার পাশে দাঁড়াচ্ছে সেটাই বড় পরিচয়।”
তিনি মনে করেন, ধারাবাহিক মানেই শাশুড়ি খারাপ হবে এই ধারণা ভা’ঙা জরুরি ছিল। তাঁর মতে, শাশুড়ি ও পুত্রবধূর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক একটি ইতিবাচক সামাজিক বার্তা দেয় এবং দর্শকদেরও নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, সবার অভিজ্ঞতা নেতিবাচক হয় না। তাঁর নিজের শাশুড়ি অত্যন্ত সহৃদয় ও সহায়ক একথাও তিনি খোলাখুলি বলেছেন। মল্লিকার ভাষায় “এমন শাশুড়ি দরকার, যে সবসময় ঢা’ল হয়ে দাঁড়াবে, যে বাড়ির পুত্রবধূর ব্যাকবোন হয়ে থাকবে।”
বর্তমান ধারাবাহিক ‘কম্পাস’-এ তাঁর চরিত্র একাধারে স্নেহশীল, আবার প্রয়োজনে ক’ঠি’ন ও প্র’তি’বা’দী। তিনি জানান, এই চরিত্র শুধু “ভালো শাশুড়ি” নয় — বরং এমন একজন সচেতন নারী, যিনি ভুল দেখলে তা বলতে জানেন। তাঁর নিজের ভাষায় “আমি যে শুধু ভালো শাশুড়ি তা নয়, আমি কিন্তু ক’ঠি’ন’ও। যে খা’রা’প, তাকে খা’রা’প বলার সা’হ’স আমার চরিত্রের আছে।”
তিনি জানান, “মা-মা ধাঁচের আবেগী প্র’তি’বা’দ” নয়, বরং যুক্তিভিত্তিক অবস্থান নেওয়াই তাঁর চরিত্রের বড় শ’ক্তি। তাঁর কথায় “বাড়ির মেয়েরা শুধু সাজগোজ করে বসে থাকুক এটা চাই না” কম্পাস-এ তাঁর চরিত্র বড়বৌমাকে ব’কা’ঝ’কা করলেও, তার পেছনে রয়েছে বাস্তবিক ও সামাজিক উদ্বেগ।
তিনি বলেন- “আমি বড়বৌমাকে ব’কা’ব’কি করি… এই জন্য নয় যে আমি ওকে ভা’লো’বা’সি না এই জন্য যে আজকের দিনে একজন মেয়ে হয়ে কেন শুধু বাড়িতে সেজেগুজে বসে আছে?”
তিনি চান, বাড়ির কোনো মেয়ে যাতে প্রতিভা অ’য’ত্নে ন’ষ্ট না করে। তাঁর মতে, নারীদের নিজেদের প্রতিভা অ’ন্বে’ষ’ণ করা, কাজের জগতে বেরিয়ে আসা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো সময়ের দাবি।
মল্লিকা বিশ্বাস করেন মানুষ যদি নিজের কাজ মন দিয়ে করে, তবে অপ্রয়োজনীয় বি’রো’ধ ও স’মা’লো’চ’না’র জায়গা কমে যায়। তিনি বলেন “আমরা যদি প্রত্যেকে, প্রত্যেকের কাজটুকু মন দিয়ে করি, তবে অন্য অ’কা’জে সময় দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।” তাঁর মতে, যখন মানুষ নিজের দায়িত্ব নিয়ে ব্য’স্ত থাকে, তখন সমাজ স্বাভাবিকভাবেই আরও সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।
পূর্ববর্তী জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘অনুরাগের ছোঁয়া’ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্পষ্টই আবেগপ্লুত হন। তাঁর মন্তব্য “এই সিরিয়ালটার কোনো শেষ নেই। টেলিকাস্ট শেষ হলেও এটা মানুষের মনে বহু বছর থাকবে।”
তিনি এই ধারাবাহিককে নিজের ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ “রেফারেন্স পয়েন্ট” বলে মনে করেন।
বর্তমান ধারাবাহিক ‘কম্পাস’ সম্পর্কে তিনি জানান, এটি প্রচলিত ধারাবাহিকের ছক অনুসরণ করছে না। প্রতিটি চরিত্রই আলাদা, স্বতন্ত্র ও বা’স্ত’ব’তা’র কাছাকাছি। নিজের চরিত্রকে তিনি “প্র’তি’বা’দী কিন্তু মানবিক” এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে এই ধরনের চরিত্র তাঁর জন্য একেবারেই প্রথম। এর আগে তিনি পজিটিভ, নে’গে’টি’ভ কিংবা সাধারণ মা-মাসির চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কিন্তু এবার তিনি একজন দৃ’ঢ়’চে’তা, মতপ্রকাশে সা’হ’সী নারীকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
২১ বছরের পথচলায় দর্শকদের ভা’লো’বা’সা’কে তিনি নিজের সবচেয়ে বড় শ’ক্তি বলে মনে করেন। তাঁর জীবনের প্রথম বড় পুরস্কার হিসেবে ‘টেলি একাডেমি অ্যাওয়ার্ড’ পাওয়ার অভিজ্ঞতাও তিনি আবেগভরা কণ্ঠে স্মরণ করেন। তিনি জানান “দর্শকরা এত ভা’লো’বা’সা না দিলে এই দীর্ঘ পথ চলা সম্ভব হত না।”
এছাড়া গত ৮–১০ বছরে বিভিন্ন শুটিং ফ্লোরে শিশু ও তরুণ শিল্পীদের কাছ থেকে যে সম্মান ও স্নেহ পেয়েছেন সেটাকেই তিনি জীবনের বড় অর্জন বলে মনে করেন।
ভা’লো’বা’সা’কে তিনি জীবনের মূল শ’ক্তি হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে“লোকেরা বলে ভা’লো’বা’সা ‘ওভাররেটেড’, আমি বলব ভা’লো’বা’সা ‘আন্ডাররেটেড’। পৃথিবীর অনেক যুদ্ধ হত না, যদি একটু এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরা যেত।” তিনি বিশ্বাস করেন, ভা’লো’বা’সা মানুষকে বদলাতে পারে, সম্পর্ককে নতুন অর্থ দেয়। এমনকি একতরফা ভা’লো’বা’সা’ও তাঁর দৃষ্টিতে শ’ক্তি’র উৎস। তিনি বলেন -“তুমি যদি তিনবার মুখ ফিরিয়ে নাও, চারবারের বার তুমি আমার দিকে তাকাতে বাধ্য হবে কারণ আমি ভা’লো’বে’সে’ছি।”
মল্লিকা মনে করেন সংসার সামলানোও এক ক’ঠি’ন এবং দায়িত্বপূর্ণ কাজ। একজন নারী যদি ঘরের কাজের মাধ্যমে সংসার চালান, তবে সেটিও সমান সম্মানের দাবি রাখে। তাঁর মতে, নিজের কাজের প্রতি গর্ব থাকা জরুরি সেটা ঘরের হোক বা বাইরের।
মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের (Mohit Chattopadhyay) এক নাটকের উদ্ধৃতি টেনে তিনি বলেন “প্রত্যেকটা প্রাণের মধ্যে সুন্দর কিছু থাকে। তুমি যদি সেই সুন্দরটা না দেখতে পাও সেটা তোমার অ’সু’বি’ধা, তার নয়।”
সৌন্দর্য তাঁর কাছে কেবল মুখশ্রী নয়, বরং কারও হাসিতে, কণ্ঠস্বরের উ’ষ্ণ’তা’য় বা আচরণের আন্তরিকতায় প্রকাশ পায়। মানুষের ভেতরের সৌন্দর্য খুঁজে বের করাকে তিনি নিজের সামাজিক দায়িত্ব মনে করেন।
তিনি আরও বলেন “তুমি যদি কাউকে বলতে পারো যে সে সুন্দর তার মধ্যে যে লাইফটা জেনারেট করে, সেটা তোমার কাছে আশীর্বাদ হয়ে ফেরত আসে।”
মল্লিকা মজুমদারের কথায় ফুটে ওঠে নিজের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যের প্রতি সহানুভূতি। অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা এড়িয়ে চলা এবং ভা’লো’বা’সা’কে জীবনের মূল শক্তি হিসেবে ধরে রাখার আহ্বান। তিনি বিশ্বাস করেন মানুষ যদি নিজের কাজ একাগ্রতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে করে, ভা’লো’বা’সা ও সম্মানকে গুরুত্ব দেয় তবে সমাজ অনেকটাই স্বস্তি ও সৌন্দর্যের দিকে এগিয়ে যাবে।